শুক্রবার, ২২ অক্টোবর ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ৭ কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

সঙ্গীত ও বাচিক শিল্পচর্চায় প্রতিভাবান অবয়ব জয়শ্রী চন্দ ঝুৃমা 




শাবুল আহমেদ :

জয়শ্রী চন্দ ঝুমা; একাধারে একজন সঙ্গীত ও বাচিক শিল্পী। শিল্পচর্চার বিভিন্ন মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে তিনি সক্রিয় রয়েছেন।
আবৃত্তি সংঘটন ‘মুক্তাক্ষর’-নয়াগ্রাম শাখার নির্বাহী পরিচালকের পাশাপাশি তিনি একাধিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছেন।
বাঙালির আন্দোলন-সংগ্রামের বিভিন্ন দিবস ও বিশেষ উৎসবে শিশু-কিশোরদের নিয়ে আবৃত্তি এবং গানের অনুষ্ঠান প্রযোজনা করে ইতোমধ্যে তিনি বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন। জয়শ্রী পড়াশোনায়ও যথেষ্ট মেধাবি।বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজ থেকে রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগে সদ্য স্নাতক (সম্মান) সম্পন্ন করেছেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি সঙ্গীত ও আবৃত্তি নিয়ে তাঁর সাফল্যের পালকে যুক্ত হয়েছে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা।
বিয়ানীবাজার তথা এতদ্বঞ্চলের শিল্প-সংস্কৃতির প্রিয়মুখ জয়শ্রী মৌলিক ও সৃজনমনস্ক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে ইতোমধ্যে আপন স্বকীয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। তার দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নমাখা আবৃত্তি সংগঠন মুক্তাক্ষর-নয়াগ্রাম শাখা ছাড়াও সরকারি প্রকল্পের আওতাধীন ‘কিশোর-কিশোরী ক্লাব’ (মুড়িয়া ইউনিয়ন)-এ শিক্ষকতা করছেন।
এছাড়া বিয়ানীবাজার উপজেলা শিল্পকলা একাডেমী, অনলাইন ভিত্তিক গণমাধ্যম ‘জনতার টিভি’সহ শিল্প-সংস্কৃতি বিষয়ক নানান সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন।

সিলেটের বিয়ানীবাজার পৌরশহরের নয়াগ্রামে জয়শ্রী চন্দ ঝুমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। বাবা মলয় চন্দ ও মা হাসি রাণী চন্দ পরিবারে ৪ মেয়ে ও ২ ছেলে সন্তানের মধ্যে জয়শ্রী দ্বিতীয়।
সঙ্গীত এবং আবৃত্তি এ যেন তার জীবনের এপিঠ-ওপিঠ। জয়শ্রী’র সঙ্গীত জীবনের প্রথম সোপান বিয়ানীবাজার স্বরলিপি সংগীত বিদ্যালয়। শৈশবে শিল্পী আব্দুল আলীমের কাছে সঙ্গীতের প্রথম হাতেখড়ি। পর্যায়ক্রমে শিক্ষক দিপালী কর, আলম হোসেন, জুয়েল আহমদ ও বিপ্রদাশ ভট্টাচার্যের সহচার্যে গানের তালিম নিয়েছেন।
জয়শ্রী জানান, ক্লাস সেভেনে পড়াকালীন স্থানীয় স্বরলিপি সংগীত বিদ্যালয়ে আবৃত্তি শাখা চালু হয়। সেখানে মুক্তাক্ষর-সিলেটের পরিচালক বিমল কর আবৃত্তির শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। একপর্যায় মন্রমুগ্ধ হয়ে উনার ক্লাসগুলো নিয়মিত উপভোগ করতে শুরু করেন। মূলত এভাবেই আবৃত্তির প্রতি তার ভালোলাগা ও নেশা তৈরি হয়। সেই শুরু, ধীরে ধীরে আবৃত্তির সঙ্গে গড়ে ওঠে গভীর সখ্যতা। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় প্রশিক্ষক বিমল কর-এর কাছে আবৃত্তির জ্ঞান-সাধনা গ্রহণ করেছেন।
এরপর কলকাতার বিশিষ্ট বাচিক শিল্পী শুভাশিষ ঘোষ ঠাকুরের কাছে প্রায় বছরখানেক আবৃত্তির সংলাপ পাঠের কলাকৌশল শিখেন। যদিও নানান প্রতিবন্ধকতার কারণে শিল্পের অনেক কিছুই এখনোও রপ্ত করা হয়ে ওঠেনি। তাই শেখা এবং জানার প্রতি অদম্য কৌতূহল ও প্রবল ইচ্ছে তার।
বর্তমানে আবৃত্তি শিল্প নিয়েই তিনি বেশি কাজ করছেন। তবে সঙ্গীত এবং আবৃত্তি উভয় শাখায়ই তার কাছে সমান প্রিয়। তথাপি আবৃত্তির প্রতি জয়শ্রী’র বিশেষ অনুভূতি ও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ ফুটে ওঠে প্রাসঙ্গিক আলাপচারিতায়। তার মতে- আবৃত্তির জন্যই আজকে পরিচিতি এবং কাজের ক্ষেত্র বেড়েছে। তবে সংগীতে তিনি বেশি পুরষ্কৃত ও সম্মানিত হয়ে এসেছেন সেই ছোটকাল থেকে। প্রতিযোগিতা মঞ্চে প্রবেশ স্কুলের হাত ধরে। বিভাগীয় পর্যায় বিভিন্ন বিভাগে একাধিকবার তিনি ১ম স্থান অর্জন করেছেন। এরমধ্যে উচ্চাঙ্গ ও নজরুল সংগীত বিভাগে সাফল্য বেশি। এছাড়া বাংলা রচনা প্রতিযোগিতায়ও তিনি বিভাগীয় পর্যায় প্রথম হন।
কেবল নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধতা না থেকে স্থানীয় পর্যায় আবৃত্তি চর্চার প্রসার ও প্রচার ঘটাতে ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই নিজ বাড়িতে ‘মুক্তাক্ষর’ নয়াগ্রাম শাখার যাত্রা শুরু করেন। মূলত, তার প্রিয় শিক্ষক বিমল কর-এর অনুপ্রেরণা ও দিকনির্দেশনা ছিল ‘মুক্তাক্ষর’-নয়াগ্রাম শাখা প্রতিষ্ঠার প্রধান পাথেয়।
প্রিয় শিক্ষকের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পাশাপাশি দেশ-বিদেশে মুক্তাক্ষরের কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয়ে সহকর্মীদের নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। সময়ের পরিক্রমায় ‘মুক্তাক্ষর’-নয়াগ্রাম শাখার ব্যাপ্তিও বেড়েছে অনেক। শিল্পচর্চা নিয়ে বহুদূর এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ী জয়শ্রী আবৃত্তি চর্চা লালনের পাশাপাশি একজন নজরুল সঙ্গীত শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন বুনেন আপন মনে। নজরুল সঙ্গীতে তার প্রিয় শিল্পীর তালিকার শীর্ষে রয়েছেন ফেরদৌস আরা এবং আবৃত্তিতে শিমুল মুস্তফা, মুনমুন মুখার্জি ও ব্রবতী বন্দোপাধ্যায়। এসব গুণীশিল্পীদের তিনি সর্বদা অনুসরণ করে থাকেন।
প্রকৃতিপ্রমী জয়শ্রী’র অবসর কাটে বাগান পরিচর্যা করে। বাড়ির আঙিনায় বিভিন্ন ফুল ও ফলজ গাছের একটি বাগান গড়ে তুলেছেন তিনি। ফলে অবসর সময় সবুজের মাঝে নিজেকে বিলিয়ে দিতে পছন্দ করেন।
শিল্পচর্চায় আজকের এই জয়শ্রী হয়ে ওঠার পেছনে সেজোকাকার (মিহির চন্দ) অনুপ্রেরণা এবং পরিবারের অকুণ্ঠ সমর্থন ও বন্ধুদের ভালোবাসার কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে জয়শ্রী বলেন, ‘সবার আগে একজন ভালো মানুষ হতে চাই।’ এজন্য তিনি সবার দোয়া ও আশীর্বাদ কামনা করেন।

আবৃত্তি শিল্প নিয়ে ‘মুক্তাক্ষর’-সিলেটের প্রধান পরিচালক ও প্রশিক্ষক বিমল কর বলেন, ‘মননশীল চিন্তা-চেতনায় নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলতে আবৃত্তি অত্যাবশ্যক একটি বিষয়। বিশেষ করে বাংলা ভাষার শুদ্ধ উচ্চারণ, কথাবলা, সুন্দর ও মার্জিতভাবে নিজেকে উপস্থাপন করার অন্যতম সহায়ক শক্তি হচ্ছে আবৃত্তি। ছোটবেলা থেকে থেকে জীবনের শেষাবধি নিজস্ব মেধা ও আলো ছড়ানোয় আবৃত্তি একটি অপরিহার্য অংশ।’
তিনি বলেন, ‘শুদ্ধচিন্তার মানুষ হওয়ার পাশাপাশি জীবন ও কর্মে সফলতা অর্জনে আবৃত্তিচর্চা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই জ্ঞানচর্চা ছড়িয়ে দেয়া উচিত।’ তিনি মনে করেন- যেহেতু আবৃত্তি সর্ব-ধর্ম স্বীকৃত; তাই কোথাও কোন প্রতিবন্ধকতার সুযোগ নেই। ফলে সবার অংশগ্রহণমূলক চিন্তার প্রতিফলনের সম্ভাবনার সুযোগ থাকে শিল্পের এ শাখায়।
জয়শ্রী প্রসঙ্গে নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করে বিমল কর বলেন, সমকালীন শিল্প-সংস্কৃতি ও সাহিত্য নিয়ে জয়শ্রী’র সৃজনশীল চিন্তাশক্তি চমৎকার। আধুনিক সংস্করণে কাঠামোগত দিক দিয়ে কণ্ঠ, শব্দচয়ন এবং উপস্থাপনার মাধ্যমে আবৃত্তির স্বতন্র ভাবধারায় তাকে সহজেই চিহ্নিত করা যায়। নিজস্ব এ শৈল্পিকতার যত্ন নিলে আবৃত্তির নিয়ে সে বহুদূর যেতে পারবে।

সম্পাদক: শাহ সুহেল আহমদ
প্যারিস ফ্রান্স থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: