শুক্রবার, ২ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

করোনাকালের ভাবনা




  • সোনিয়া কাদির

আমাদের চারপাশে করোনা নামের নাগিনী সারাক্ষণ নিঃশব্দ ভয়াবহতায় আমাদের তাড়া করছে। টিভি জুড়ে করোনা, ফোনে করোনা, কথায় করোনা , গল্পে,কবিতায়, আকাশে, বাতাসে জীবনযাপনে শুধু ই করোনা ।
আমরা নিউইয়র্কবাসিরা এখন প্রতিটি ঘরে , বাড়িতে ভয়ংকর করোনার সাথে ই বসবাস করছি। আমাদের দিন শুরু হয় মৃত্যু সংবাদ দিয়ে , আমাদের রাত শেষ হয় উৎকণ্ঠা ও দূশ্চিন্তা নিয়ে ।দ্বীপবাসীদের মত বিচ্ছিন্ন প্রতি ফোনকলে সঘণ দীর্ঘশ্বাস – কবে এ দুঃখের নীশি ভোর হবে —–।

আমার বাসা থেকে আধ মাইলের দূরত্বে নিউইয়র্কের বিখ্যাত কয়েকটি হাসপাতালের অবস্থান । নিস্তব্ধ ভূতুড়ে নগরে দিনে – রাতে যখন সাইরেন বাজিয়ে এম্বুলেন্স ছুটে যায় , তখন আমার মনে হয় আজরাইল আসছেন । অথচ সব সময়ই বিশ্বাস করি এম্বুলেন্স প্রাণ বাঁচতে আসে।
নিউইয়র্কের পাঁচটি বু‍্যরোতে কয়েক লক্ষ বাঙ্গালীর বাস । সকলেই সকলের কোন না কোনভাবে পরিচিত । অনেকেই সেরে উঠছেন। অনেকেই সেরে উঠার জন্য লড়াই করেছেন । লড়াইয়ে হেরে দুনিয়া থেকে হারিয়ে যাওয়া আমার স্বজনদের সংখ্যা ও কম নয় । মৃতের সংখ্যা বাড়ে , সাথে বাড়ে আমার হতাশা। স্বজন – পরিচিতজনদের বিয়োগ ব‍্যথার যে ভারী পাথর চেপে আছে মনে তা নিয়ন্ত্রণ করতে নিজের সাথে নিজে যুদ্ধ করে চলছি অভিরাম ।

চারপাশের অসংখ্য দুঃখজনক খবরে ভয়ের সাপ পেঁচিয়ে ধরে থাকে সারাক্ষণ। টেনশনে মনোবল নষ্ট হয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙ্গে পড়ে। অযথাই জ্বর জ্বর লাগে, গলা খুশখুশ করে ,গা ব‍্যথা করে । সারাক্ষণ ঘরের আশ্রয়ে থেকে ও ভয়ের অতলে তলিয়ে থাকি। সারাক্ষণ হাত ধুচ্ছি , মুখ ধুচ্ছি , গরম আদা পানি, লেবু পানি, দারুচিনি ,এলাচি ,জীরা পানি পান করছি , কালিজীরা নিয়মিত নিজে খাচ্ছি পরিবারের সকলকে খেতে বাধ‍্য করছি । তার পর ও মনে হয় এই বুঝি আক্রমণ করে ফেললো ।
পরিবারের দুই পুরুষই নিউইয়র্কের এ‍্যসেন্সিয়াল ওয়ার্কার । স্বামী -ছেলেকে কর্মস্থলে পাঠিয়ে আধমরা পড়ে থাকি।

১৮ এপ্রিল জ‍্যাকবী হাসপাতালে ছোট ছেলের প্রথম সন্তান জন্ম নিল ।নাতীর শুভাগমনে খুশীতে
ঘর সাজাচ্ছি আর ৭ বৎসরের নাতনী আনুমের সাথে গল্প করছি –
= আমি এখন সাজিয়ে দেই, তার বিয়ের সময় তো আমি থাকবো না । সে সময় তুমি সাজাবে আর গল্প করবে ————-
” তুই জানিস ইব্রাম – তোর জন্মের পর হাসপাতাল থেকে আসার আগে তোর দাদী তোর জন‍্য বাড়ী সাজিয়ে ছিল । তোর ক্রিভ সাজিয়ে ছিল ” । মিষ্টির দোকান বন্ধ তাই নীনা নিজ হাতে মিষ্টি বানিয়ে তোর মাকে – বাবাকে ও আমাদের কে মিষ্টিমুখ করিয়েছিল । তুই কল্পণাও করতে পারবিনা ইব্রাম – কি রক্ত হীম করা ভয়ে ভীত মানুষেরা সকলে ঘরবন্ধি ছিল সে সময় । “

আসলেইতো এই ভয়ংকর করোনা কাল আমাদের টাইম মেশিনে চড়িয়ে টাইম ট্রাভেল্সের অদ্ভুত এক সুযোগ করে দিয়েছে । আমার বতর্মানে বাস করে অতীতকে অনুভব করছি । জল,স্থল ও আকাশচারী যানবাহনের দৌরাত্ম্য মুক্ত এক নির্মল প্রকৃতি।
আমরা এক অদ্ভুত মহামারীর সাক্ষী হয়েছি যে ঘটনার বিবরণ ইতিহাস পড়ে , এই সময়ের সাক্ষী লেখকদের লেখা পড়ে , পরবর্তী প্রজন্ম জানবে ।

কত লক্ষ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে ভয়ংকর অদৃশ্য ক্ষুদ্র অনু কোভিড নাইন্টিনের থাবা থেকে পৃথিবী রক্ষা পেয়েছিল । আগামীর মানুষ তা জানবে ” হিষ্টরী অব কোভিড নাইন্টিন “সম্পর্কে লিখিত বই পড়ে, ডকুমেন্টারি দেখে , ছবি দেখে ।যেভাবে আমরা জেনেছিলাম ” আলবেয়ার কামু‍্যর উপন‍্যাস ” দ‍্যা প্লেগ ” পড়ে ।দ‍্যা প্লেগ ” মন্দ, ভয় ও মৃত্যুর সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের চিরকালীন বিবরণ।

১৯৪০ দশকের গোড়ার দিকে আলজিরিয়ায় ইঁদুর থেকে সংক্রমিত প্লেগ নামক মহামারী ” ওরাঁ ” শহরটিকে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল। আর এখন যেন গোটা পৃথিবী ই ওরাঁ।

কামু‍্য বর্ণনা করেছেন মহামারীর মত মরণঘাতি সংকটের সময় মানুষের আচরণ ও প্রতিক্রিয়া কিভাবে পাল্টে যায় । কোভিড – ১৯ সময়ে আমরা ও দেখছি কিভাবে পাল্টে মানুষের মন, মানুষের প্রাত‍্যাহিক জীবনযাপন । কেউ কেউ নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে মৃত্যু পথযাত্রী মানুষের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে ।কেউ আতঙ্কে উদ্দেগে অসুস্থ হয়ে পড়েছে , কেউ উদাসীন, কেউ নির্বিকার।কেউ আত্মহত্যা করছে। কেউ সংক্রমণ লুকিয়ে রেখে পালিয়ে বেড়াচ্ছে ।কেউ বাঁচার আশায় শহর থেকে গ্রামে, বিদেশ থেকে দেশে পালিয়ে যাচ্ছে । দেশের যে স্বজন স্বাভাবিক সময়ে যাকে আত্নার আত্মীয় ভাবতো সংক্রমণের সময় তাকে দুশমন জ্ঞান করছে। কেউ পরিস্থিতি ব‍্যবহার করে বানিজ‍্য করছে , কেউ ধর্ম বিক্রি করছে , কেউ বর্ম বিক্রি করছে ,কেউ অন‍্যের দূভার্গের কারন খোঁজছে । নানা রকম গুজব গুন্জরিত করছে ও বাকিরা ট্রল করে আনন্দ করছে ।

আলবেয়ার কামু‍্যর মতে – প্লেগের জীবাণু মারা যায় না শুধু ঘুমিয়ে থাকে । বছরের পর বছর এরা সুপ্ত থাকতে পারে ।যে কোন একদিন এই জীবাণু ঘুম থেকে জেগে উঠতে পারে ।

আধুনিক বিজ্ঞান প্রাকৃতিক কারনে মানুষের অকাল মৃত্যু রোধে বিরামহীন কাজ করে চলছে। আমরা আশাবাদী অচিরেই আবিষ্কার হবে করোনার ঔষধ।
কিন্তু —
বিজ্ঞান বা কোন বিজ্ঞানী কখনো চেষ্টা ও করেনি – আবিষ্কার করতে ——— হিংসা,লোভ লালসা, বৈষম্য, ঘৃণা , বিবেদ,দম্ভ কিংবা দূর্বলের উপর সবলের আক্রমণ ঠেকানোর মত কোন প্রতিষেধক ।

অস্ত্রের বিস্তার রোধ, বন‍্যপ্রাণী ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে হবে মানুষকে। সেদিন পৃথিবী জীবাণু মুক্ত হবে ।

লেখকঃ কবি

সম্পাদক: শাহ সুহেল আহমদ
প্যারিস ফ্রান্স থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: