শনিবার, ২ জুলাই ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১৮ আষাঢ় ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

করোনা নিয়ে যত ধুম্রজাল




লেখক

আব্দুল ওয়াদুদ ময়নুল

মাত্র তিন মাস আগের কথা। জীবন নিয়ে কত সুন্দর ও সাজানো প্ল্যান ছিল আমাদের। জীবন চলাচলে প্রয়োজনীয় কত কাজ রাখা ছিল। কিন্তু ভাবতে পারছিলেন? চোখে না দেখা একটা ক্ষুদ্র বস্তু বিশ্ববাসীকে স্তম্ভিত ও নিস্তব্ধ করে রাখবে! পরমানু শক্তি দাবিদার বিশ্ব মোড়লরা এই ক্ষুদ্র বস্তুর কাছে পরাজিত হয়ে ঘরে বসে আছে। বিশ্বের বুকে বেঁচে থাকা আমরা এর আগে ভাইরাসের এমন তাণ্ডব দেখিনি, হয়তো ইতিহাস থেকে শুনেছি মাত্র। আজকের এই ধ্বংসলীলা একসময় ইতিহাস হয়ে রইবে।

করোনা ভাইরাস নিয়ে আমাদের ধুম্রজাল, আলোচনা সমালোচনার শেষ নেই। তার আগে আমরা ভাইরাস ও করোনা ভাইরাস সম্পর্কে সংক্ষেপে জেনে নেই।

ভাইরাস (Virus) হল একপ্রকার অতিক্ষুদ্র জৈব কণা বা অণুজীব যারা জীবিত কোষের ভিতরেই মাত্র বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এরা অতি-আণুবীক্ষণিক এবং অকোষীয়। ভাইরাস জীব হিসেবে বিবেচিত হবে কিনা, এ নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দ্বিমত আছে। ভাইরাস মানুষ,পশু-পাখি, উদ্ভিদের বিভিন্ন রোগের জন্য দায়ী।

করোনাভাইরাস ১৯৬০-এর দশকে প্রথম আবিষ্কৃত হয়। করোনাভাইরাস বলতে ভাইরাসের একটি শ্রেণিকে বোঝায় যেগুলি স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং পাখিদেরকে আক্রান্ত করে। মানুষের মধ্যে করোনাভাইরাস শ্বাসনালীর সংক্রমণ ঘটায়। এই সংক্রমণের লক্ষণ মৃদু হতে পারে, অনেকসময় যা সাধারণ সর্দিকাশির ন্যায় মনে হয় (এছাড়া অন্য কিছুও হতে পারে, যেমন রাইনোভাইরাস), কিছু ক্ষেত্রে তা অন্যান্য মারাত্মক ভাইরাসের জন্য হয়ে থাকে, যেমন সার্স, মার্স এবং কোভিড-১৯। মানবদেহে সৃষ্ট করোনাভাইরাস সংক্রমণ এড়ানোর মত কোনো টিকা বা অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ আজও আবিষ্কৃত হয়নি। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ চেষ্টা করে যাচ্ছে। (উইকিপিডিয়া)

২০২০ এর জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে হঠাৎ খবরে দেখলাম মধ্য চীনের উহান শহর থেকে একটা নতুন ভাইরাসে মানুষ মারা যাচ্ছে। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ এ এই শহরে নিউমোনিয়ার মতো একটি রোগ ছড়াতে দেখে প্রথম চীনের কর্তৃপক্ষ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে সতর্ক করে। এরপর ১১ জানুয়ারি প্রথম একজনের মৃত্যু হয়।

তবে ঠিক কীভাবে এর সংক্রমণ শুরু হয়েছিল, তা এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারেননি বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সম্ভবত কোনও প্রাণী এর উৎস ছিল। প্রাণী থেকেই প্রথমে ভাইরাসটি কোনও মানুষের দেহে ঢুকেছে এবং তারপর মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়েছে। এর আগে সার্স ভাইরাসের ক্ষেত্রে প্রথমে বাদুড় এবং পরে গন্ধগোকুল থেকে মানুষের দেহে ঢোকার নজির রয়েছে। আর মার্স ভাইরাস ছড়িয়েছিল উট থেকে। চিনাদের দাবী উহানের একটি বাজার থেকে প্রথম এর সংক্রমন ঘটেছে। যে বাজারটিতে মুরগি, বাদুড়, খরগোশ এবং সাপ বিক্রি হতো। পরবর্তীতে এর নাম কোভিড-১৯ নাম রাখা হয়।

কোভিড-১৯ চীনের পর ইউরোপের দেশ ইতালিতে ধ্বংসলীলা চালায়। তারপরে ইরান, স্পেন, ফ্রান্স সহ সমগ্র ইউরোপে তার জাত ও শক্তি চিনিয়ে আমেরিকায় হানা দেয় এই রহস্যময় ভাইরাসটি। এই মুহুর্ত পর্যন্ত বিশ্বের ২১৩ টি দেশে ৪৩ লক্ষ ৯৫ হাজার জন আক্রান্ত এবং মৃত্যু হয়েছে ২ লক্ষ ৯৬ হাজার জনের মত। করোনা নিয়ে এখন পর্যন্ত কেউ কোন সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারছেনা। ধুম্রজাল এবং লুকোচুরিতে অনেক রহস্য এখনো অজানা।

মার্চের শুরুতে ফ্রান্সে ভাইরাসটি যখন বিস্তার শুরু করে তখন অনেকেই বিষয়টি নিয়ে ঠাট্টা তামাশা শুরু করছিল। কয়েকদিন পরে অনেকেই যখন ভাইরাস থেকে বাঁচতে রাস্তাঘাটে মাস্ক পরা শুরু করলো তখন ফ্রান্স সরকার আক্রান্ত বা আক্রান্তের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তি ছাড়া উন্মুক্তভাবে সবাইকে মাস্ক পরতে নিষেধ করছিল। ফার্মেসী, মার্কেট, কোথায় সচরাচর মাস্ক পাওয়া যায় নি। রাস্তাঘাটে মাস্ক পরলে পুলিশের দ্বারা জিজ্ঞাসিত হতে দেখা গেছে প্যারিসের রাস্তায় রাস্তায়।

সেই অবস্থান থেকে এখন ইউটার্ন নিয়েছে ফ্রান্স। দীর্ঘ দুই মাস পর যখন ফ্রান্স এবং ইউরোপের কয়েক দেশ লকডাউন তোলার সিদ্ধান্ত নিল তখন ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে সাধারণ জনগণের জন্য রাস্তাঘাটে চলাচলে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করে দিল। প্রশ্ন হল-মাস্ক যদি ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে পারে তাহলে শুরুতে নিষেধ করা হল কেন? শুরুতে এই কাজটা করলে তো অনেক মানুষ বেঁচে যেত। এখন যদি দেশের অর্থনীতির কথা চিন্তা করে লকডাউন তুলে নিতে সরকার মাস্ক দিয়ে জনগণকে রাস্তায় ছেড়ে দেয় সেটা হবে চরম অমানবিকতা।

এমনকি মাত্র দু মাস আগে গণহারে মাস্ক না পরার আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। পরে আবার ইউটার্ন নিয়েছে সংস্থাটি।সর্বসাধারণের মাস্ক ব্যবহারের ফলে বিশ্বজুড়ে সার্জিক্যাল মাস্কের সংকট দেখা দিতে যদি এই কৌশল নেওয়া হয় তাহলে আমাদের জন্য এটা ছিল একেবারে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

উহানে যখন করোনা ভাইরাসে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলছে, ট্রাম্প প্রশাসন তখন বলেছে এটা চীনের ব্যাপার। ইউরোপে যখন ভাইরাসটি ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেল আবার ট্রাম্প প্রশাসন বলল আমরা এটা প্রতিরোধে প্রস্তুত। আমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। এরপর যখন আমেরিকায় হানা দিল তখন আমেরিকা এবার সরাসরি চীনকে দোষারোপ করতে শুরু করলো। ট্রাম্প প্রশাসন বলেই ফেলল- এই জীবানু অস্ত্র চীন ইচ্ছা করেই বিশ্বে ছড়িয়েছে। যাতে করে চিনারা বিশ্বে প্রভাব ও কর্তৃত্ব বিস্তার করতে চায়। চীনকে এর কঠিন জবাব দিতে হবে। ট্রাম্পের সাথে সুর মেলালো ফ্রান্স। চীনকে কঠিন হুঁশিয়ারি করে দিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেনট। এরপরে বৃটেন এবং ইউরোপের অনেক দেশ এই ভাইরাসের জন্য চিনকে দোষারোপ করে যাচ্ছে।

এদিকে চীনা ও থেমে থাকেনি। তারা বলেছে, এটা ইউরোপ আমেরিকার সৃষ্টি এবং একধরনের কৌশল। বয়স্ক এবং নানা ধরনের অসুস্থ রোগীর সংখ্যা কমাতে তারা মরিয়া হয়ে উঠছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে একচ্ছত্র অধিপতি হতে যাওয়া চীনকে কোণঠাসা করতেই উহানে করোনা ভাইরাসের উদ্ভব ঘটিয়েছে আমেরিকা। গত ২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমনটিই জানায় হংকংয়ের জনপ্রিয় অনলাইন ডিমশুম ডেইলি। প্রতিবেদনে বলা হয়, উইলিয়াম এবসের মতে, একাধিক রাশিয়ান বিজ্ঞানী বিশ্বাস করেন যে, চীনকে ধ্বংস করার জন্য আমেরিকাই উহান করোনা ভাইরাস তৈরি করেছিল। যাতে পরবর্তীকালে একটি প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন নিয়ে এসে কোটি কোটি ডলার উপার্জন করতে পারে দেশটি। করোনার এই ধুম্রজাল এবং রাজনীতি আমাদের হতাশ ও সন্দিহান করছে।

এদিকে বিশ্বের অনেক বিশেষজ্ঞদের দাবী- করোনা ভাইরাস সম্পর্কে গোটা বিশ্বে অতিরিক্ত ভয়-ভীতি ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। যার কারণে বিশ্বের প্রতিহিংসার রাজনীতির ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে অনেক মানুষ করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আগে ভয়েই মারা যাচ্ছে এবং তাকে অযথা করোনা রোগী বলে দাবি করে আসছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা( WHO) এর তথ্যনুযায়ী প্রতি বছর যেখানে বিশ্বে ৬ লক্ষ ৫০ হাজারের মত মানুষ শুধুমাত্র সিজনাল ফ্লুতে মারা যায়, সেখানে আজ পর্যন্ত বিশ্বে ২ লক্ষ ৯৪ হাজার জন এই ভাইরাসে মারা গেছেন। তাদের মতে, করোনা ভাইরাস নিয়ে বিশ্বজুড়ে যেভাবে ফলাও করে তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছে সেভাবে যদি অন্যান্য সব রোগের তালিকা প্রকাশ করা হত তাহলে এই ভাইরাসটিকে সাধারণ মানুষ জ্বর স্বর্দির মত মনে করতো। তবে তারা স্বীকার করেছেন, এই ভাইরাসটি অন্যান্য ভাইরাস থেকে শক্তিসালী, শুরু থেকে নানা রূপ পাল্টাচ্ছে, ভাইরাসটি খুব দ্রুত ফুসফুসে আক্রান্ত করতে পারে বিধায় বয়স্ক এবং জটিল রুগে আক্রান্তরা সাবধানে থাকতে বলেছেন। বিশ্বের একটা বিশাল অংশের মানুষ এই ভাইরাসটিকে এখনো পাত্তাই দিচ্ছে না, তারা বলছে এটা প্রকৃতিগত ভাবে আসছে আবার চলে যাবে।

শুরু থেকে বিশ্বের অসংখ্য দেশ ভাইরাসটির প্রতিষেধক ঔষধ আবিষ্কার করছে বলে জাতীয়-আন্তর্জাতিক পত্রিকায় সংবাদ ছাপা করছে ঠিকই, কিন্তু কয়েকদিন পরেই ঔষদটির কার্যকারিতার আর সংবাদ দেখা যায় না। এখন পর্যন্ত এর কোন ঔষধ আবিষ্কার হয়নি। কিছুদিন আগে বৃটেন ও জার্মান একটি ভ্যাকসিন মানব শরীরে প্রয়োগ করার খবর আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ছাপা হলেও এখন পর্যন্ত এর কোন ফলাফল জানানো হয়নি। এখন আমেরিকা, সিঙ্গাপুর সহ অসংখ্য দেশ শুধু ভ্যাকসিন আবিষ্কারের কথা বললেও শুধু খবরেই সীমাবদ্ধ। যদিও একটা ভ্যাকসিনের পরিপূর্ণ ফল পেতে অনেক সময়ের প্রয়োজন। মোট কথা এখন পর্যন্ত বিশ্বের সব পন্ডিতগন এই ভাইরাসটির কাছে অসহায়।

যে যাই বলুক, করোনা ভাইরাসের আক্রান্ত ও মৃত্যুর তথ্য ও পরিসংখ্যান নিয়ে বিশ্বের প্রত্যক দেশই লুকোচুরি করছে এই কথা আমি নিজে বিশ্বাস করি। এসব রাজনীতি, লুকোচুরি আর ধুম্রজালের কারণে আজ পর্যন্ত বুঝতে পারলাম না যে কোভিড-১৯ ভাইরাস অদৌ মানবসৃষ্ট নাকি সত্যিই প্রাণী থেকে সংক্রমিত হয়ে আজ আমরা এই অশান্ত পৃথিবীতে বসবাস করছি….!

আব্দুল ওয়াদুদ ময়নুলঃ লেখক, কলামিস্ট।

সম্পাদক: শাহ সুহেল আহমদ
প্যারিস ফ্রান্স থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: