শুক্রবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৫ খ্রীষ্টাব্দ | ১৪ ভাদ্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

Sex Cams

ফ্যাসিস্ট মুক্তির দিন আজ




জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তি

শাহ সুহেল আহমদ.

আজ ৫ আগস্ট, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক অনন্য দিন- ফ্যাসিস্ট মুক্তির দিন। গত বছরের এই দিনে চূড়ান্ত রূপ নেয় জুলাই গণঅভ্যুত্থান, যা রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম জনজাগরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

২০২৪ সালের জুলাই মাসজুড়ে সারাদেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলন culminate করে ৫ আগস্টে, যখন লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে আসে, ঘেরাও করে প্রশাসনিক ভবন, অচল করে দেয় দমন-পীড়নের কেন্দ্রগুলো।

টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় কড়া কারফিউ উপেক্ষা করে গত বছরের ৫ আগস্ট পূর্বঘোষিত ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি সফল করতে হাজার হাজার মানুষ ঢাকা অভিমুখে পদযাত্রা করে। দেশজুড়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নেমে আসে রাজপথে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলি, টিয়ারশেলসহ সব ধরনের বাধা উপেক্ষা করে হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনের দিকে যাত্রা শুরু করেন তারা। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে মানুষ উল্লাসে ফেটে পড়ে। উৎসবের নগরীতে পরিণত হয় ঢাকা। আনন্দে উদ্বেলিত হাজার হাজার মানুষ গণভবনে ঢুকে আনন্দ-উল্লাস করতে থাকে। শুধু গণভবনই নয়, শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করার পর অসংখ্য উত্তেজিত জনতা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জাতীয় সংসদেও ঢুকে পড়ে। দেশের প্রতিটি শহর-উপশহর, পাড়া-মহল্লায় আনন্দ মিছিল, মিষ্টি বিতরণের মধ্য দিয়ে সর্বস্তরের মানুষ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে।

দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শিশু, বৃদ্ধ, শ্রমজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী—সবাই রাজপথে নেমে দেড় দশকের স্বৈরশাসকের পতন উদযাপন করে। এ সময় জনগণ তীব্র ক্ষোভ ও আক্রোশে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরালসহ শেখ পরিবারের বিভিন্ন স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়। বিক্ষুব্ধ জনতা সাড়ে ১৫ বছরের শোষণ ও নির্যাতনের একাধিক দুর্গেও আক্রমণ করে।

এদিকে হাসিনার পতনের পর আনন্দ-উল্লাসের মধ্যেও ঘটে নির্মম ঘটনা। গোটা রাজধানীবাসী যখন বিজয় মিছিলে মেতেছিল, ঠিক তখনই যাত্রাবাড়ীসহ কয়েকটি স্থানে শেখ হাসিনার পালিত পুলিশ বাহিনী নির্বিচারে গুলি করে মানুষ হত্যা করেছে।

হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার খবরও প্রচারিত হয়। তিনি বেলা পৌনে ৪টার দিকে সেনাসদরে দেশবাসীর উদ্দেশে ভাষণ দেন। সেখানে তিনি শেখ হাসিনার পদত্যাগের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানান। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, হাসিনা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের জন্ম হয়েছিল রাজনৈতিক দমন, বাকস্বাধীনতার অবরোধ, মিথ্যা মামলা, গুম-গ্রেফতার এবং একদলীয় আধা ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে। তরুণ প্রজন্ম, শ্রমিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সকলে মিলে গড়ে তোলে এক ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ।

রাজনৈতিক সংগঠনের পাশাপাশি, ছাত্র ইউনিয়ন, সংস্কৃতি কর্মী এবং নাগরিক প্ল্যাটফর্মগুলো বড় ভূমিকা পালন করে। ‘স্বাধীনতা মানে কেবল পতাকা নয়, মত প্রকাশের অধিকারও’ এই স্লোগান তখন দেশের আনাচে-কানাচে প্রতিধ্বনিত হয়।

এক বছর পর আজ দেশ কিছুটা স্থিতিশীল। নির্বাচন কমিশন নতুন করে গঠিত হয়েছে, জরুরি আইন প্রত্যাহার হয়েছে, গণমাধ্যমে কিছুটা স্বাধীনতার বাতাস বইছে। 

ড. রাশেদা সুলতানা, বিশিষ্ট সমাজতাত্ত্বিক ও গণআন্দোলন বিশ্লেষক, বাংলা টেলিগ্রামকে বলেন- “ফ্যাসিবাদ শুধু সরকারে নয়, সমাজেও থাকে। এই অভ্যুত্থান দেখিয়েছে, মানুষ আর ভয় পায় না। এক বছর আগের সেই বিস্ফোরণ কেবল রাজপথ বদলায়নি, বদলেছে মনস্তত্ত্বও। তবে বিপদ এখানেই— যদি এই গণতান্ত্রিক প্রত্যয়কে প্রতিষ্ঠানিক রূপ না দেওয়া যায়, তবে ইতিহাস ফিরে আসতে পারে চক্রাকারে।”

তিনি আরও বলেন, “গণঅভ্যুত্থান কোনো যাদু নয়, এটি সময়ের সন্তান। মানুষের জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ। কিন্তু এখন প্রয়োজন গণতান্ত্রিক কাঠামোর টিকে থাকা, যাতে পরবর্তী প্রজন্মকে আর রক্ত দিতে না হয়।”

আজ সারাদেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে আলোচনাসভা, মশাল মিছিল, স্মরণানুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে আয়োজিত ‘গণমুক্তি উৎসব’-এ গান, কবিতা ও নাটকের মাধ্যমে স্মরণ করা হচ্ছে সেই সাহসী মুহূর্তগুলোকে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ শেয়ার করছেন স্মৃতি, অভিজ্ঞতা, ছবি ও রাজনৈতিক মন্তব্য। সবচেয়ে আলোচিত হ্যাশট্যাগ #ফ্যাসিস্ট_মুক্তির_দিন।

সম্পাদক: শাহ সুহেল আহমদ
প্যারিস ফ্রান্স থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: