নন্দিত দক্ষিণ সুরমা : ঐতিহ্যের জনপদ
॥ এম. আহমদ আলী ॥
সিলেটের প্রবেশ দ্বার খ্যাত ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ জনপদ দক্ষিণ সুরমা। এক সময় দক্ষিণ সুরমা সিলেট সদর উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। ২০০৫ সালের ২১ মার্চ স্বতন্ত্র উপজেলা হিসেবে দক্ষিণ সুরমা যাত্রা শুরু হয়। তৎকালীন সময়ে দক্ষিণ সুরমার ২৫, ২৬ ও ২৭নং ওয়ার্ড ২০০২ সালে গঠিত সিলেট সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। বর্তমানে দক্ষিণ সুরমার বর্ধিত এলাকা ২৮, ২৯, ৩০, ৪০, ৪১ ও ৪২নং ওয়ার্ড সিলেট মহানগরীর অন্তর্ভুক্ত।
সিলেটের নাগরিক সভ্যতার বিকাশ ও বৃহত্তর সিলেটের যোগাযোগের কেন্দ্র বিন্দু হিসেবে দক্ষিণ সুরমা একটি ঐতিহাসিক স্থান। দক্ষিণ সুরমার জালালপুর ও সিলাম হয়ে ওলিকুল শিরোমণি হযরত শাহজালাল (রহ:) ৩৬০ আউলিয়া নিয়ে সিলেট আগমন করেন। সিলাম ব্রহ্মটিলা নামক স্থানে গৌড় গোবিন্দের যাদুবিদ্যায় পারদর্শী ব্রহ্মদানব শিল পাথর দিয়ে হযরত শাহজালাল (রহ:) ও তাঁর সফর সঙ্গীদের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। হযরত শাহজালাল (রহ:) অলৌকিক ক্ষমতা বলে শিল পাথরকে নীচ দিকে নামতে আদেশ করেন। শিল পাথর আল্লাহর কুদরতে নেমে যায়।জনশ্রুতি রয়েছে এজন্য এই এলাকার নাম সিলাম হিসেবে পরিচিত। ঐতিহাসিক এই শিল পাথর পুকুরের ঘাট,বাড়ির চতুর্দিকে দেয়াল নির্মাণের সময় ব্যবহৃত হতো এই পাথরটি বিলুপ্তপ্রায়। এখনে ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম হযরত শাহ তৈয়ব ছয়লানী (রহ:) এর মাজার রয়েছে। এছাড়াও এই জনপদের অনেক কীর্তিমান ব্যক্তি যুগে যুগে জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে অনন্য অবদান রেখেছেন। পাশাপাশি ভৌগলিক কারণে সারা দেশের সাথে বৃহত্তর সিলেটের সেতু বন্ধন হিসেবে বিবেচিত হয় দক্ষিণ সুরমা। শিক্ষা, সমাজসেবা, চিকিৎসা, রাজনীতি, শিল্প বাণিজ্যসহ সকল ক্ষেত্রেই রয়েছে দক্ষিণ সুরমার কৃতি সন্তানদের অনন্য অবদান।
ঐতিহাসিকদের মতে, দক্ষিণ সুরমার একাংশ যেটি ‘খিত্তা’ পরগণা হিসেবে পরিচিত সেটি এক সময় ছিল সৈনিকদের আবাস। অনেকের মতে, শাহজালালের সফরসঙ্গী ৩ শ’ ৬০ আউলিয়ার পাশাপাশি অনেক সিপাহীও আবাস গেড়েছিলেন এই দক্ষিণ সুরমায়। ফারসী ‘খিত্তা’ শব্দের অর্থ সেনানিবাস। আর দক্ষিণ সুরমার অনেক গ্রামের নামের শেষে ‘খলা’ শব্দ সংযুক্ত আছে (যেমন- খোজারখলা, মোমিনখলা, ভার্থখলা, বাগেরখলা, বারখলা, সদরখলা, মন্দিরখলা ইত্যাদি)। ফারসী ‘খলা’ শব্দের অর্থ শস্য ভান্ডার। গবেষকদের মতে, এসব ঐতিহাসিক শব্দ ভান্ডার, দক্ষিণ সুরমাবাসীর সাহসী মনোভাব, হার না মানা নীতি এবং দক্ষিণ সুরমবাসীর জীবনাচরণ ঐ জনপদের পূর্বপুরুষের সৈনিক জীবনের উত্তারাধিকার ও আভিজাত্যের প্রমাণ বহণ করে।
এই দক্ষিণ সুরমাতেই পাওয়া গেছে বাংলাদেশের প্রাচীনতম শিলালিপি। বাংলাদেশের আদি সভ্যতার বিকাশ বিষয়ক গবেষণার ক্ষেত্রে এই শিলালিপি ব্যাপক অবদান রেখেছে। ইতিহাসে প্রমাণ পাওয়া যায়, প্যারীচাঁদ মিত্রের আমল থেকে সিলেটে সাংবাদিকতায় দক্ষিণ সুরমার মানুষ রেখেছেন অনন্য ভূমিকা। দক্ষিণ সুরমার বাসিন্দা মাওলানা শাখাওয়াতুল আম্বিয়া সম্পাদিত শাহজালাল দর্পণকে বৃহত্তর সিলেটের প্রাচীনতম সাহিত্য সাময়িকী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরবর্তী প্রজন্মে পাকিস্তান আমলে ও বাংলাদেশ আমলেও দক্ষিণ সুরমার কৃতি ব্যক্তিত্বরা রেখেছেন সাংবাদিকতায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা।
দক্ষিণ সুরমার জালালপুরের কৃতি সন্তান মৌলভী মোহাম্মদ দাইম ১৮৬৫ সালে প্রথম মুসলমান হিসেবে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন লাভ করেন। তিনি সিলেট জেলা বারের প্রথম মুসলিম আইনজীবী।
ঔপেনিবেষিক আমল পরবর্তী পাকিস্তান আমলে ভাষা আন্দোলনে দক্ষিণ সুরমার গণমানুষ সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেন। আব্দুল হামিদ রচিত ‘সিলেটের ভাষা আন্দোলন গ্রন্থের বর্ণনা মতে, সে সময় দক্ষিণ সুরমা থেকে কোন মিছিল না আসলে সাহস করে উত্তর সুরমার রাজপথে নামতে কেউ সাহস করতো না। দক্ষিণ সুরমার কৃতি সন্তান পীর হবিবুর রহমানসহ দক্ষিণ সুরমার অনেক কৃতি সন্তান সেদিন সিলেটে ভাষার পক্ষে গর্জে উঠেছিলেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধে দক্ষিণ সুরমার কৃতি সন্তানরা অনন্য অবদান রাখেন । দক্ষিণ সুরমার আলমপুরের কৃতি সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ গুণমনি বিশ্বাস বীর বিক্রম, গোয়ালগাঁওয়ের কৃতি সন্তান হাবিলদার আরব আলী বীর বিক্রমসহ অনেক কৃতি ব্যক্তিত্ব আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখ সমরে রেখেছেন বীরত্বের সাহসী প্রমাণ। মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মরহুম জননেতা আব্দুল হামিদ,মরহুম সিরাজ উদ্দিন আহমদ,আব্দুল মুক্তাদিরসহ অনেকেই সিলেটে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে রাখেন অনন্য অবদান।
মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী বৃহত্তর সিলেটের শহীদ বুদ্ধিজীবীর অন্যতম ডঃ আবদুল মুকতাদির দক্ষিণ সুরমার সিলাম পশ্চিমপাড়ার কৃতি সন্তান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ডঃ মুকতাদির ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ভোরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কোয়ার্টারে পাক হানাদারদের হাতে শহীদ হন ।
একুশে পদকপ্রাপ্ত সুরমাপারের গণমানুষের কবি দিলওয়ার সাংবাদিকতার মাধ্যমেই তাঁর কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। গণকন্ঠের সাংবাদিক হিসেবে তাঁর আগুন ঝরা লেখনীর কথা এখনো লোকমুখে ফেরে। সিলেটে সাংবাদিকতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন এই দক্ষিণ সুরমার সন্তানরাই।সিলেট প্রেসক্লাবের প্রাক্তন সভাপতি সিলামের কৃতি সন্তান বোরহান উদ্দিন খান সিলেটের একজন স্বনামধন্য সাংবাদিক ছিলেন। মোগলাবাজারের বাসিন্দা,সিলেটের প্রাচীনতম সাপ্তাহিক যুগভেরীর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, বর্তমানে নিউইয়র্কের সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকার সম্পাদক মাহবুবুর রহমান ও নৈখাইয়ের বাসিন্দা সিলেট প্রেসক্লাবের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক এহিয়া রেজা চৌধুরী সিলেট প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। সিলেটের প্রথম ডিক্লারেশনপ্রাপ্ত দৈনিক পত্রিকা দৈনিক সিলেটের ডাক এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন দক্ষিণ সুরমার লালাবাজারের ঝাঝর গ্রামের কৃতি সন্তান মুহাম্মদ ফয়জুর রহমান । সিলেটের গণমানুষের কাছে নন্দিত ও জনপ্রিয় অধুনালুপ্ত দৈনিক জালালাবাদীর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদকও ছিলেন দক্ষিণ সুরমার সাবেক বরইকান্দি ইউনিয়ন (বর্তমানে সিটি কর্পোরেশনের ২৫নং) ওয়ার্ডের বাসিন্দা আব্দুল ওয়াহেদ খান। দক্ষিণ সুরমার দাউদপুরের কৃতি সন্তান, মাহবুব রহমান এক সময় সিলেটে সাংবাদিকতার পাশাপাশি ফটো সাংবাদিকতাকে সাংগঠনিক রূপ দিতে অনন্য ভূমিকা পালন করেন। দক্ষিণ সুরমার মোল্লারগাঁও ইউনিয়নের সদরখলা গ্রামের কৃতিসন্তান ‘প্রবাসীর কথা’ লেখক নূরুল ইসলাম দীর্ঘদিন সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় সক্রিয় ছিলেন। তাঁর ভাই মদনমোহন সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি ছিলেন। এছাড়াও সাবেক সংসদ সদস্য এম.এ মুকিত খান, মোল্লারগাঁও ইউনিয়নের স্বনামধন্য সালিশী ব্যক্তিত্ব ছিলেন ওসমান গনি, হাজী মওলুল হোসেন, সারো মিয়া চেয়ারম্যান, মোঃ মকন মিয়া চেয়ারম্যান।
সাহিত্য সাধনায় দক্ষিণ সুরমার গৌরব গণমানুষের কবি দিলওয়ার। ‘পদ্মা মেঘনা সুরমা যমুনা গঙ্গা কর্ণফুলি, তোমাদের বুকে আমি নিরবধি গণমানবের তুলি’- এই শ্বাশত উচ্চারণের মাধ্যমে সিলেটের প্রাণ সুরমা নদীকে অথবা ‘ক্বীন ব্রীজের সুর্যোদয়’ কবিতার মাধ্যমে সিলেটের ঐতিহাসিক ক্বীন ব্রীজকে বাংলা কাব্যে অমরত্ব দান করেছেন ভার্থখলার বাসিন্দা গণমানুষের কবি দিলওয়ার খান। এই মহর্ষি কবির পাশাপাশি দেশের অন্যতম সেরা কবি, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপপরিচালক মুকুল চৌধুরী কাব্য সাধনার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে দক্ষিণ সুরমার ভাবমূর্তিকে অন্যরকম গরিমায় প্রকাশ করেছেন।
দক্ষিণ সুরমায় লোক সঙ্গীতের এক অনন্য ধারা যুগ যুগ ধরে বহমান। গণমানুষের কবি দিলওয়ারের ‘তুমি রহমতের নদীয়া’ গানটি দিয়েই যাত্রা শুরু হয়েছিল সিলেট বেতারের। সে সময় দক্ষিণ সুরমার শব্দসৈনিক সিলেটের প্রখ্যাত মরমী বাউল সাধক আব্দুল খালিক ছিলেন বাংলাদেশ বেতার সিলেট এর প্রতিষ্ঠাকালীন তালিকাভূক্ত সঙ্গীত শিল্পী। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করেন।দিনে ৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের কৈলাশহর,ত্রিপুরা, আসামসহ বিভিন্ন ক্যাম্পে দলীয় সংগীত পরিবেশন করে শরনার্থী ও মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করেন। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক দেওয়ান ফরিদ গাজী আব্দুল হামিদের কাছে সীমান্তের খবর পৌঁছাতেন।দক্ষিণ সুরমার কৃতি সন্তান ‘কৃষ্ণ আইলা রাধার কুঞ্জে ফুলে পাইলা ভ্রমরা’- বাংলাদেশ কাঁপানো এই আধ্যাত্মিক সঙ্গীতের রচয়িতা মরমী গীতি কবি সুফী সাধক আরকুম শাহ দক্ষিণ সুরমার তেতলি ইউনিয়নের ধরাধরপুর আরকুম নগরের কৃতি সন্তান। দেহতত্ত্বের গাণের প্রাণ পুরুষ হিসেবে বিবেচিত বরইকান্দি গ্রামের বাসিন্দা গীতিকার মরহুম সিদ্দিকুর রহমান দেশের শীর্ষ মরমী সঙ্গীত সাধকদের অন্যতম।
রাজনীতির ক্ষেত্রে এই দক্ষিণ সুরমার রয়েছে গৌরবোজ্জল অতীত ঐতিহ্য। অভিভক্ত ভারত বর্ষে আসাম প্রদেশের মন্ত্রী হয়েছিলেন দক্ষিণ সুরমার মোগলাবাজারের বাসিন্দা বসন্ত কুমার দাস। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রী সভায় শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন দক্ষিণ সুরমার নৈখাইয়ের বাসিন্দা আজমল আলী চৌধুরী। সিলেটে বিসিক শিল্প নগরী প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। মোগলাবাজারের কৃতি সন্তান মরহুম গৌছ মিয়া, মরহুম চুনু মিয়া চেয়ারম্যান, সোনা মিয়াসহ অসংখ্য সালিশ ব্যক্তিত্ব ছিলেন।
দক্ষিণ সুরমার বিরাহিমপুরের কৃতি সন্তান, নৌবাহিনীর সাবেক প্রধান রিয়ার এডমিরাল মাহবুব আলী খান উপ প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং যোগাযোগ ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে ক্ষমতার শীর্ষে আরোহন করেছিলেন। তাঁর সুযোগ্য কন্যা বিশিষ্ট চিকিৎসক জুবায়দা রহমান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক ৩ বারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুযোগ্য সন্তান বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্ত্রী। সিলামের কৃতি সন্তান বিশিষ্ট সালিশ ব্যক্তিত্ব মরহুম নছির মিয়া চেয়ারম্যান সিলেট অঞ্চলের স্বনামধন্য ব্যক্তি ছিলেন। এছাড়াও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অধিনে ১নং সেক্টরে জেড ফোর্সের অধিনে চট্টগ্রাম হালিশহরে সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন সিলাম শেখপাড়ার কৃতি সন্তান ল্যান্সনায়েক বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ গৌছ আলী, সিলাম পশ্চিমপাড়া বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ বাবুল মিয়া শমসের নগর বিমানবন্দর এলাকায় পাকহানাদার বাহিনী সাথে সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন। এছাড়াও শহীদ আব্দুল আজিজসহ অসংখ্য বীর শহীদরা যুদ্ধে অংশ নিয়ে এই বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছেন। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর সিলেটের পরিচালক ছিলেন পশ্চিমপাড়ার মরহুম এম এন আনোয়ার। জনতা ব্যাংকের সহকারি মহাব্যবস্থাপক ছিলেন আবুল হোসেন।
লালাবাজারের বাগরখলা গ্রামের কৃতি রাজনীতিবিদ পীর হবিবুর রহমান এদেশে ত্যাগী রাজনীতির পথিকৃৎ। দক্ষিণ সুরমার কদমতলীর বাসিন্দা গণতন্ত্রী পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক জননেতা মরহুম আব্দুল হামিদ নিঃস্বার্থ রাজনীতির অন্যতম পুরোধা। জাসদ রাজনীতির প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম আব্দুন নূর মাস্টার ছিলেন দক্ষিণ সুরমার ভার্থখলা গ্রামের বাসিন্দা। এছাড়াও লালাবাজারের কৃতিসন্তান, সালিশ ব্যক্তিত্ব আব্দুল ওয়াহাব খোকা খান, বীর মুক্তিযোদ্ধা হুশিয়ার আলী চেয়ারম্যান।
ক্রীড়াক্ষেত্রে দক্ষিণ সুরমার রয়েছে গৌরবোজ্জল অবদান। দক্ষিণ সুরমার জালালপুরের মরহুম ক্যাপ্টেন আব্দুল হামিদ ছিলেন এক সময়ের কৃতি ফুটবলার। তার স্ত্রী রাণী হামিদ বিশ্ববিখ্যাত দাবাড়ু। তাদের সন্তান কায়সার হামিদ এক সময়ের মাঠ কাঁপানো ফুটবলার। সিলেটের ফুটবল হকি সকল ক্ষেত্রে রয়েছে বৃহত্তর সিলেটের ক্রীড়াঙ্গণেও রয়েছে দক্ষিণ সুরমার কৃতি খেলোয়াড়দের রয়েছে অনন্য অবদান ।
সিলাম ইউনিয়নের বিরাহিমপুরের ঐতিহ্যবাহী খানবাহাদুর পরিবারের অগণিত কৃতি সন্তান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গণে অনন্য অবদান রেখেছেন। এই পরিবারের খানবাহাদুর গজনফর আলী খান ছিলেন আসাম বেঙ্গলের প্রথম মুসলিম আইসিএস, যিনি পরবর্তীতে নাগপুরের বিভাগীয় কমিশনার। ডাঃ আসদ্দর আলী খান ছিলেন বিহারের সিভিল সার্জন। এই ঐতিহ্যবাহী পরিবারের ডাঃ সিকান্দর আলীর কন্যা আইরিন খান আর্ন্তজাতিক মানবাধিকার সংস্থা এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাবেক মহাসচিব ছিলেন ।
রেঙ্গা দাউদপুরের ঐতিহ্যবাহী পরিবার, অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট খান বাহাদুর গৌছ উদ্দিন চৌধুরীর সন্তানদের প্রায় সকলেই জাতীয়ভাবে সুপরিচিত। পুলিশের সাবেক আইজিপি মরহুম ই.এ. চৌধুরী ছিলেন পূবালী ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং পুলিশ প্রশিক্ষণ একাডেমী সারদা’র প্রিন্সিপাল ছিলেন । ইমাম উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা, রেলওয়ের মহাপরিচালক ও সচিব। সাবেক সংসদ সদস্য আলহাজ্ব শফি আহমদ চৌধুরী দেশের অন্যতম রপ্তানীমুখী ঔষধ কোম্পানী এলভার্ট ডেভিড এর কর্ণধার এবং বিএনপির সাবেক কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য। এই পরিবারের সর্বশেষ প্রজন্ম ডাঃ নিয়াজ আহমদ চৌধুরী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ।
বাংলাদেশে হৃদরোগ চিকিৎসার পথিকৃৎ, দক্ষিণ সুরমার কুচাইয়ের বাসিন্দা জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার (অবঃ) মরহুম ডাঃ এম.এ মালিক ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা। তাঁর কন্যাও হৃদরোদ বিশেষজ্ঞ ফজিলাতুন নেছা মালিক জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিনিয়র চিকিৎসক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নাক-কান-গলা বিভাগের সাবেক প্রধান প্রফেসর ডাঃ মোহাম্মদ আলাউদ্দিনও কুচাইয়ের বাসিন্দা। দেশে লিভার চিকিৎসার পথিকৃৎ, রাজধানীর গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা ও সিলেটের লিভার ফাউন্ডেশন হাসপাতালের প্রধান প্রফেসর ডাঃ মোহাম্মদ আলী দক্ষিণ সুরমার লালাবাজার ইউনিয়নের খতিরা গ্রামের কৃতিসন্তান। ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের সাবেক চীফ সার্জন কর্ণেল ডাঃ জিয়াউদ্দিন দক্ষিণ সুরমার বরইকান্দি গ্রামের কৃতি সন্তান। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর এমএ আহবাব (কায়স্তরাইল) জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিক্যাল কলেজের সাবেক উপাধ্যক্ষ প্রফেসর লোকমান আলী (ধরাধরপুর), বিশিষ্ট চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ সিরাজ উদ্দিন, সিলেট বিএমএ’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও দক্ষিণ সুরমা সমাজকল্যাণ সমিতির সাবেক সভাপতি ডাঃ ময়নুল ইসলাম (মোল্লারগাঁও), নর্থ ইস্ট মেডিক্যাল কলেজের পরিচালক, কিডনী বিশেষজ্ঞ ডাঃ নাজমুল ইসলাম (মোল্লারগাঁও)।
দক্ষিণ সুরমার বরইকান্দি ইউনিয়নের বাসিন্দা ড. কবির চৌধুরী যুক্তরাজ্যে এমপি পদপ্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তিনি যুক্তরাজ্যের মানচেষ্টার ও নটিংহাম ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা করেন। শাবিপ্রবির ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করে অবশেষে সিলেট মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।বড়ই শান্তির বিশিষ্ট শালিস ব্যক্তিত্ব মরহুম ছইল মিয়া,কনা মিয়া চেয়ারম্যান,হাজী তৈমুর খান বাদশাই চেয়ারম্যান,গোলাম হোসেন চেয়ারম্যান।
দেশের সামরিক প্রশাসনের পাশপাশি দক্ষিণ সুরমার অনেক কৃতি ব্যক্তিত্ব বেসামরিক প্রশাসনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। সুদূর বৃটিশ আমল থেকে প্রশাসনের সুউচ্চ পর্যায়ে অধিষ্টিত হয়েছিলেন। সাবেক সমাজ কল্যাণ সচিব ক্ষণদা মোহন দাস দক্ষিণ সুরমার দাউদপুর ইউনিয়নের তিরাশিগাঁওয়ের বাসিন্দা। পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ডঃ আনোয়ার আলী দক্ষিণ সুরমার মোল্লারগাঁও ইউনিয়নের লতিপুরের কৃতি সন্তান। সাবেক সচিব ইমাম উদ্দিন চৌধুরীও দাউদপুরের সন্তান। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মাওলান আব্দুল মান্নান দক্ষিণ সুরমার দাউদপুরের কৃতি সন্তান। বর্তমান সময়ে শহীদ বুদ্ধিজীবী ডঃ আবদুল মুকতাদিরের কন্যা ইলোরা মুক্তাদির পেট্রোবাংলার জিএম এবং তার স্বামী শামসুল ইসলাম মেহেদী- স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব হিসেবে কর্মরত রয়েছে। সাবেক যুগ্ম সচিব সৈয়দ মাহবুব জামিল (ধরাধরপুর), উপ সচিব এমদাদুল হক সিপার (জালালপুর), সহকারী কমিশনার (ম্যাজিস্ট্রেট, খাগড়াছড়ি) জাকির আহমদসহ অনেকেই প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।
দক্ষিণ সুরমার মাটিতে অনেক বিশ্ববরেণ্য আলেম ওলামার জন্ম হয়েছে। তাদের মধ্যে অবিভক্ত ভারত বর্ষের তাবলীগ জামায়াতের তৎকালীন আমীর মাওলানা শায়েখ বদরুল আলম দক্ষিণ সুরমার কৃতি ব্যক্তিত্ব। শায়েখ মাওলানা হরমুজ উল্লাহ (সায়দা হুজুর) দক্ষিণ সুরমার দাউদপুরের কৃতি সন্তান।
দক্ষিণ সুরমা অনেক কৃতি ব্যক্তিত্ব দেশের শিল্প ও বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। স্বাধীনতা উত্তরকালে দেশে চা শিল্প বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন- দক্ষিণ সুরমার মোমিনখলার বাসিন্দা, দেশের বিশিষ্ট শিল্পপতি মোঃ মশাহিদ আলী। জাতীয় পার্টি নেতা আলহাজ্ব আতিকুর রহমান আতিক প্রিন্স গ্রুপের কর্ণধার।
সিলেটেও শিল্প বাণিজ্যে দক্ষিণ সুরমার কৃতি সন্তানরা অনন্য অবদান রাখেন। দি সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, সাবেক এমপি ও বিএনপি’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা খন্দকার আব্দুল মালিক দক্ষিণ সুরমার আহমদপুরের কৃতি সন্তান। তাঁর সুযোগ্য সন্তান খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি সরকারের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী। সিলেট চেম্বারের সাবেক সভাপতি স্টেশন রোডের সুপরিচিত মরিয়ম মিলের অন্যতম স্বত্বাধিকারী আলহাজ্ব বদরুল ইসলাম (মোল্লারগাঁও) ও মরহুম মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন (জালালপুর) এই দক্ষিণ সুরমার কৃতি সন্তান। দেশে বিদেশে প্রসিদ্ধ সিলেটের ঐতিহাসিক কাজিরবাজার ও মোহাম্মদ মকন উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের প্রতিষ্ঠাতা দক্ষিণ সুরমার মোল্লার গাঁও ইউনিয়নের গোয়ালগাঁওয়ের কৃতি সন্তান মরহুম মোহাম্মদ মকন মিয়া। এছাড়া, সিলেট নগরীর অভিজাত বিপণী বিতান থেকে শুরু করে প্রায় সবগুলো মার্কেট ও বাজারের ব্যবসায়ীদের বেশীর ভাগই এই দক্ষিণ সুরমার বাসিন্দা।
এছাড়া প্রবাহমান সুরমা নদীর কুলঘেষা প্রাচীন জনপদ দক্ষিণ সুরমার জালালপুরে রয়েছে প্রায় দু’শ বৎসরের প্রাচীন নরেশ সাহ সেনাপতির বাড়ী, লালাবাজারে রয়েছে বাগেরখলা বাবুর বাড়ী, সিলামের বিরাহিমপুরে রয়েছে ১০০ বিঘা জমির উপর সুবিশাল খান বাহাদুর আছদ্দর আলীর উত্তরসুরী রিয়ার এডমিরাল মাহবুব আলী খানের বাড়ী, তেতলী, সিলাম ও লালাবাজার ইউনিয়নের মধ্যখানে ঐতিহ্যবাহী ছ’কুড়ি টিলা, ন’কুড়ি বিল নামে খ্যাত, ছাপড়া বিল, উপজেলার একমাত্র জন অধ্যুষিত ঐতিহাসিক সিলাম বাদশাহী টিলা খেলার মাঠ, জালালপুরের সুজার দীঘি, প্রায় ১১ একর জমির উপর করিমপুর দীঘি, কমার্শিয়াল বিল্ডিং, ১৯৬২ সালের ৮ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় গোটাটিকর বিসিক শিল্পনগরী, শিববাড়ী মন্দির, ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় সিলাম চকেরবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় সিলাম পদ্মলোচন বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, প্রাচীনতম টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ, ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় সিলেট পলিটেকনিক ইন্সস্টিটিউট, সিলেট প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় লিডিং ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস দক্ষিণ সুরমার কামালবাজারে অবস্থিত, সিলেট রেলওয়ে স্টেশন ১৯১৫ সালে যাত্রা শুরু করে, দক্ষিণ সুরমা রয়েছে ১টি সরকারি হাইস্কুল, ২টি সরকারি কলেজ, ২টি বেসরকারি মহিলা কলেজ সহ বেশ কয়েকটি বেসরকারি কলেজ রয়েছে। এছাড়াও সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, ডিআইজি’র কার্যালয়, সিলেট শিক্ষা বোর্ড, পাসপোর্ট অফিস, ২টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র সহ অসংখ্য স্কুল, কলেজ, মাদরাসা রয়েছে।
এই প্রবন্ধটি দক্ষিণ সুরমার ইতিহাস ঐতিহ্যের কোন গবেষণালব্ধ বা সুসন্নিবেশিত রূপ নয়। অনিচ্ছাকৃত দক্ষিণ সুরমার অনেক কীর্তিমান ব্যক্তিত্বের নাম ভুলক্রমে এই প্রবন্ধে না আসাই স্বাভাবিক। ভবিষ্যতে অন্য কোন সংখ্যায় সংশোধিত আকারে প্রবন্ধটি বৃহৎ কলেবরে প্রকাশের প্রত্যাশা রইল।
লেখক– এম. আহমদ আলী, সিনিয়র সাংবাদিক।





