বুধবার, ১৭ অগাস্ট ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ২ ভাদ্র ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

সামাজিক সাম্যবাদ ও ইসলাম সাংঘর্ষিক নয়




মোহাম্মদ আব্দুল হক

সাম্যবাদ প্রসঙ্গ সামনে আসলে আমাদের এ অঞ্চলের লেখাপড়া জানা একদল মানুষ সহজেই ছুটেন কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত কবিতা ‘সাম্যবাদী’ তে। আরেক দল আছেন যারা মার্কস – লেনিন এ ছুটেন। নজরুল এবং মার্কস এই অল্প কিছুদিন আগে অর্থাৎ বিংশ শতাব্দীতে আমাদের সামনে সাম্যবাদ প্রকাশ ও প্রচার করেছেন মাত্র। কিন্তু আমরা ভুলে আছি মানুষের এই পৃথিবীতে মানুষের জন্যে পূর্ণাঙ্গ সামাজিক সমতা বা সাম্য বহু শত বছর আগেই প্রতিষ্ঠিত সত্য হয়ে আছে।
চির বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি বিখ্যাত কবিতা হচ্ছে সাম্যবাদী। কবিতার মূল কথা বিখ্যাত দার্শনিক কার্ল মার্কসের সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বাস্তবতার দিকেও ইঙ্গিত করে। আবার ধর্মীয় ন্যায় প্রতিষ্ঠার কথা পাওয়া যায়। আবার বর্তমান পুঁজিবাদী অর্থনীতি প্রতিষ্ঠিত সমাজ ব্যবস্থার বিপরীতে বহুল প্রচারিত মার্কসবাদী সমাজতন্ত্রের ধারাবাহিকতায় সাম্যবাদ হলো সমাজ বিপ্লবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সমাজতন্ত্রের চেয়ে একধাপ এগিয়ে উন্নত এক সমাজের চেহারা। সেই  সমাজে ধনী গরীব শ্রেণি বৈষম্য থাকবে না। সমাজ হবে শোষণহীন। সাম্যবাদে সকল জমি, খনি ইত্যাদি প্রাকৃতিক সম্পদ এবং কারখানা কোনো ব্যক্তির মালিকানাধীন থাকবে না ; এখানে সবকিছুর মালিক থাকবে রাষ্ট্র। এখানে নাগরিক তাদের যোগ্যতা ও সামর্থ্য রাষ্ট্রের অন্যান্য নাগরিকের মঙ্গলের নিমিত্তে শ্রম হিসেবে প্রদান করবে। বলা হয়,  এমন অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সকল মানুষের সমান অধিকার ও স্বাধীনতা থাকবে।
এখানে বলে রাখি, আমদেরকে ভুলে গেলে চলবে কেন যে, বিশ্বাসী  মানুষকে ধর্মীয় বিধি বিধান মেনে সামজিক জীবন যাপন করতে হয়। তাই মানুষ হিসাবে সৃষ্টিকর্তার এই পৃথিবীতে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিার সংগ্রাম চলছে নানাভাবে। মহা মানব, মনীষী, জ্ঞানী, উত্তম চরিত্রের মানুষ পৃথিবীতে এসেছেন এবং কথায় ও কাজে মানুষের জন্যে উত্তম ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করে গেছেন ত্যাগ ও সংগ্রামের মাধ্যমে। পাশাপাশি লুটেরা শ্রেণি তাদের লুটপাটের থাবা বসাচ্ছে প্রতিনিয়ত সহজ সরল ও দুর্বল মানুষের উপর নানান কু-কৌশলে। আমরা এখানে আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় রাষ্ট্রনায়ক ও রাজনীতিকদের মুখে নারী অধিকার, শিশু ও শিক্ষা অধিকার, সকল মানুষের অধিকার বিষয়ে কথা শুনে থাকি। কিন্তু কেউ পরিস্কার করে বলতে পারেননি কিভাবে সেটা সম্ভব করে তুলবেন। মানুষের অধিকার বিষয়ে কথা বলা আমাদের বাকসর্বস্ব নেতৃবৃন্দের অনেকের বক্তব্য শুনে সহজেই বুঝা যায়, তারা নিজেরাই নির্দিষ্ট করে জানেন না, ঠিক কোন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ও কেমন বিচার ব্যবস্থায় তারা সমাজে মানুষের অধিকারের সমতা বা সাম্য প্রতিষ্ঠা করবেন। দুর্ভাগ্যজনক যে, আমরা এমন নেতৃবৃন্দের বক্তব্য শুনি এবং বাহবা দিয়ে ক্ষুধার্ত মন ও দেহ নিয়ে ক্ষুধার্ত গৃহে ফিরি।অপরদিকে সেই নেতৃবৃন্দ বাহবা নিয়ে বহু মূল্যের বিলাসী গাড়ি হাঁকিয়ে প্রথমে বিলাসী রেস্তোরাঁয় খানাপিনা সারেন, তারপর বিলাসী হোটেলে তুলতুলে বিছানায় শুয়ে রাত্রিযাপন করে পরদিন বিমানে কিংবা বিলাসবহুল কোটি টাকা মূল্যের এসি গাড়ি করে ফিরে যান আপন ফ্ল্যাট বা প্রাসাদে। এভাবে হবে না। এসব বক্তব্য শুনতে শুনতে শতাব্দীর পর শতাব্দী চলে যাবে সমাজে সকল মানুষের  অধিকারের সমতা প্রতিষ্ঠা হবে না। ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে না। কিন্তু আমরা ন্যায় বিচার ও সুনীতি প্রতিষ্ঠা চাই। কি করতে হবে? হ্যাঁ, সেজন্যে চাই, সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক, সামাজিক ও বিচার সংক্রান্ত নীতি ঘোষণা এবং ঘোষণা দিয়ে জনতার ঘাড়ে সংগ্রাম চাপিয়ে দিয়ে নয় ; বরং সেই সাথে নেতা ও জনতা একসাথে মিলে ন্যায় ভিত্তিক সমাজ বাস্তবায়নের পথে সত্যকে মেনে নিয়ে ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। শুধু সাজানো সভা মঞ্চে নেতা পাজেরো জিপে চড়ে এসে বক্তব্য দিয়ে আবার পাজেরো জিপে চলে যাবেন, জনগণ কিভাবে সভায় আসলো, কিভাবে যাবে এবং পরে কতদূর পর্যন্ত কি করবে সে সম্পর্কিত কোনো সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা নেই। দেখা যায় জনতার জন্যে সেই ভাবনা নেতার মাথায় নেই, কথায় থাকলেও বাস্তবে তার কোনো দেখা নেই, বাস্তবিক এমন নেতার নেতৃত্বে কোনোদিন-ও মানুষের ন্যায় অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে না। এসব হলো সুভঙ্করের ফাঁকি। তবে এমন সভায় একবার দুইবার যাবার পরে মানুষকে বুঝতে হবে ওইসব নেতার সভায় আমি কেন যাবো। আমি বারবার ঠকতে এই পৃথিবীতে আসিনি।
সবার আগে মানুষকে সজাগ হতে হবে। দরকার মানুষের সমাজবদ্ধ সচেতনতা ও সামাজিক ও নৈতিক বিপ্লব। মানুষকে অধিকার কি সেটা বুঝতে হবে। তারপর বুঝতে হবে সাম্য সমতা সাম্যবাদ ও ন্যায় বিচার। সাম্যবাদী সমাজে নারী ও পুরুষে সামর্থ্যের ও মেধার মূল্যায়ন হয়। এখানে সাম্যবাদে ধনী ও গরীবে সামাজিক মর্যাদার পার্থক্য করা হয় না। রাষ্ট্র ব্যবস্থায় জনগণের সর্বাধিক মতামতের ভিত্তিতে জনগণের সরকার থাকে এবং অবশ্যই নাগরিকদের মৌলিক অধিকার বাস্তবায়ন করে রাষ্ট্র সরকার। এতে জুলুম থাকে না। ক্ষমতার দাপটে এখানে দুর্বলের উপর শোষণ থাকে না। উদার ন্যায় বিচার থাকে।এমন ব্যবস্থায় পকেটমার ধরা পড়লে সাথে সাথে জেল, ক্ষুদ্র ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে গরু, ছাগল, মুরগী এমনকি বাড়ি নিলামে উঠবে আর শত শত কোটি টাকা চুরি করে ধরা পড়লে কিংবা হাজার কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ না করেও আইনের মারপ্যাঁচে সাজা মওকুফ হয়ে যায় না। বরং ধনী ও গরীব, নারী ও পুরুষ সকলের জন্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমতা লক্ষ্য করা যায় যে সমাজে সেটি হলো প্রকৃত সামাজিক সমতা বা সাম্যবাদী চেহারার সমাজ ব্যবস্থা। তবে হ্যাঁ, সাম্যবাদ বললেই মার্কসবাদী সাম্যবাদ বুঝতে হবে না ; বরং গভীর পর্যবেক্ষণে পাওয়া যায় চৌদ্দ শত বছর পূর্বে কোরআন ও মানবতার আদর্শ হযরত মুহম্মদ সাঃ এর শিক্ষায় আমরা সঠিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমতার শিক্ষা পাই। ন্যায় পরিশ্রমে অর্থ উপার্জন অবৈধ নয়। তারপর যাকাতের যে বিধান আছে তা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রশ্নাতীত ভাবে অর্থনৈতিক দম্ভ নিরসনে অতুলনীয়।এভাবেই নির্ভুল সামাজিক সাম্যবাদে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়। এমন ব্যবস্থায় সকল ধর্মের, সকল জাতের, সব বর্ণের, ধনী ও গরীব ভেদে মানুষকে অপমান নয় ; বরং সবাইকে সম্মানিত করা হয়। এখানে নেতা ও জনতা সকলের নিরাপত্তার কথা মানুষ হিসেবে দেখা হয়, বৈষম্য নয়। পড়লে জানা যায়। হ্যাঁ পৃথিবীতে প্রথম সামাজিক সমতা ইসলামের ইতিহাসে পাওয়া যায়।
আমরা কেবল মার্কসীয় দর্শন সামনে টেনে communism বা সাম্যবাদ বুঝে সেখানে পড়ে থাকবো না। আমরা কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার আংশিক সাম্যবাদেও থাকবো না। আমরা ভুলে যেতে পারি না যে, মানব জাতি ও বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সৃষ্টিকর্তার দিক নির্দেশনায় এই পৃথিবীতে মানুষ ধর্মীয় বিশ্বাসে দিবানিশি জড়িয়ে আছে। কাজেই মানুষের সাথে প্রতারণা নয়, আবার ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক নয় এমনভাবে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার দিকে যেতে হবে। কিন্তু এতোকিছু বলার পর-ও বলতেই হচ্ছে, মানুষের অধিকার সচেতন হওয়া ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্যে সমাজ বিপ্লব ঘটাতে মানুষের ঐক্যবদ্ধ জাগরণ দরকার। এজন্যে শিক্ষা ও নৈতিক শিক্ষা যা নির্ভুল ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ ও পালন করতে হবে। আমাদেরকে মানবাধিকারের ক্ষেত্রে সাম্য সমতা সাম্যবাদ এসব শব্দ শোনার সাথে সাথেই মানুষের জন্যে সমাজে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার জন্যে কেবল মার্কসবাদী চিন্তায় ছুটলে হবে না। এক্ষেত্রে সাম্য, সমতা, মানুষের অধিকার, ন্যায় বিচার, নৈতিকতা বিষয়ক জ্ঞান রাখতে হবে এবং সবার আগে প্রয়োজন সাধারণ মানুষের বোধের জাগরণ। অন্যথায় আমরা যুগে যুগে অধিকার নিয়ে ভন্ড পীরের ন্যায় দুষ্ট নেতৃত্বের কাছে ঠকেই যাবো আর মার্ক্সীয় Communism এর সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ইংলিশ Capitalism এর যাঁতাকলে পিষ্ট হতেই থাকবো।।
মোহাম্মদ আব্দুল হক : কলামিস্ট, কবি ও প্রাবন্ধিক

সম্পাদক: শাহ সুহেল আহমদ
প্যারিস ফ্রান্স থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: