শনিবার, ২০ জুন ২০২৬ খ্রীষ্টাব্দ | ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Sex Cams

ভিভাটেক ২০২৬: ভবিষ্যৎকে ছুঁতে আসে বিশ্ব




ভিভাটেক ২০২৬: ভবিষ্যৎকে ছুঁতে আসে বিশ্ব

শাহ সুহেল আহমদ

সকাল সাড়ে নয়টা। প্যারিস এক্সপো পোর্ত দ্য ভার্সাইয়ের প্রধান প্রবেশপথের সামনে তখন দীর্ঘ সারি। হাতে ল্যাপটপ ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তরুণ উদ্যোক্তারা। কেউ এসেছেন বিনিয়োগের খোঁজে, কেউ নতুন প্রযুক্তি দেখতে, কেউ বা বিশ্ববাজারে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরতে। নিরাপত্তা তল্লাশি পেরিয়ে বিশাল প্রদর্শনী হলে ঢুকতেই চোখে পড়ে একের পর এক বিশাল স্ক্রিন, রোবটের চলাফেরা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রদর্শনী এবং প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যস্ত আলোচনা।

মুহূর্তেই বোঝা যায়, এটি কোনো সাধারণ প্রদর্শনী নয়। এটি ভিভাটেক ২০২৬। ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি ও স্টার্টআপ সম্মেলন, যা এ বছর (১৭-২০ জুন) উদযাপন করছে তার দশম বর্ষপূর্তি।

আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১৪০টিরও বেশি দেশ থেকে প্রতিনিধি, উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নেয়। চার দিনের এই আয়োজন ঘিরে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার প্রযুক্তিপ্রেমী দর্শনার্থী সমবেত হন। এছাড়া উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা বিকাশের এই প্ল্যাটফর্মে ২ হাজার ৫০০-এর বেশি স্টার্টআপ নিজেদের নতুন প্রযুক্তি ও সেবার প্রদর্শন করে।

২০১৬ সালে যাত্রা শুরু করা ভিভাটেক এক দশকে প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। একসময় এটি ছিল মূলত স্টার্টআপ ও বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম। আজ এটি প্রযুক্তি, অর্থনীতি, কূটনীতি এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার একটি মঞ্চ।

প্রদর্শনী হলের ভেতরে ঢুকে প্রথমেই চোখে পড়ে AI বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আধিপত্য। পুরো সম্মেলনটিই এই দুটি অক্ষরকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। একটি স্টলে AI কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দর্শনার্থীর ছবি থেকে নতুন প্রতিকৃতি তৈরি করছে। অন্য একটি স্টলে দেখানো হচ্ছে কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিকিৎসকদের রোগ শনাক্তকরণে সহায়তা করতে পারে। আরেক পাশে বোস্টন ডায়নামিক্সের নতুন ‘অ্যাটলাস’ (Atlas) হিউম্যানয়েড রোবটটি দর্শনার্থীদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে, যা তার নিখুঁত ও প্রায় মানুষের মতো শারীরিক অঙ্গভঙ্গির কারণে এবারের প্রদর্শনীর অন্যতম প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। পাশেই ফরাসি স্টার্টআপ ‘মিস্ট্রাল এআই’ (Mistral AI) প্রদর্শন করছে তাদের নতুন লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল, যা অত্যন্ত কম শক্তিতে ডিভাইস স্তরে কাজ করতে পারে।

কয়েক বছর আগেও প্রযুক্তি সম্মেলনের আলোচনায় নতুন অ্যাপ, নতুন ডিভাইস কিংবা নতুন ব্যবসায়িক ধারণা প্রাধান্য পেত। এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। AI এখন অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, প্রতিরক্ষা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার আলোচনার কেন্দ্রে।

তাই ভিভাটেকের করিডর থেকে মূল মঞ্চ; সবখানেই একটি প্রশ্ন ঘুরে ফিরে এসেছে: যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার যুগে ইউরোপের অবস্থান কোথায়?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সম্ভবত প্রযুক্তি সম্মেলনের মঞ্চে এখন শুধু উদ্যোক্তারা নন, হাজির হচ্ছেন রাষ্ট্রনায়করাও।

এবারের ভিভাটেকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালামের অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। AI, সেমিকন্ডাক্টর, ডেটা সেন্টার, ক্লাউড অবকাঠামো এবং ডিজিটাল অর্থনীতি নিয়ে বিশ্বব্যাপী যে নতুন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, রাষ্ট্রপ্রধানদের উপস্থিতি তারই প্রতিফলন।

একসময় প্রযুক্তি ছিল ব্যবসার বিষয়। এখন এটি ভূরাজনীতি এবং জাতীয় কৌশলেরও অংশ।

মূল মঞ্চে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং শিল্পনেতাদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। Amazon-এর প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস থেকে শুরু করে ইউরোপীয় AI খাতের অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিত্ব আর্থার মেন্স, সবার বক্তব্যেই উঠে এসেছে AI-এর সম্ভাবনা, ঝুঁকি এবং ভবিষ্যৎ।

জেফ বেজোস তার বক্তব্যে এক ভবিষ্যৎবাণী করে বলেন, ‘আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এআই আমাদের দৈনন্দিন কর্মদক্ষতাকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাবে, যা আমরা গত ৫০ বছরেও দেখিনি। তবে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে এই প্রযুক্তি যেন পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত কার্বন ফুটপ্রিন্টের চাপ না ফেলে।’

কেউ বলছেন, AI শিল্পবিপ্লবের পর মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। আবার কেউ সতর্ক করছেন, প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ ও নৈতিকতার প্রশ্নও সমান গুরুত্ব পেতে হবে।

তবে ভিভাটেকের প্রকৃত প্রাণ খুঁজতে হলে মূল মঞ্চ ছেড়ে চলে যেতে হয় স্টার্টআপ জোনে। সেখানে বড় প্রতিষ্ঠানের চাকচিক্য কম, কিন্তু স্বপ্নের পরিমাণ অনেক বেশি।

একটি ছোট বুথে দেখা গেল দুই তরুণ উদ্যোক্তা তাদের নতুন সফটওয়্যার নিয়ে আগ্রহী দর্শনার্থীদের বোঝাচ্ছেন। পাশের বুথে একটি স্বাস্থ্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তাদের AI-ভিত্তিক সমাধান প্রদর্শন করছে। আরেক কোণে কৃষি প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা একটি স্টার্টআপ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা করছে।

অনেক উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা বলে বোঝা যায়, তারা এখানে শুধু পণ্য প্রদর্শন করতে আসেননি। তারা এসেছেন মানুষ খুঁজতে, সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়িক অংশীদার, গ্রাহক কিংবা ভবিষ্যতের সহযোগী।

কানাডা থেকে আসা স্টার্টআপ উদ্যোক্তা মারিয়ানা বলেন, ‘ভিভাটেকে চার দিনে যত মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়, সাধারণ অবস্থায় তা করতে কয়েক মাস লেগে যেতে পারে।’

তার কথায়, ‘এখানে আপনি একই দিনে বিনিয়োগকারী, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং সম্ভাব্য গ্রাহকের সঙ্গে দেখা করতে পারেন। এটাই সবচেয়ে বড় সুযোগ।’

শুধু উদ্যোক্তারাই নন, বিনিয়োগকারীদের কাছেও ভিভাটেক একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য।

একটি হল থেকে আরেকটি হলে হাঁটতে হাঁটতে দেখা যায়, বিভিন্ন টেবিলে উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের বৈঠক চলছে। কোথাও পাঁচ মিনিটের ‘পিচ’, কোথাও আধা ঘণ্টার আলোচনা। একটি ধারণা, একটি প্রেজেন্টেশন কিংবা একটি সফল আলাপ কখনো কখনো কোটি কোটি ইউরোর বিনিয়োগের পথ খুলে দিতে পারে।

তবে ভিভাটেক শুধু ব্যবসার জায়গা নয়; এটি প্রযুক্তির এক উৎসবও।

রোবটের সঙ্গে ছবি তুলছে শিশুরা। তরুণেরা ভার্চুয়াল রিয়েলিটি হেডসেট পরে অন্য এক জগতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। AI-নির্ভর গেমিং প্রযুক্তি ঘিরে ভিড়। স্বয়ংক্রিয় গাড়ি নিয়ে কৌতূহল দর্শনার্থীদের।

এক ফরাসি দম্পতিকে দেখা গেল তাদের দুই সন্তানকে নিয়ে রোবটিক্স প্রদর্শনী ঘুরে দেখছেন। শিশুদের একজন কেভিন। একটি রোবটের সঙ্গে হাত মেলানোর পর আনন্দে লাফিয়ে ওঠে।

ভিভাটেকের আয়োজকদের লক্ষ্যও কেবল একটি প্রযুক্তি প্রদর্শনী আয়োজন নয়। তারা প্যারিসকে বিশ্বের প্রযুক্তি রাজধানীগুলোর অন্যতম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। সিলিকন ভ্যালি, শেনজেন, বেঙ্গালুরু কিংবা সিঙ্গাপুরের পাশাপাশি ইউরোপীয় উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে প্যারিসকে তুলে ধরার প্রচেষ্টার অংশ এই সম্মেলন।

ফ্রান্স ইতোমধ্যে AI, স্টার্টআপ এবং ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। ভিভাটেক সেই বিনিয়োগ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী।

বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকেও ভিভাটেক গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব প্রযুক্তি খাত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। AI, অটোমেশন এবং ডিজিটাল অর্থনীতি নতুন সুযোগ তৈরি করছে। বাংলাদেশের তরুণ উদ্যোক্তা, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং স্টার্টআপগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে উপস্থিতি এখন আর বিলাসিতা নয়; বরং প্রয়োজন।

ভিভাটেকের প্রদর্শনী হলগুলো ঘুরে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে উত্তেজনা যেমন আছে, তেমনি আছে উদ্বেগও।

AI কি মানুষের কাজ কেড়ে নেবে, নাকি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে? ডেটার মালিকানা কার হাতে থাকবে? প্রযুক্তি কি বৈষম্য কমাবে, নাকি বাড়াবে? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি মেলেনি।

তবে একটি বিষয় নিশ্চিত। ভবিষ্যৎ নিয়ে যে বিতর্ক, যে প্রতিযোগিতা এবং যে স্বপ্ন- তার অনেকটাই প্যারিসের ভিভাটেকে উপস্থিত।

সম্পাদক: শাহ সুহেল আহমদ
প্যারিস ফ্রান্স থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: