সাইফুল ইসলাম রনি, ফ্রান্স:
বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের মেরুকরণের মধ্য দিয়ে চলছে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দ্বিধাবিভক্তি থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক দশকের চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াই রাজনৈতিক মতপার্থক্য শুধু সংসদ কিংবা রাজপথে আন্দোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি ধীরে ধীরে সমাজের ভিত, পারস্পরিক সম্পর্ক ও সামাজিক কাঠামোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। যখনই দুইটি বড় রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে সংঘর্ষ চরম আকার ধারণ করে, তখনই সাধারণ মানুষ, পারিবারিক বন্ধন এবং সামাজিক সম্প্রীতি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই বিশ্লেষণে আমরা দেখার চেষ্টা করবো কীভাবে রাজনৈতিক মতানৈক্য বাংলাদেশের সমাজের প্রতিটি স্তরে পরিবার, বন্ধুত্ব, কর্মক্ষেত্র ও সামগ্রিক সামাজিক কাঠামোতে বিষাক্ত প্রভাব ফেলেছে।
বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোর মূল ভিত্তি হলো পরিবার। একসময় যা ছিল আবেগ ও নির্ভরতার ঘাঁটি, সেখানে আজ রাজনৈতিক মতপার্থক্য এক ধরনের চিড় ধরিয়েছে। অনেক পরিবারে দেখা যায়, বাবা-ছেলে, ভাই-ভাই, স্বামী-স্ত্রী ভিন্ন রাজনৈতিক দলে বিশ্বাসী। আদর্শগত এই পার্থক্য ধীরে ধীরে পারস্পরিক শ্রদ্ধাকে নষ্ট করে দেয়। সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত প্রতিপক্ষের ভাবমূর্তি, রাজনৈতিক নেতাদের ভাষণ, এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া গুজব পরিবারের সদস্যদের মধ্যে হিংসা, সন্দেহ ও অবিশ্বাস তৈরি করে।
বিশেষ করে নির্বাচন কিংবা রাজনৈতিক সংকটের সময় এই প্রভাব আরও প্রকট হয়। অনেকে কটাক্ষ, মুখ বন্ধ করে দেওয়া, এমনকি শারীরিক দূরত্ব সৃষ্টির মাধ্যমে একে অপরকে শাস্তি দেন। আত্মীয়তার অনুষ্ঠান যেমন ঈদ, বিবাহ কিংবা শোকের সময়েও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সামনে চলে আসে, যা সামাজিক রীতি-নীতিকে দুর্বল করে। এভাবে রাজনৈতিক মতপার্থক্য একসময় পরিবারের আবেগীয় নিরাপত্তাকে ধ্বংস করে দেয়।
গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য ছিল ‘প্রতিবেশী’র সম্পর্ক যেখানে রাজনৈতিক মতামত যাই হোক না কেন, বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানোর রীতি ছিল। কিন্তু বর্তমানে এই সম্পর্কগুলো রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। শহরের আবাসিক এলাকা থেকে শুরু করে গ্রামের পাড়া-মহল্লায় দেখা যায়, একই দলের সমর্থকরা একসঙ্গে বসবাস করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ভিন্নমতাবলম্বী ব্যক্তি সামাজিকভাবে ‘অন্য’ হয়ে যান।
উচ্চশিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীতেও এই প্রবণতা প্রকট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক অবস্থান ঘোষণা করলে বন্ধুত্ব ছিন্ন হওয়ার ঘটনা এখন বিরল নয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধার জায়গাটি সংকুচিত হয়ে এসেছে। এক সময় যেখানে ‘তুমি কোন দলে?’ প্রশ্নটি ছিল অপ্রাসঙ্গিক, সেখানে আজ এটি সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার পূর্বশর্তে পরিণত হয়েছে।
সাম্প্রতিক দশকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম (ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব) রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে আরও উস্কে দেওয়ার অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। অ্যালগরিদমের কারণে মানুষ শুধুমাত্র নিজেদের মতের সঙ্গে মিলে যায় এমন কনটেন্ট দেখে, যা ভিন্নমতের প্রতি সহিষ্ণুতা কমিয়ে দেয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, ফেসবুকে একটি রাজনৈতিক পোস্ট অনেক সময় বাস্তব জগতের সংঘর্ষের জন্ম দেয়।
সাইবার বুলিং, মিথ্যা তথ্য ছড়ানো, প্রতিপক্ষের ভাবমূর্তি ধ্বংস করা এসব কার্যকলাপ সমাজে একটি ‘আমরা বনাম তারা’ মানসিকতা তৈরি করেছে। এই বিভাজন এতটাই গভীর যে একসময় মানুষের বিচার-বুদ্ধি ভোটাধিকার, উন্নয়ন কিংবা নীতির ভিত্তিতে কাজ করা বন্ধ করে দেয়, বরং তা হয়ে ওঠে ‘পক্ষ’ বা ‘বিপক্ষ’ নিয়ে আবেগঘন লড়াই। এর ফলে সমাজে যুক্তিবাদী আলোচনার জায়গাটি ক্রমশ সংকুচিত হয়েছে।
রাজনৈতিক মতপার্থক্যের চরম রূপ সমাজের নৈতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে। একদল যখন অন্য দলের সমর্থককে শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, বরং ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করে, তখন সত্য-মিথ্যার পার্থক্য অস্পষ্ট হয়ে যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচার বিভাগ, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও কখনো কখনো এই বিভাজনের শিকার হয়। শিক্ষার্থীরা রাজনৈতিক মতের ভিত্তিতে গ্রুপিং করে, যা তাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার পরিবেশ নষ্ট করে।
মানুষ যখন জানে যে, বিপদের সময় প্রতিবেশী বা আত্মীয় রাজনৈতিক কারণে পাশে দাঁড়াবে না, তখন সমাজে বিচ্ছিন্নতা ও একাকীত্ব বেড়ে যায়। পরস্পর নির্ভরশীলতা, যা একটি সুস্থ সমাজের প্রাণ, তা ভেঙে পড়ে।
রাজনৈতিক মতপার্থক্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক জীবনকেও প্রভাবিত করে। ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রায়ই দেখা যায়, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে চাঁদাবাজি, পণ্য বর্জন, এমনকি শারীরিক ক্ষতিসাধনের ঘটনা ঘটে যদি ব্যবসায়ীর রাজনৈতিক পরিচয় ‘ভিন্ন’ হয়। একইভাবে, চাকরির ক্ষেত্রে সুপারিশ কিংবা পদোন্নতির সময় রাজনৈতিক সম্পর্ক একটি নির্ধারক ফ্যাক্টরে পরিণত হয়, যা দক্ষতা ও যোগ্যতাকে পিছনে ফেলে দেয়।
তরুণ প্রজন্ম, যারা ভবিষ্যতের নেতৃত্ব দেবে, তারা এই বিষাক্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় শিকার। একদিকে তারা রাজনৈতিকভাবে সচেতন হতে চায়, অন্যদিকে তারা দেখে যে রাজনৈতিক পরিচয় তাদের ব্যক্তিজীবন, পড়াশোনা, এমনকি প্রেম-ভালোবাসার সম্পর্ক পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করে। অনেক তরুণ-তরুণীকে নিজেদের রাজনৈতিক মতামত গোপন রাখতে হয় সামাজিক বর্জনের ভয়ে। ফলে সৃষ্টি হয় একটি ‘ভয় ও ভান’এর সংস্কৃতি, যেখানে প্রকৃত বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা বাধাগ্রস্ত হয়।
রাজনৈতিক মতপার্থক্য যেকোনো গণতান্ত্রিক সমাজেরই অনিবার্য অংশ। কিন্তু এই মতপার্থক্য যখন সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা এবং সামাজিক সম্পর্কের অবক্ষয় ঘটায়, তখন তা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের সমাজকে সুস্থ ও স্থিতিশীল রাখতে হলে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে প্রথমে নিজেদের অবস্থান থেকে নীতি-আদর্শের ভিত্তিতে যুক্তিবাদী প্রতিযোগিতার জায়গা তৈরি করতে হবে।
এছাড়া, সংবাদমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সহনশীলতা, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং যুক্তিভিত্তিক আলোচনার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। পরিবার ও শিক্ষার মাধ্যমেই শিশুদের শেখাতে হবে যে রাজনৈতিক মতামত মানুষকে আলাদা করে না, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মানবিক মূল্যবোধই সামাজিক বন্ধনকে টিকিয়ে রাখে।
যদি রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে ‘শত্রুতা’র বদলে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতা’র পর্যায়ে রাখা যায়, তাহলে সমাজের এই ফাটল ধীরে ধীরে গড়তে পারে সংহতির নতুন সেতুতে। অন্যথায়, বিভাজনের এই ক্রমবর্ধমান দাগ একদিন সামাজিক কাঠামোকে এতটাই দুর্বল করে দেবে যে তার পুনরুদ্ধার কঠিন হয়ে পড়বে। একটি সুস্থ সমাজের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক ভিন্নতা সত্ত্বেও মানবিক সম্পর্ককে অটুট রাখার মানসিকতা যা আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।



