শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ খ্রীষ্টাব্দ | ৯ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

Sex Cams

ইউনেস্কো সদর দপ্তরে ভাষার উৎসব: তরুণদের মাতৃভাষা চর্চায় বৈশ্বিক আহ্বান




নিজস্ব প্রতিবেদন :

প্যারিসে ইউনেস্কো সদর দপ্তর যেন একদিনের জন্য রূপ নিয়েছিল বিশ্ব ভাষার মিলনমেলায়। মাতৃভাষা সংরক্ষণ ও বহুভাষাবাদ প্রসারে বাংলাদেশের উদ্যোগে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে সংস্থাটির নবনিযুক্ত মহাপরিচালক খালেদ এল-এনানি শিক্ষাজীবনকে তরুণ প্রজন্মের ভাষা চর্চার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি বলেন, মাতৃভাষার ভিত্তি মজবুত না হলে জ্ঞানচর্চা ও টেকসই উন্নয়ন পূর্ণতা পায় না। বহুভাষাবাদ শুধু সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতীক নয়, এটি শান্তি ও পারস্পরিক বোঝাপড়ারও পূর্বশর্ত। তিনি আরও জানান, মাতৃভাষা সংরক্ষণ ও প্রসারে বাংলাদেশসহ আগ্রহী সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ইউনেস্কো একটি কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের উদ্যোগ নিচ্ছে।

বিশ্বজুড়ে মাতৃভাষা রক্ষায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বাংলা ভাষায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত খন্দকার এম তালহাকে ধন্যবাদ জানান। মিশরীয় এই মহাপরিচালক তার বক্তব্য আরবি ভাষায় প্রদান করেন, যা অনুষ্ঠানের বহুভাষিক চেতনার বাস্তব প্রতিফলন হয়ে ওঠে।

এ আয়োজনের বিশেষ তাৎপর্য ছিল ইউনেস্কোর শীর্ষ নেতৃত্বের একত্র উপস্থিতি। সাধারণ পরিষদের সভাপতি, নির্বাহী পর্ষদের চেয়ারম্যান এবং মহাপরিচালক—তিন শীর্ষ কর্মকর্তা একই মঞ্চে অংশ নেন, যা সচরাচর দেখা যায় না। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে বাংলাদেশের উদ্যোগ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নতুন উচ্চতা লাভ করে।

স্বাগত বক্তব্যে ইউনেস্কোর সাধারণ পরিষদের সভাপতি ও সংস্থাটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত খন্দকার এম তালহা বলেন, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ভাষাগত অন্তর্ভুক্তি অপরিহার্য। তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বের প্রতিটি মানুষের কাছে তাদের নিজস্ব ভাষায় জ্ঞান ও তথ্য পৌঁছে দিতে না পারলে উন্নয়ন বৈষম্য কমবে না। মাতৃভাষা সংরক্ষণে একটি সুসংগঠিত বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি এবং এ প্রক্রিয়ায় তরুণদের সক্রিয় সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

নির্বাহী পর্ষদের সভাপতি ও কাতারের রাষ্ট্রদূত নাসের হিনজাব মাতৃভাষা রক্ষায় বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও ধারাবাহিক নেতৃত্বের কথা তুলে ধরেন। তিনি এ বছরের আয়োজনকে সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে অভিহিত করেন।

অনুষ্ঠানের আলোচনাপর্বে “শান্তি ও টেকসই উন্নয়নে ভাষার ভূমিকা” শীর্ষক সেশন বিশেষ গুরুত্ব পায়। এতে তাঞ্জানিয়ার সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী, পূর্ব তিমুরের শিক্ষামন্ত্রী, দক্ষিণ আমেরিকার ইনকা সম্প্রদায়ের কেচুয়া ভাষাবিদ এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন স্পেনের ভাষা গবেষক অধ্যাপক ড্যামিয়েন ব্লাসি। আলোচকরা তাদের বক্তব্যের অংশবিশেষ নিজ নিজ মাতৃভাষায় তুলে ধরেন, যা অনুষ্ঠানে ভাষাগত বৈচিত্র্যের এক প্রাণবন্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে।

দিনের শেষভাগে ছিল বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। বাংলাদেশ ছাড়াও লুক্সেমবুর্গ, আজারবাইজান, মলদোভা, ইউক্রেন, শ্রীলঙ্কা ও ব্রাজিল অংশ নেয়। প্যারিসভিত্তিক একটি বহুভাষাভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও অংশগ্রহণ করে। বাংলাদেশের শিল্পীদের পরিবেশিত লোকসংগীত দর্শক-শ্রোতাদের ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়।

অনুষ্ঠানে প্রায় দুই শতাধিক প্রবাসী বাংলাদেশির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। মাতৃভাষা সংরক্ষণে বাংলাদেশের বৈশ্বিক ভূমিকা তাদের গর্বিত করেছে বলে তারা মত প্রকাশ করেন। সার্বিকভাবে, এ আয়োজন ইউনেস্কো সদর দপ্তরে ভাষার বহুমাত্রিক শক্তি ও বৈশ্বিক সংহতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে।

সম্পাদক: শাহ সুহেল আহমদ
প্যারিস ফ্রান্স থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: