মঙ্গলবার, ৯ অগাস্ট ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ২৫ শ্রাবণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

Sex Cams

বন্যা: প্রাকৃতিক না মানব সৃষ্ট? নাকি দুটিই!




মোহাম্মদ আব্দুল হক

প্রতিটি অঞ্চলের ভৌগোলিক ব্যাপ্তি ও কাঠামো গড়ে উঠে ধীরে ধীরে যুগে যুগে শতো শতো বছরে জল পলি রোদ এবং নানান খনিজ উপাদানের মিশ্রণে। এভাবে প্রাকৃতিক ভাবে একেকটি অঞ্চল গড়ে উঠে বিভিন্ন ঋতুতে নানান রকম তাপমাত্রায় বায়ু প্রবাহ ও তাপ প্রবাহের প্রভাবে সৃষ্ট ঝড়, বৃষ্টি, কুয়াশা, তুষার, বরফ, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প ইত্যাদি দ্বারা। শতো শতো বছরে নদী তার গতিতে অভ্যস্ত হয়ে চলতে থাকে, পাহাড় শক্ত ভিত্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে যায় এবং হাওর বিশাল বুক পেতে রাখে প্রয়োজনের সময় বিশাল জলের প্রবাহ ধারণ করে এগিয়ে নিয়ে বিপুল জলরাশিকে তার গন্তব্যে পৌঁছে দিতে। হাওর ও নদীর পানির বিশাল প্রবাহের শেষ ঠিকানা সাগরে ও মহাসাগরের বুকে। সকল অঞ্চলে হাওর, সমুদ্র, বিশাল বনাঞ্চল এবং পাহাড় থাকে না। তাই সব অঞ্চলের তাপমাত্রা এক-ই থাকে না। এভাবে একসময় একেকটি অঞ্চল আবহাওয়া অনুযায়ী মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর বসবাসের উপযোগী হয়ে উঠে এবং মানুষ ওইসব অঞ্চল খুঁজে পেয়ে বসতি গড়ে তোলে। কিন্তু ; প্রকৃতি তার গড়ার কাজ থামায় না। সূর্য উদয় এবং সূর্য অস্তের প্রভাবে ও চাঁদের প্রভাবে ঋতু পরিবর্তন ঘটতে থাকে এবং সেই সাথে অতি সন্তর্পণে ভৌগোলিক পরিমণ্ডলেও পরিবর্তন ঘটতে থাকে। ভূমিকা দীর্ঘ না-করে সরাসরি চলে যাই আমার বাংলাদেশ নামক ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে।

এই ভিষিথের প্রতিটি অঞ্চল অভিন্ন বৈশিষ্ট্যের নয়, বরং ; ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য নিয়ে একেক এলাকার গড়ে উঠা। সেজন্যই পৃথিবীর একেক এলাকার আবহাওয়া এবং জলবায়ুতে একেক রকম ভাবে ঋতু পরিবর্তন ঘটতে দেখা যায়। বাংলাদেশ নাম নিয়ে প্রতিষ্ঠিত এই অঞ্চলটি অর্থাৎ ভূ-প্রকৃতি ও জলাশয় কোনো মানুষের সৃষ্ট নয়। পৃথিবীর ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে প্রাকৃতিক ভাবে গড়ে উঠা এক ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অঞ্চল হচ্ছে আমাদের বাংলাদেশ। যেহেতু বাংলাদেশ পৃথিবীর বিচ্ছিন্ন কোনো অঞ্চল নয় ; কাজেই এ অঞ্চলের আবহাওয়া এবং জলবায়ু পার্শ্ববর্তী দেশের ভূমি ও জলাশয় দ্বারা বহুলাংশে প্রভাবিত। আনরা দেখতে পাই, বাংলাদেশের উত্তরে, পূর্বে ও পশ্চিমে ভারত নামক এক রাষ্ট্র। স্বাভাবিক ভাবেই আমরা বুঝি ভারতের আকাশে মেঘের পাহাড় উড়ে বেড়ালে সেটা আমাদের দিকে উড়ে আসতে পারে, অথবা সীমান্ত ঘেঁষে থাকা ভারতের ভূমিতে বৃষ্টি হলে তুলনায় উঁচু অঞ্চল হওয়ায় সেখান থেকে বৃষ্টি গড়িয়ে ছোটো ছোটো পাহাড়ি ঝর্ণা ধারা হয়ে, ছোটো ছোটো নালা বেয়ে, নদীপথ পাড়ি দিয়ে আমাদের বাংলাদেশের জলসীমায় মিলে। আমাদের আকাশের মেঘের ভেলা ভেঙে বৃষ্টি হলেও তা আশেপাশের সমতল থেকে নালা, খাল, বিল, হাওর বেয়ে নদীর জলে মিশে। এখন এই গড়িয়ে পড়া জল যদি কখনও অল্প সময়ে অতি মাত্রায় আমাদের নদীতে প্রবেশ করে, তখন আমাদের নদীর যদি সেই অতিরিক্ত জল ধারণের ক্ষমতা না-থাকে, তাহলে নদী উপচে পানি নদীর দুই তীরের সমভূমিতে ভাসে। এই অবস্থাকে আমরা বন্যা বলে চিনি। কখনও কখনও অতিমাত্রায় বৃষ্টির কারণে বিশাল হাওরের পানি ফুলে উঠে এবং হাওরের ফসল তলিয়ে যায় এবং হাওর পাড়ের মানব বসতিতে পানির ধাক্কা লাগে। তখন হাওর এলাকায় সাময়িক বন্যা দেখা দেয়। যদি তখনও খাল ও নদীতে বন্যা না-হয়ে থাকে, তাহলে অল্প দিনে হাওরের পানি নদীর জলে মিশে প্রবাহিত হতে হতে শেষে আমাদের দক্ষিণাঞ্চলের বিশাল বঙ্গোপসাগরের জলরাশীর সাথে মিলে যায়। এ হচ্ছে আমাদের বাংলাদেশ অঞ্চলের স্বাভাবিক জলের প্রবাহ এবং বন্যা পরিস্থিতি ঘটার প্রাকৃতিক কারণ। এর বাহিরেও বন্যার অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে আমরা পতিত হই। এর জন্যে দায়ী বহুলাংশে আমাদের মানুষের দ্বারা কৃতকর্ম।

প্রকৃতি তার শতো শতো বছরে গড়ে উঠেছে এবং তার জলের প্রবাহ সে ঠিক করে নিয়েছে। আমরা প্রকৃতির কোলে আমাদের আবাস গড়ি প্রকৃতির সাথে মানিয়ে নিয়ে। এখানে হঠাৎ প্রাকৃতিক অস্বাভাবিক আচরণ ততোটা ব্যাপক হয় না। কিন্তু ; আমরা বাংলাদেশে প্রতি বছর দেখি পাহাড় ধ্বসে পড়ছে, নদীর জলে শহর ডুবে যাচ্ছে, হাওরের জলে গ্রামের পর গ্রাম ভেসে যাচ্ছে। এর কারণ কী? প্রথমে দেখি পাহাড়ের দিকে, পাহাড় কখনও কোথাও একেবারে খাড়া বৈদ্যুতিক খুঁটির মতো দাঁড়িয়ে থাকে না, বরং ; প্রতিটি উঁচু কিংবা নিচু পাহাড়ের চূড়া থেকে নীচের দিকে উভয় পার্শ্বে চওড়া হয়ে সমতলে মিশেছে। সেজন্যই বড়ো রকমের ভূমিকম্প না-হলে বছরের পর বছর পাহাড় তার শক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ; আমরা দেখতে পাই বাংলাদেশের সিলেট ও চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার এলাকায় বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত বৃষ্টিতে পাহাড় ধ্বসে পড়ে এবং এতে মানুষের জীবনের ক্ষতি হয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, মানুষ প্রাকৃতিক ভাবে গড়ে উঠা পাহাড়ের পাদদেশের মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে অথবা পাহাড়ের শরীর কেটে আবাস গড়ে তুলছে এবং এর ফলে পাহাড় তার স্বাভাবিক দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি হারাচ্ছে। এমতাবস্থায় পাহাড়ের উপর দিয়ে যখন পানির প্রবাহ প্রচন্ড বেগে গড়িয়ে পড়ে তখন পূর্ব থেকে ক্ষয় হওয়া পাহাড়ের মাটি জলের সাথে আরও ধ্বসে যায় এবং তা মানুষের ঘরবাড়ির উপর আছড়ে পড়ে। পাহাড়ের মাটি গিয়ে পাশের খাল বা নালায় পড়ে যাচ্ছে এবং এর ফলে জলাশয় ভরাট হয়ে যায় ও অল্প বৃষ্টিতে পানি উপচে পড়ে নালা ও খালের আসেপাশে। এখানে প্রকৃতিক ঘটনার চেয়ে মানব সৃষ্ট কর্মের জন্যেই অঘটন ঘটছে বেশি। আমাদের বাংলাদেশে প্রকৃতির দান হাজার হাজার খাল ছিলো, শতো শতো ছোটো বড়ো নদী ছিলো, যেগুলো আমরা ছোটো বেলায় ভূগোল বইয়ে পড়েছি এবং দেখেছিও। আমরা দেখেছি বাংলাদেশের স্বাধীনতার কিছু বছর পরে ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে শতো শতো খাল খনন করে শুকনা মৌসুমে জমিতে পানি সেচের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমে পানির গতিপথকে আরও সচল করা হয়েছে। কিন্তু ; স্বাধীনতা পরবর্তী পঞ্চাশ বছরে এসে দেখতে পাই, আমরা যেসব খালে বর্ষাকালে নৌকায় চড়েছি সেখানে এখন আর খাল নাই, কোথাও কোথাও দুই ফুট প্রশস্ত নালাও চোখে পড়ে না। সব খাল দখল হয়ে গেছে মানুষের দ্বারা। তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই বুঝতে পারা যায়, অতি বৃষ্টি যখন হয় তখন ওই বৃষ্টির পানি তার নির্দিষ্ট গতিপথ না-পেয়ে বাগানের ফসলে এবং বাড়ির উঠানে ছুটে। এক-ই অবস্থা দেখা যায় আমাদের নদীর দিকে দৃষ্টি দিলে। শীতকালেও যেসব নদীতে পানি থাকতো, এখন সেসব নদীর তলদেশে ধান চষ হয়। কোথাও কোথাও নদীর তলদেশ এখন শীতকালীন ফুটবল খেলার মাঠ। বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক নদী হচ্ছে সুরমা। এই সুরমা নদী সিলেটের কীন ব্রিজ এলাকায় একেবারে ধূধূ বালুচর। পাহাড়, সমতল, বিল, হাওরের পানির সাথে আসা বালি, পলি ও শহুরে অপচনশীল বর্জ্যে নদীর বুক ভরে গেছে। তাই নদী আর আগের মতো বর্ষার জল তার বুকে ধরে রাখতে পারে না। ফলে মৌসুমের স্বাভাবিক বৃষ্টিতেও নদীর পানি উপচে দুই তীরের শহর ও গ্রাম ভাসিয়ে দেয়। বন্যায় ভাসে ফসল, মানুষ, ঘরবাড়ি। এখানে সময়ের সাথে সাথে উপযুক্ত কর্মসূচি নদী খননের দিকে মনোযোগ দিলে এ পরিস্থিতি দেখতে হতো না। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা থেকে সিলেট ও সুনামগঞ্জের সুরমা, কুশিয়ারা, কালনি নদীর দিকে সাধারণ দৃষ্টিতে তাকালেই চোখে পড়ে, নদীর আকৃতি কিভাবে দিনে দিনে ছোটো হতে হতে শীর্ণ হয়েছে মানুষের দখলে। মানুষ নদী তীর গিলে খাচ্ছে দোকান, কারখানা এমনকি আবাসিক এলাকা গড়ে তোলে। এসব কিছুই হয়েছে এবং হচ্ছে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যেখানে নদীর জন্যেও আইন আছে। তারপরও দিনে দিনে নদীতে বেআইনি কাজ চলছে মানুষের কৃতকর্মে। এভাবেই নদীর পানি ধারণ ক্ষমতা হারিয়ে গেছে, তাই স্বাভাবিক বৃষ্টিতে সমতল, খাল গড়িয়ে পড়া পানি নদীর উপরে ভাসে বন্যা হয়। ২০২২ খ্রীষ্টিয় সালে মে ও জুন মাসে পরপর দুইবার বন্যা হয়েছে। বিশেষ করে সিলেটে প্রথমে বন্যার ধাক্কা লাগার পিছনে ভারতের আসাম ও মেঘালয়ের অতিবৃষ্টির প্রভাব রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণে উঠে এসেছে বন্যার ভয়াবহতার জন্যে দায়ী হাওরাঞ্চলে সড়ক নির্মাণ। বিশেষ করে কিশোরগঞ্জের হাওরের ভিতর দিয়ে প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার দীর্ঘ উঁচু সড়ক করার কারণে বিশাল বিস্তৃতি নিয়ে ছুটে যাওয়া জলরাশী তার চলার গতিপথে বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং এর-ই প্রভাবে পানি সময়মতো আর এগুতে পারেনি এবং পানি ফুলে ভেসে মানুষের ঘরবাড়ি ডুবিয়েছে, প্রাণহানি ঘটিয়েছে, খাদ্য নষ্ট হয়েছে, গবাদিপশু, মাছ, ফসল সব নষ্ট হয়ে গেছে। সাধারণ মানুষের কষ্টে সাজানো স্বাভাবিক জীবন একেবারেই অমানবিক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বন্যা হতেই পারে, কিন্তু ; এখানে বন্যার ভয়াবহ রূপ দেখতে হয়েছে প্রকৃতির গতিতে অপরিকল্পিত মানবচিন্তা যোগ করার কারণে। আমরা আশা করছি, এবারের বন্যার ক্ষতির অভিজ্ঞতা মনে নিয়ে, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এই সাতটি জেলার ১৪,৫৩৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ৪১৪টি হাওরে আর কোনো অপরিকল্পিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে না এবং ইতিমধ্যে হাওরে নির্মিত সড়কের স্থানে স্থানে পর্যাপ্ত সেতু নির্মাণ করে আগামীর সমস্যা মোকাবিলা করার প্রস্তুতি নিতে হবে।

এই লেখায় উপসংহার লেখার সুযোগ নাই। এ অঞ্চলের পানির গতিপথ বলে, ভারতের আসাম ও মেঘালয়ের পানি সিলেট ও সুনামগঞ্জের নদী ও বিল – হাওর হয়ে কিশোরগঞ্জে মেঘনা নদীতে গিয়ে মিলে। কিন্তু কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম উপজেলায় যোগাযোগের জন্যে নির্মিত প্রায় ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কের জন্যে পানি হাওর থেকে নামতে দেরি হওয়ায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়েছে। ভৌগোলিক বাস্তবতায় পার্শ্ববর্তী ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যের অতি বৃষ্টির কারণে কিংবা বাংলাদেশে অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে বর্ষাকালে বন্যায় সাময়িক প্লাবিত হওয়া স্বাভাবিক হলেও, বন্যার ভয়াবহতার জন্যে মানব সৃষ্ট অপরিকল্পিত অবৈজ্ঞানিক অবাস্তব অসচেতন কর্ম দায়ী। দেশ ও দেশের মানুষ এবং দেশের সম্পদের প্রতি ভালোবাসা রেখেই ব্যক্তি পর্যায় থেকে সামাজিক ও রাজনৈতিক পর্যায়ে কর্ম-পরিকল্পণা সাজিয়ে কাজ করতে হবে।

মোহাম্মদ আব্দুল হক: কলামিস্ট ও সাহিত্যিক।

সম্পাদক: শাহ সুহেল আহমদ
প্যারিস ফ্রান্স থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: