বুধবার, ১৭ অগাস্ট ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ২ ভাদ্র ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

‘কদম আলীর বিষের বোতল’ : এক প্রতীকি নবজাগরণ




বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল

সাহিত্যে কবিতার আবেদন বহুমাত্রিক। কবিতাকে বলা হয় শিল্পীর মানসসন্তান। এই শিল্পী কবি হয়ে থাকেন। তিনি সত্যিকার অর্থেই জীবনশিল্পী। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের ভিন্নমাত্রিক বিষয়কে তিনি তার অন্তর্চোখ দিয়ে অবলোকন করেন। কবিতার মাধ্যমে উপমা, উৎপ্রেক্ষা এবং চিত্রকল্পের দ্যোতনায় বাস্তবতাকে তিনি রাঙিয়ে তুলেন। ছন্দ এবং শব্দের জাদুতে কবিরা এমন একটি আবেদনময় অবস্থার সৃষ্টি করেন, যা পাঠককে কেবল আনন্দই দেয়নি, বরং পাঠকের হৃদয়ে ঝড় তুলে। কখনো কখনো পরিবর্তনের দীপ্ত অঙ্গীকার বুকের মধ্যে জাগ্রত করে দেয়। একজন কবির জন্য এটা যেমন বেশ আনন্দের, গর্বের, তেমনই তা সামাজিক ক্ষেত্রেও রাখে গৌরবের অবদান। তাই তো কবিতা কেবল অন্তরের আর্তনাদ কিংবা হাহাকার নয়, বরং এটা অনিবার্য জাগরণের একটি আলোকরেখা। আবার কবিতা কখনো কখনো হয়ে ওঠে সবুজে সবুজে ভাসমান এক সৌন্দর্য গাঙ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের হাত ধরে যে সবুজ কাননের জন্ম হয়েছে, তাকে কালের পরিক্রমায় এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন ভাবুক কবিরা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাববাদ এবং কাজী নজরুলের প্রেম-দ্রোহ যেভাবে বাংলা কবিতায় এক অনন্য জোয়ার ও জাগরণ সৃষ্টি করেছেন, তাঁকে বিবেচনা কিংবা মূল্যায়ন করতে হয় কালের বিবেচনায়। অবশ্যই এ ক্ষেত্রে তারা যথার্থই সফল যে, তাঁদের চিন্তাধারার ফসলই অসংখ্য কবি। জীবনের বহুরুপীতাকে উপলব্ধি করে যেসকল কবিকে অমরত্বের দিকে হাঁটতে হয়েছে, তাঁদেরকেই তো ইতিহাস বিবেচনা করে অনন্য প্রশংসায়। জৈবনিক ভাষা এবং আবেগের মিশ্রণ যাদের ব্যক্তিচেতনাকে উন্মোচন করে দিয়েছিল, তারাই তো কবিতায় গেয়েছেন জীবনের গান। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’র কালের যাত্রার ধ্বনি আর কাজী নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ যেন দু’টি প্রান্তিক বিষয়কে একাকার করে ফেলেছে। জীবনের উপলব্ধিতে যে সত্যের প্রকাশ ঘটেছে আর এ সত্য থেকে যে বিদ্রোহের সৃষ্টি হয়, এই দু’জন কবি যেন সাহিত্যকে জীবন্ত করে তুলেছেন। যার আহবান, আবেদন কিংবা প্রতীক্ষা কখনোই শেষ হবার নয়। এ যেন অনন্তকে বারবার ডাক দেয় হিমেল হাওয়ায় ভেসে যেতে। মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘কপোতাক্ষ নদ’র স্মৃতিকাতরতায় মেশানো নস্টালজিক চেতনা আর জীবনানন্দের আবার আসিবো ফিরে–এই সুর যেন এক অনাগত সত্যকেই প্রস্ফুটিত করে তুলেছে। উত্তরাধুনিক কবিরা এটাকে কখনো উপলব্ধি করতে না পারলেও জীবনবাদী কবিরা এটাকে মর্মবেদনায় অন্তঃকরণে প্রবেশ করিয়েছেন। এটা তাঁদের সর্বৈব সফলতা ছাড়া আর কী হতে পারে?

ত্রিশের দশক থেকে ষাটের দশকের কবিদের কবিতায় আদর্শবাদী চিন্তাচেতনার উন্মেষ লক্ষ করা যায়। এর বিপরীতেও ভিন্নমাত্রিক চিন্তারও পরিস্ফুটন হয়েছে শৈল্পিকভাবে। এই দলে আল মাহমুদ, ফররুখ আহমদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, জাহানারা আরজু, শহীদ কাদরী, সাযযাদ কাদির, আলাউদ্দিন আল আজাদ, রফিক আজাদ, সৈয়দ শামসুল হক, হাসান হাফিজুর রহমান, আল মুজাহিদী, আসাদ চৌধুরী, আহমদ রফিক, হেলাল হাফিজই অগ্রগণ্য। এছাড়াও এ সময়ী কবিদের মধ্যে কবি আফজাল চৌধুরী ও কবি দিলওয়ার ছিলেন সিলেটের সাহিত্যক্ষেত্রে অগ্রপথিক। কল্যাণব্রত ও গণ মানুষের চেতনা নিয়ে এই দুই কবি জাতীয় পর্যায়েও কবিতার নেতৃত্ব দিয়েছেন। এছাড়াও বিভিন্ন দশকে কবিতার চর্চায় সিলেটের কবিরা রেখেছেন সৃজনী অবদান। তাদেরই একজন কবি তারানা রেজা চৌধুরী।

কবি তারানা রেজা চৌধুরীর জন্ম সিলেটের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। পিতা মরহুম মাহমুদুর রেজা চৌধুরী প্রাক্তন ডি.জি.এম, সোনালী ব্যাংক। মাতা মরহুমা রাবিয়া চৌধুরী। তিনি একজন বিদূষী মহিলা ছিলেন। অবিভক্ত ভারতের মেঘালয়ার রাজধানী শিলং-এ তাঁর লেখাপড়া এবং বেড়ে ওঠা। দাদা রফিকুর রেজা চৌধুরী ছিলেন ভারতের আসাম রাজ্যের করিমগঞ্জের দেওরাইলের বিশিষ্ট জমিদার। সেই সুবাদে কবির দাদাবাড়ি ভারতে। ১৯৪৭-এর দেশ বিভাগের সময় লেখকের পিতা পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সাথে সিলেটে স্থায়ী নিবাস স্থাপন করেন। তারানা রেজা চৌধুরীর নানা আবদুল মাকিত চৌধুরী অবিভক্ত আসামের রাজধানী শিলং-এর প্রথম মুসলমান এসপি ছিলেন। তিনিও ছিলেন লেখক। তাঁর গ্রন্থ ‘যিন্দারোদের আকাশ ভ্রমণ’ অনেক উচ্চমাত্রার বই।

কবি তারানা রেজা চৌধুরীর ছাত্রজীবন শুরু হয় কুমিল্লার ফয়জুন্নেসা গার্লস স্কুলে। পরবর্তীতে ঢাকার ধানমণ্ডি গার্লস স্কুলে অধ্যয়ন শেষে সিলেটের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী কিশোরী মোহন গার্লস হাইস্কুল থেকে প্রথম বিভাগে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাশ করেন। তিনি পরবর্তীতে সিলেট মহিলা কলেজ (বর্তমান সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ) থেকে এইচএসসি পাশ করেন। এরপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সিলেট সরকারি ডিগ্রি কলেজ (বর্তমান এমসি কলেজ) থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

কবি তারানা রেজা চৌধুরী এমসি কলেজে অধ্যয়নকালীনই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর স্বামী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ইসমত আহমেদ চৌধুরী বিপি। তারানা রেজা চৌধুরী অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন বিধায় লেখাপড়ার প্রতি ছিল তাঁর বিশেষ আগ্রহ। এ কারণে তিনি বিয়ের পরও অধ্যয়ন চালিয়ে যান। পরবর্তীতে তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

স্বামীর চাকরির বদলীর সুবাদে কবি তারানা রেজা চৌধুরীকে তাঁর দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করতে হয়েছে। এজন্য তাঁর জীবনাভিজ্ঞতা এবং উপলব্ধি বহুধা চেতনায় বিভক্ত হয়েছে। স্বামী ঢাকায় বদলি হলে তিনি স্কলাস্টিকা স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এর আগে তিনি বি এড কলেজ ময়মনসিংহ থেকে বি.এড সম্পন্ন করে ফার্স্ট ক্লাস অর্জন করেন। পরবর্তীতে ইন্টারন্যাশনাল কারিকুলামের উপর আরেকটি বি.এড সম্পন্ন করে শিক্ষকতা চালিয়ে যান। অদম্য প্রেরণায় উচ্ছ্বসিত তারানা রেজা চৌধুরী শিক্ষাসেবায় রেখেছেন অনন্য ভূমিকা। স্বামীর চাকরি এবং বদলির কারণে তিনি যে শুধু দেশের বিভিন্ন স্থান ঘুরেছেন তা’ নয়, বরং পার্বত্য চট্টগ্রামের আনাচে-কানাচে অনেক বিপদ সঙ্কুল জায়গায় দীর্ঘদিন স্বামীর সাথে তাঁকে অবস্থান করতে হয়েছে। এটা যেমন তাঁর সাহসিকতা এবং মনোবলকে বাড়িয়ে দিয়েছে, তেমনই তিনি জীবনে নতুন প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়েছেন। এসময় তিনি দেখেছেন অসংখ্য মানুষের হাহাকারময় জীবন। তবে তারানা রেজা চৌধুরী সেসময় সৃজনশীলতায় সক্রিয় না হলেও নিজের অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে উপলব্ধি করেছেন–আর্তপীড়িত মানুষের কষ্ট এবং যন্ত্রণা চোখে দেখা যে জীবনকে তিনি অবলোকন করেছেন, তার আঁচড় তিনি কখনো ভুলে যেতে পারেননি। তাই তো সময়ের বিবেচনায় তিনি কলমকেই শানিত হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেন। একজন সেনা কর্মকর্তার সহধর্মিণী হিসেবে তিনি প্রায়ই সেনাবাহিনীর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গীতিনাট্য লেখা এবং স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেছেন। এর মধ্যে সেনা পরিবার কল্যাণ সংস্থা সবিশেষ উল্লেখ্য। এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে গিয়ে তিনি যেভাবে নিজেকে অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ করেছেন, তেমনই তিনি হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হয়েছিলেন নিজের মাঝে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনাকে। আর এজন্যই তিনি সে সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিলেন।

তারানা রেজা চৌধুরী চাকরি ছেড়ে দেবার পরপরই সাহিত্যাঙ্গনে সক্রিয় হন। লেখালেখিতেই তিনি নিজের আনন্দকে খোঁজে নেন। লেখালেখিকে শখ, নেশা এবং বিনোদন হিসেবে গ্রহণ করে তিনি যেভাবে নিজেকে পরিতৃপ্ত করছেন, তেমনই তাঁর কলম থেকে বেরিয়ে আসছে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের নানা অসঙ্গতি। তবে তার সবচেয়ে মৌলিক বিশেষত্ব হচ্ছে–সৃজনশীলতাকে তিনি একটি নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে মনে করেন। ব্যক্তির মূল্যবোধ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাকে প্রকাশ করার জন্য তিনি কলমকেই বেছে নেন একমাত্র অবলম্বন হিসেবে। তিনি এ ক্ষেত্রে সফল হয়েছেন।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইসমত আহমেদ চৌধুরী ও তারানা রেজা চৌধুরী দম্পতির দু’ পুত্র সন্তান। প্রথম পুত্র ইরেশ আহমেদ চৌধুরী সিডনির মেক্কোরি ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ সম্পন্ন করে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করছেন। দ্বিতীয় পুত্র জোহেব আহমেদ চৌধুরী অধ্যয়ন শেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডালাস-এ বসবাস করছেন। ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত সুখী ও পরিতৃপ্ত তারানা রেজা চৌধুরী একটি সুন্দর সমাজ নির্মাণের স্বপ্ন দেখেন। যা’ তাঁর কবিতায় দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

শিক্ষকতা থেকে অবসরে যাওয়ার পর তারানা রেজা চৌধুরী নিরলসভাবে সাহিত্যচর্চা করেই যাচ্ছেন। কবিতা ছাড়াও তিনি প্রবন্ধ, গল্প, ছড়া এবং জীবনাভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ বিষয়বস্তু নিয়ে লিখতে বেশি পছন্দ করেন। এ পর্যন্ত তাঁর লেখা বিভিন্ন স্থানীয়, জাতীয় পত্র-পত্রিকা এবং সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। ‘কদম আলীর বিষের বোতল’ তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ। একজন শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক, সমাজচিন্তক, সমাজসেবী কিংবা মননচারী লেখিকা হিসেবে তিনি যে সমাজ এবং রাষ্ট্রকে চিন্তা করেন–তারই প্রকাশ ঘটেছে এ কাব্যগ্রন্থে।

কবি তারানা রেজা চৌধুরী শুদ্ধ চেতনার বৈপ্লবিক সুর। তাঁর কবিতায় পরিবর্তনের দীপ্ত অঙ্গীকারের আভাস বিদ্যমান। অত্যন্ত ব্যঙ্গাত্মকভাবে তিনি বিষয়বস্তু উপস্থাপন করেছেন, তা যেন বিবেকের বদ্ধ দুয়ারকেই খোলে দেয়। সমাজের পরতে পরতে যে অনৈতিকতা, মূল্যবোধের অবক্ষয়তা এবং ব্যবস্থাপনার অসারতা–তা’ তিনি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন ‘কদম আলীর বিষের বোতল’ কাব্যগ্রন্থে। যেখানে তিনি ব্যঙ্গাত্মকভাবে প্রকাশ করেছেন, যা ধ্বংসের হাতিয়ার, তাতেই যেন নকলকে প্রলেপে লেপ্টে দেয়া হয়েছে। অথচ এটা কখনো কাম্য ছিল না। তাই তিনি কবিতায় বলতে পেরেছেন–

‘কিছুক্ষণ পর কদম চোখ খুলে,
অস্পষ্ট স্বরে শুধু একটি কথাই বলে,
‘সব কিছুতে বিষ, শুধু বিষে বিষ নাই’
শালার জীবন, অভাগা কদম আলী।’
(কদম আলীর বিষের বোতল)

এ কবিতা কেবল এক টুকরো বিনোদনের উপকরণ নয়, বরং তিনি আত্মপ্রবঞ্চিত জাতির মুখোশ খোলে দিয়েছেন এ কবিতার মাধ্যমে। কবি এ থেকে উত্তরণ চান, যেনো সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি কাঠামো চলে তার আপন নিয়মে, আপন বৈশিষ্ট্যে।

কবি তারানা রেজা চৌধুরীর মানবিক আবেদন খুবই স্পষ্ট। ন্যায়-নীতি, মানবিকতা এবং মনুষ্যত্ব তাঁর চিন্তাভাবনার স্মারক। বর্ণভেদ কিংবা জাতিভেদ তার মননে যেন অসার হিসেবেই ধরা দেয়। এজন্য তিনি সামাজিক বৈষম্য এবং বৈকল্যতাকে ধ্বংস করে দেন তার কবিতায়। চূর্ণ করে দেন সাদা-কালোর ভেদাভেদ। মানুষে মানুষে যারা ভেদাভেদ সৃষ্টি করে, তিনি তাদেরকে মনে করেন রেসিস্ট এবং কীট। তিনি ‘সাদা-কালো’ কবিতায় উচ্চারণ করেন–

‘রেসিস্ট শব্দটা ঘৃণিত এক নাম,
এরা সাদা নয়, এরা কালো নয়,
এরা জ্ঞানহীন এক জীব,
যে জীব তার সৃষ্টিকর্তাকে
অনুধাবনে ব্যর্থ, এক কীট।’

কবি তারানা রেজা চৌধুরীর বিদ্রোহ চেতনা অত্যন্ত প্রকট। যেখানেই অধিকার বঞ্চনার শিকার হয়, সেখানেই তিনি উচ্চারণ করেন প্রতিবাদের ভাষা। যে স্বাধীনতাকে তিনি মনে করেন যাবতীয় দুঃখবোধ দূরীকরণের চাবিকাঠি, সেই স্বাধীনতা যখন মাটিতে হামাগুড়ি দেয়, তখনই কবির চেতনা শানিত হয়ে ওঠে। তিনি স্বাধীনতাকে প্রশ্ন করেন–আত্মপরিচয় উদ্ঘাটনের মাধ্যমে সংকটকে মুছে ফেলে দিতে। তিনি ‘কোথায় স্বাধীনতা’ কবিতায় বলেন–

‘অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, সে আমার স্বাধীনতা।
বাক স্বাধীনতা যেথা, সে আমার স্বাধীনতা।
দু’বেলা খেয়ে পরে বাঁচা, সে আমার স্বাধীনতা।
ধর্ষণ মুক্ত বাংলাদেশ, সে আমার স্বাধীনতা।
সম্ভ্রম রক্ষা পাওয়া- সে আমার স্বাধীনতা।’

কবি তারানা রেজা চৌধুরীর কবিতা উপমা, উৎপ্রেক্ষা এবং চিত্রকল্পে সুশোভিত। এটা অস্বীকারের সুযোগ নেই। গভীর জীবনবোধ, স্বজাত্যবোধ, দেশপ্রেম, প্রকৃতি চেতনায় সে বিষয়গুলো অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। ঐতিহ্য এবং শেকড়ের প্রতি তাঁর যে দায়বদ্ধতা, এটাও যেন তাঁকে বার বার তাড়িত করেছে। তিনি মূলতঃ এর রহস্য উদ্ঘাটনে ব্রতী হয়েছেন। এছাড়াও স্বকীয়তার জাগরণে তিনি যে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন, এতে যারপর নাই মুগ্ধ হতে হয়। কবি তারানা রেজা চৌধুরীর কবিতায় ফুটে ওঠে–

‘দিয়েছে শকুনের মুখে তুলে,
মানচিত্রের দোয়াই দিয়ে,
ধর্ম ধর্ম খেলা খেলে,
হিংসা থেকে হিংস্র হয়ে,
মরছে মানুষ শ’য়ে শ’য়ে।’

এভাবেই তারানা রেজা চৌধুরী’র কবিতার ভাষা স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের দ্যোতক হয়ে ফুটে উঠেছে। উপমা, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প এবং অনুপ্রাসের অনুপম মিশেল ঘটেছে তার কবিতায়। বিচিত্র ভাবনার মোড়কে তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছে জীবনানন্দের স্বরূপ। বিকীর্ণ সমাজের রূপান্তর, নৈতিক অবক্ষয়ের গতিপ্রবাহ এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তারানা রেজার কবিতা যেন এক পরিশীলিত প্রতিবাদ। ‘কদম আলীর বিষের বোতল’ কাব্যগ্রন্থটির বিষয়ভাবনা চৈতন্যের দ্বার বেয়ে একটি সম্ভাবনার পথকে উন্মোচন করে দেয়। কাব্যগ্রন্থের কদম আলী যেন মরেও মরেনা। এখানে এ কদম হচ্ছে জাতিসত্তার রূপক অর্থ, যাকে কেউ নিঃশেষ করে দিতে চাইলেও পারে না। স্বজাত্যবোধ, দেশপ্রেম এবং মূল্যবোধকে ধারণ করলে যে জীবনের জয়গান হয়, কবি তারানা রেজা চৌধুরীর কবিতা যেন যে সম্ভাবনাকে ক্রমশ প্রকট করে তুলে। তাঁর কবিতায় প্রতীকি জাগরণ যেন বিমূর্ত হয়ে ফুটে উঠেছে। এছাড়া যাপিত জীবনের নৈমিত্তিক ভাবনা তার কবিতার ভাষাসংহারী মনোভাবকে করেছে গতিময় এবং চেতনাপ্রবাহী। সামগ্রিক দিক বিবেচনায় কবি তারানা রেজা চৌধুরীর কবিতা পাঠক হৃদয়কে ছুঁয়ে যাবে অনন্যতায়। এটা তাঁর কাব্যভাষার দাবি। কবি তারানা রেজা চৌধুরী সাহিত্যে স্বকীয়তায় নিজস্ব অবস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন সময়ের ব্যবধানে। আমরা তাঁর ব্যক্তিক কল্যাণ এবং সামগ্রিক ভাবনার প্রস্ফুরণ কামনা করি।

লেখক : প্রাবন্ধিক, প্রকাশক ও সংগঠক।

সম্পাদক: শাহ সুহেল আহমদ
প্যারিস ফ্রান্স থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: