সোমবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

রাজনীতির সমীকরণে ফ্রান্স বাংলাদেশ




  • আব্দুল ওয়াদুদ ময়নুল

২০১৭ সালে ফ্রান্সের জাতীয় নির্বাচনের তখন বাকী মাত্র তিন সপ্তাহ। ফরাসি নাগরিকরা এ নির্বাচন নিয়ে তেমন আবেগ উৎকণ্ঠায় না থাকলেও এখানে  বসবাসরত অভিবাসীরা খুব উদ্বিগ্ন। কারণ, নতুন সরকারের দেশ পরিচালনার উপর নির্ভর করবে  প্রবাস জীবনের সফলতা, চাওয়া এবং পাওয়া। সবার মুখে মুখে একই প্রশ্ন, কট্রর ডানপন্থী “লো-পেন” ক্ষমতায় গেলে আমাদের ভাগ্যাকাশে কালো মেঘ বয়ে আসবে।

মাদার অফ হিউম্যানিটির দেশে জন্মেছি বলে রাজনীতি না করেও রাজনৈতিক ধ্যান ধারণা মোটেও কম বলা ঠিক হবেনা। আমাদের দেশীয় সমাজের সাথে হাঁটায়, কথায়; চলাফেরায় শুধু ফ্রান্সের নির্বাচন প্রসঙ্গে আলোচনা। কে নির্বাচিত হলে কী হবে, বা কী হবেনা। যদিও আমি সে দেশের নাগরিক তখন হইনি, তাই আমার ভোটাধিকারও নেই। একটি ফরাসী বেকারীতে কাজ করি বিধায় বেশিরভাগ ক্রেতা ফরাসি। পরিচিত ক্রেতা আসলে নির্বাচন সংক্রান্ত প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতাম সবার আগে। কেউ উত্তর দিতো, আবার কেউ এড়িয়ে যেত। এড়িয়ে যাওয়ার সংখ্যাই বেশি। আমার বেকারির মালিককে একদিন জিজ্ঞেস করছিলাম- তার সহজ উত্তর, সারাজীবন বিভিন্ন দেশে চাকরি করেছি আর এখন ব্যবসায়ী। ভোট বা রাজনীতির এসব চিন্তার সময় নাই। তবে এবার ভোট দিতে পারি নতুন কাউকে। আমি অধমের মাথায় তখন নির্বাচন ইস্যুটাই ঘুরপাক খেত। যেন আমি একজন ফরাসি মূলধারার রাজনীতিবীদ।

নির্বাচনের ঠিক দুই সপ্তাহ আগে আমার মালিকের এক বন্ধুর ছেলে আমার সাথে কাজ করতে আসলো। সাদা চামড়ার ছেলেটার চোদ্দ গোষ্ঠীই ফরাসী, বয়স ২৩।  মাত্র তিন ঘন্টা আমার সাথে সে একা কাজ করবে। প্যারিসের বাহিরে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে অধ্যয়নরত ছেলেটা। একটি ডিপ্লোমা করতে প্যারিসে এসেছে ছয় মাসের জন্য। দেখা হওয়ার পর শুরু হলো কুশল বিনিময়। বাংলাদেশের নামই শুনে নাই কখনো। পরিচয় দিতে হয়েছে ভারতের সীমান্তবর্তী একটি ছোট রাষ্ট্র।

কুশল বিনিময়ের পর প্রশ্ন করলাম, “এবারের নির্বাচনে কোন দলের সমর্থক”? সে চমকিয়ে উঠে বলল, আমি তো বলেছি আইনের ছাত্র। রাজনীতি বিষয়ে আমি লেখাপড়া করিনি। আমার এক বন্ধু রাজনীতি বিষয়ে পড়ছে, সে ভাল জানবে এটা। এবার প্রশ্নটা ঘুরিয়ে বললাম, “এবারের নির্বাচনে কাকে ভোট দিবে”? এবার সুন্দর উত্তর। “এই সপ্তাহে রবিবার আমার নোট বুকে দুই ঘন্টা সময় লিখে রেখেছি এই বিষয়ে গবেষণা করার”। আমার প্রশ্ন-এখানে গবেষণার কী আছে? সে বলল, যেহেতু আমি রাজনীতির উপরে কোন জ্ঞান রাখি না সেহেতু আমি প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্র এবং নির্বাচনী ইশতেহার পড়বো। প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী প্রত্যেকের  জীবনাচরণ ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে অবহিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিব। তার পূর্বে আমি এ ব্যাপারে কিছুই বলতে পারবোনা।

আমি অনেকক্ষণ নিরব রইলাম, অবাক হলাম তার এমন যৌক্তিক চিন্তাধারা দেখে। তাদের সমাজে এরকম চিন্তাধারা আছে বলেই আজ তারা বিশ্বে উন্নত জাতি, তাদের রাষ্ট্র উন্নত। ফরাসি বিপ্লব গোটা মানব সভ্যতাকে নতুনভাবে লিখতে ভুমিকা রেখেছিলো। উনিশ শতকে ফ্রান্স ছাড়িয়ে সারা ইউরোপে এবং বিশ্বে নতুন ভাবধারার সূচনা করেছিল এই বিপ্লব। এই দেশে তো এমন চিন্তাধারার লোক জন্ম হবেই। এবং তাঁদের চিন্তাধারা এমনটা হওয়ারই কথা।

কিন্তু আজ আমার দেশের দিকে তাকালে দুঃখ হয়। শুধু রাজনৈতিক ইস্যুতে পুরো বাংলাদেশে আজ অশান্তির ছায়া। এই অশান্তির ছায়া যে কোন দলের আমলেই বিরাজমান থাকে। প্রতিপক্ষকেই ঘায়েল করতে মরিয়া হয়ে উঠে থাকেন ক্ষমতাসীন রাজনীতিবীদদের এক বিরাট অংশ। যেন কাদা ছোড়াছুড়ি চর্চা করা হয় সাধারণ কর্মী থেকে আমলা পর্যন্ত। যার কারণে ইদানিং রাজনীতিবীদের চেয়ে চামচাদের সংখ্যা বেশি। এই চামচাদের কারণে সমালোচিত ও অবমূল্যায়িত হতে হয় প্রত্যেকের দলের ত্যাগী কর্মীদের। কিশোরকাল থেকে রাজনীতি শুরু, শেষ নেই। শিক্ষিত, অশিক্ষিত, ছাত্র, অছাত্র এবং প্রতিটি পেশার লোকই রাজনীতি করতেই হবে। যেন এটা একটা ফ্যাশন। রাজনীতি না করলে বা সমর্থন না করলে তুমি সমাজ বিচ্ছিন্ন বা আদর্শহীন। রাজনীতিবীদের তদবির ছাড়া তুমার প্রতিটি কাজই অচল। একেকটা মূল সংগঠনের ভেতরে অগনিত অঙ্গ সংগঠনে চারদিকে সয়লাব। যে যেদিকে পারছে নতুন অঙ্গসংগঠনের নাম ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছে। আর এর একটি “পদ” পেতে মরিয়া রাষ্ট্রের প্রায় সকল রাজনৈতিক কর্মী। সবাই নেতা হতে চায়, কর্মী নয়। কর্মী হলেও নেতা হওয়ার লোভে হয়। রাজনীতির রোষানলের শিকার হয়ে প্রায় প্রতিনিয়ত মায়ের বুক খালি হতে হচ্ছে, কেউবা আবার দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে। সব রাজনীতিবীদ যে খারাপ তেমন নয়। প্রত্যেক দলেই খারাপের চেয়ে ভালোর পাল্লা ভারী। এরাই দেশকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এরাই জাতীর শ্রেষ্ঠ সন্তান।

সর্বোপরি একটাই চাওয়া- রাজনীতিটা হোক রাষ্ট্রের উন্নতির জন্য, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জন্য নয়। ছাত্রদের মূলমন্ত্র হোক আগে লেখাপড়া এবং জ্ঞান চর্চা। বিশ্বের প্রথম সারির কাতারে স্থান পাক আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। 

লেখকঃ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ফরাসী নাগরিক।

সম্পাদক: শাহ সুহেল আহমদ
প্যারিস ফ্রান্স থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: