বুধবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

পরিবহন খাত : যে চক্রে মালিক-শ্রমিক একাকার




স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা সহপাঠী হত্যার বিচারের দাবিতে রাস্তায় নামার পর তাদের আন্দোলন আর শুধু একটি জোড়া খুনের ঘাতকদের বিচারের দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই। তাদের দাবির মধ্যে আছে সড়কের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেকগুলো বিষয়। পুলিশ যেসব লাইসেন্সবিহীন চালকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে অক্ষম এবং যেসব অচল ও মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি রাস্তা থেকে তুলে দিতে পারে না, তারা সেগুলোর দায়িত্ব ক্ষণিকের জন্য হলেও নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে। আর তারা একজন মন্ত্রীর অমানবিক আচরণের প্রতিবাদ জানিয়েছে। একজন মন্ত্রীর গাড়িকেও ট্রাফিক আইন না মেনে উল্টো পথে চলায় বাধা দিয়ে তাঁকে ফিরে যেতে বাধ্য করেছে। এসব প্রতিবাদের মূল কথা হচ্ছে বিচারহীনতা ও অন্যায়ের অবসান।

এই আন্দোলনে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক সমাবেশগুলোর মতো কোনো চাকচিক্যপূর্ণ ফেস্টুন নেই, নামীদামি শিল্পীদের আঁকা ছবি নেই, নিহত সহপাঠীর পোর্ট্রেট নেই। আছে লেখার খাতার সাদা কাগজে হাতে লেখা পোস্টার-তাও রাজনৈতিক দলগুলোর পোস্টারের চেয়ে একেবারে আলাদা। পোস্টারের লেখাগুলো কোনো পেশাদারের কাজ নয়, আনাড়ি হাতের লেখা। কিন্তু একেবারে মনের কথাগুলো লেখা। এসব পোস্টারে বহুদিনের জমে থাকা কষ্টের কথা লেখা আছে। রাস্তাগুলো যেসব দুর্বৃত্তের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে, তাদের সেসব দুর্বৃত্তপনা বন্ধের দাবির কথা লেখা আছে। যাঁরা আইনকে বুড়ো আঙুল দেখান, তাঁদের আইনের আওতায় আনার কথাই আছে এসব পোস্টারে।

অনেক দিন ধরেই অভিযোগ উঠছে যে সড়কে যা ঘটছে, তার সবটাই দুর্ঘটনা নয়, অনেকগুলোই হত্যাকাণ্ড, যার নেপথ্যে আছে টাকার নেশা। মালিক ও শ্রমিকদের মূলনীতি দুটো: ১. যত বেশি ট্রিপ, তত আয় এবং ২. যত বেশি যাত্রী বা পণ্য তোলা যায়, তত বেশি মুনাফা। সেখানে যাত্রী বা অন্য সড়ক ব্যবহারকারীর নিরাপত্তার প্রশ্ন গৌণ। আইন অথবা আইনপ্রয়োগকারী যাতে কোনো বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, তার ফাঁকফোকরও তাঁদের জানা। সুতরাং বছরে ৪ হাজার (সরকারি হিসাবে) কিংবা ২১ হাজার (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ডব্লিউএইচওর তথ্য) মৃত্যুতেও সড়ক পরিবহন খাতের সংস্কার হয় না। এসব মৃত্যু অথবা হত্যার বিচার হয় না। সড়কে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে এই বিচারহীনতা। আর তার নেপথ্যে আছে পরিবহন খাতে দৌরাত্ম্যকারী মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিত্বকারীদের অসৎ স্বার্থের বোঝাপড়া।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মালিক ও শ্রমিকের স্বার্থের এ রকম সম্মিলন বিরল। সাধারণভাবে সব দেশেই শ্রমিকেরা ইউনিয়ন করেন তাঁদের মজুরি বাড়ানো ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে, আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা আদায়ের উদ্দেশ্যে। ব্যক্তি খাতের শিল্প হিসেবে তাঁদের দেনা-পাওনার হিসাব মালিকদের সঙ্গেই বোঝাপড়া করার কথা। কিন্তু গত কয়েক দশকে সড়ক পরিবহন খাতে যত ধরনের ধর্মঘট বা সভা-সমাবেশ হয়েছে, এর প্রায় সবই হয়েছে মালিক-শ্রমিকের যৌথ উদ্যোগে। মালিক ও শ্রমিকের এই বিরল ঐক্য এবং নানা ধরনের অন্যায়-অনিয়মে কখনো সামনে থেকে, আবার কখনো নেপথ্যে নেতৃত্ব ও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান।

মন্ত্রিত্বলাভের আগে থেকেই শাজাহান খান সড়ক পরিবহনশ্রমিকদের নেতা। অনেকের মতে, পরিবহনশ্রমিকদের নেতৃত্বের কারণেই তাঁর কপালে মন্ত্রিত্বের তিলক পড়েছে। অভিযোগ আছে, তাঁর পরিবার সড়ক ও নৌপথ উভয় খাতেই পরিবহন ব্যবসায় জড়িত। সার্বিক ও কনক পরিবহন নামে দুটি বাস কোম্পানি আছে শাজাহান খানের পরিবারের। পরিবহন খাতের লোকজনের দাবি, এ দুটি কোম্পানি শাজাহান খানেরই। শাজাহান খান একাধিকবার বলেছেন, এটা তাঁদের পারিবারিক ব্যবসা। মালিক ও শ্রমিক-এ দুই আপাতবিরোধী পক্ষের স্বার্থের সম্মিলন ঘটার কারণও সম্ভবত এটি।

পরিবহন খাতের কাছে জনগণের জিম্মিদশার সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে এ খাতে রাজনীতিকদের স্বার্থ, যার প্রধান অংশ আর্থিক আর বাকিটা রাজনৈতিক। গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনার চেষ্টাগুলো তাই একের পর এক ভেস্তে গেছে। ২০০৮ সালে অনুমোদিত কৌশলগত পরিকল্পনা (স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান-এসটিপি) বাস্তবায়নের উদ্যোগ পরিত্যক্ত হয়েছে। পরে ঢাকা উত্তরের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক আরেকটি সমন্বিত পরিকল্পনার কাজ শুরু করলেও তাঁর মৃত্যুর পর সেই উদ্যোগেরও কোনো খবর নেই। যেহেতু গণপরিবহনের একটা বড় অংশের মালিক প্রভাবশালী মন্ত্রী, সাংসদসহ ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিক; সেহেতু সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোও অনেকটা তাঁদের নিয়ন্ত্রণে। তা ছাড়া দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতি তো আছেই। আন্দোলনকারী ছাত্র-তরুণেরা অনেক জায়গায় চালকদের লাইসেন্স আছে কি না জানতে চেয়েছে, এটা একটা ভালো সূচনা। কিন্তু জাল লাইসেন্সের যে ছড়াছড়ি (খসড়া হিসাবে অন্তত ৯ লাখ। সূত্র: (বিক্ষোভে দুশ্চিন্তা, সামলানোর চেষ্টা, প্রথম আলো, ২ আগস্ট ২০১৮), তাতে অনেক লাইসেন্সধারীর হাতেই এসব যানবাহন নিরাপদ নয়।

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, সমবায় প্রতিমন্ত্রী জাতীয় পার্টির মসিউর রহমান রাঙ্গা, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান সাংসদ পঙ্কজ দেবনাথ, আওয়ামী লীগের সাবেক সাংসদ শাহিদা তারেখ, আশরাফুন্নেছা মোশাররফ, সাংসদ এ কে এম শামীম ওসমানসহ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের অনেক নেতা বিভিন্ন পরিবহন কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা এবং সরকারি ও পুলিশ কর্মকর্তাদের অনেকরই আত্মীয়ের নামে পরিবহন ব্যবসা আছে (পরিবহন খাত মন্ত্রী, সাংসদসহ আ. লীগ নেতাদের কবজায়, প্রথম আলো, ২ আগস্ট ২০১৮)। মসিউর রহমান পরিবহনমালিকদের সমিতির নেতা। বিশ্বের অন্য কোনো দেশে এ রকম বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারীরা মন্ত্রিত্বের পদে আসীন হতে পারেন কি না, সন্দেহ। আমাদের সংবিধানে মন্ত্রীদের জন্য যে শপথবাক্য লেখা আছে (…এবং আমি ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হইয়া সকলের প্রতি আইন-অনুযায়ী যথাবিহিত আচরণ করিব।), তা মানতে হলে ওই সব স্বার্থ ত্যাগ না করে কীভাবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন সম্ভব, তা বোঝা মুশকিল। বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল, তখনো এই একই ধারা বজায় ছিল। তৎকালীন মন্ত্রী ও বিএনপির নেতা মির্জা আব্বাস ছিলেন পরিবহন খাতের অন্যতম নিয়ন্ত্রক।

রাজনীতিকদের আর্থিক স্বার্থের আরও একটি দিক আছে, যা হলো এই খাতে আদায় হওয়া চাঁদা। এসব চাঁদার টাকার ওপর বহুল কথিত শ্রমিকনেতার জীবনযাপন নির্ভরশীল। ফলে ওই সব নিম্ন ও মধ্যম সারির নেতা বড় নেতাদের আশীর্বাদপ্রত্যাশী এবং বড় নেতারা তাঁদের ওই আনুগত্যকে দলীয় রাজনীতির প্রয়োজনে যখন যেমন সম্ভব, ততটাই কাজে লাগান। বিরোধী দলের ঢাকামুখী সমাবেশগুলোর দিনে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া এবং বালির ট্রাকে অবরুদ্ধ বিরোধীদলীয় নেত্রীর বাড়ির উদ্দেশে মিছিলের কথা নিশ্চয়ই কারও বিস্মৃত হওয়ার কথা নয়। ছাত্রদের চলমান আন্দোলনের সময়ও ৭১ টিভিতে এক সাক্ষাৎকারে হত্যার বিচারের মতো বিষয়ে পরিবহন খাতের অন্যায় দাবির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবেও শাহজাহান খান বলেছেন, এসব শ্রমিক বিরোধীদের জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন রুখে দাঁড়াতে যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাকে স্বীকৃতি দেওয়া তাঁর দায়িত্ব।

গত কয়েক বছরের পরিবহন খাতের ধর্মঘটগুলোর হিসাব করলে দেখা যাবে, এগুলোর প্রায় সবই হয়েছে মালিক ও শ্রমিকদের ঐক্যের নামে। তবে কার্যত মালিকদের স্বার্থে-যেমন ভাড়া বাড়ানো কিংবা কথিত পুলিশি হয়রানির বিরুদ্ধে। বিপরীতে পরিবহনশ্রমিকদের বেতন-ভাতা, কাজের সময় ঠিক করা কিংবা চাকরির নিশ্চয়তার দাবিতে কোনো ধর্মঘটের নজির খুঁজে পাওয়া যাবে না। অথচ দুই-তিন দশক আগের ইতিহাসে ফিরে তাকালে দেখা যাবে, পরিবহন খাতে তখন এ রকম নৈরাজ্য ছিল না। কমিউনিস্ট নেতা মনজুরুল আহসান খানের নেতৃত্বাধীন ইউনিয়নকে অন্তত মালিকদের পক্ষে লাঠি ধরতে কেউ দেখেনি। তবে মূলধারার রাজনীতিতে বামপন্থীরা যেভাবে পিছিয়ে পড়েছেন, ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনও তা থেকে রক্ষা পায়নি। ফলে এখনকার ইউনিয়ন মালিকপক্ষ এবং রাজনীতির ঘুঁটিতে রূপান্তরিত হয়েছে। তাঁরা এখন তাঁদের সহকর্মী বাসচালক জাহাঙ্গীর আলমের নিহত কন্যার হত্যার বিচারের দাবিতে রাজপথে নামা কিশোর-তরুণদের ওপর হামলে পড়তেও দ্বিধা করেন না। ক্ষমতার রাজনীতির গুণ এমনই মোহনীয়!

তবে এসব শক্তি প্রয়োগে ছাত্রছাত্রীদের ন্যায্য আন্দোলন দমনের চেষ্টা করা হলে তা পরিস্থিতিকে আরও খারাপের দিকে নিয়ে যাবে। সরকারের তরফে দাবিগুলো যৌক্তিক বলে মেনে নেওয়ার কথা বলার পর এ ধরনের হামলার পুনরাবৃত্তি হলে আস্থার সংকট বাড়বে। কোটা সংস্কার আন্দোলনে দাবি মানার ঘোষণার পর পিছিয়ে যাওয়ার নজির ছাত্রছাত্রীদের সংশয়বাদী করে তুললে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তবে তার চেয়েও বড় কথা, পরিবহন খাতে তৈরি হওয়া নীতিহীন দুষ্টচক্রকে ভাঙতে না পারলে এই ক্ষোভ আবারও চাঙা হবে। কেননা, এসব ছাত্রছাত্রীর পোস্টার এখন বলছে:
যদি তুমি ভয় পাও তবে তুমি শেষ
যদি তুমি রুখে দাঁড়াও তুমিই বাংলাদেশ।

কামাল আহমেদ, সাংবাদিক

সম্পাদক: শাহ সুহেল আহমদ
প্যারিস ফ্রান্স থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: