বুধবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ইতালির অবৈধ অভিবাসীদের বৈধকরণ ও মানবতা




মোঃ আব্দুর রব

মিডিয়ার কল্যাণে পাঠকরা নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে প্রায় আট বছর পর ইতালি সরকার তার দেশে বসবাসরত অবৈধ অভিবাসীদের আবার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন এবং প্রায় ছয় লক্ষ অভিবাসীকে বৈধকরণের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। যা পহেলা জুন থেকে পনেরো জুলাই পর্যন্ত চলমান থাকবে। খুশির সংবাদ, সবাই উৎফুল্ল।

ইতালি সরকার তাদের সংসদে উপস্থাপিত বিগত বাৎসরিক বাজেটে যখন অভিবাসীদের থেকে পাওয়া যাবে এমন মোটা অংকের একটি আয়ের খাত উল্লেখ করলেন তখন মোটামুটি সকলেই নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন যে ইতালিতে আবার বৈধতা দেওয়া হবে। এ সংবাদে এদেশে বসবাসরত অবৈধ অভিবাসীদের চেয়ে বরং দালালরাই মনে হলো বেশি খুশি হয়েছেন। তারা আনন্দের আতিশয্যে নিয়মিত ফেইসবুক লাইভ শুরু করলেন। লাইভ গুলোর শিরোনাম ‘ইতালির অবৈধ অভিবাসীদের জন্য সুখবর’। নিরীহ অভিবাসীদের গলা কাটার সুযোগ তারা আবার পেয়েছেন।

ইতালিতে কত প্রজাতির দালাল আছেন, তা বলে শেষ করা যাবেনা। তবে মোটামুটি এদেরকে তিন স্তরে ভাগ করা যায়। বড় দালাল, মাঝারি দালাল ও পিচ্ছি বা মিচকা দালাল। গুটিকয় বড় বড় দালালের আন্ডারে কাজ করেন বাকি সব দালাল। এদের আবার যোগ্যতা বলতে কিছু নেই। এক পৃষ্ঠার ইতালিয়ান নির্দেশনা পড়ে তা বুঝিয়ে দেওয়া এমনকি নিজে বুঝারও ক্ষমতা রাখেননা তারা। এদের সব ক্ষমতা মুখে। বড় বড় চাপাবাজিতে এদের জুড়ি মেলা ভার। যে যেভাবে যাকে শিকার করতে পারেন-এই অবস্থা আরকি। জনপ্রতি ছয় হাজার থেকে দশ হাজার ইউরো পর্যন্ত তারা অনায়াসেই দাবি করছেন।

ইতালি সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী একজনের ফাইল জমা করতে সরকারের ফি ও সব ধরণের ট্যাক্সসহ সর্বমোট আড়াই থেকে তিন হাজার ইউরো খরচ হবে। বাকি টাকা আমাদের দালাল ভাইদের পকেট গরম করবে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে এখন শুধু উনাদের কানাকানি আর কিছু দূর দূর উনাদের স্বনামধন্য পরামর্শ সেন্টার। সেন্টার গুলোর দরজায় আবার বড় বড় হরফে লেখা ‘দালাল থেকে সাবধান’।

ইতালি গভর্নমেন্ট বিশেষ শর্তসাপেক্ষে এই বৈধকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নির্দেশনা জারি করেছেন। এর মধ্যে প্রধান কয়েকটি শর্ত হচ্ছে মাত্র দুটি সেক্টরে লোক বৈধ করা হবে। এক গৃহস্থালি কাজের জন্য, দুই কৃষি কাজের জন্য। এই দুই সেক্টরের মালিকরা তাদের কাগজ পত্র দেখিয়ে এক বা একাধিক ব্যক্তিকে বৈধ করতে পারবেন। কিন্তু শর্ত হলো একজনকে বৈধ করতে হলে মালিকের বাৎসরিক আয় কমপক্ষে বিশ হাজার ইউরো হতে হবে। আর তিনি যদি সপরিবারে থাকেন তাহলে তার বাৎসরিক আয় কমপক্ষে সাতাশ হাজার ইউরো হতে হবে।

এই কঠোর শর্তের কারণে প্রায় সকল বাঙালি মালিকরাই বৈধকরণ প্রক্রিয়ার বাইরে পড়ে গেছেন। এখন ভরসা কেবল ইতালিয়ান মালিক। এখানে এই আইনের রয়েছে এক বিশাল সমস্যা। কারণ কোনো শ্রমিক যখন কোনো মালিকের কাজ করে তখন কি সে তার মালিককে এই প্রশ্ন করতে পারে যে আপনার বাৎসরিক আয় কত? বিশ হাজারের নীচে হলে আমি আপনার কাজ করবনা। এটা কি আদৌ সম্ভব? এটা কি কোনো যৌক্তিক কথা? এতদিন একজন মালিকের আন্ডারে কাজ করে মালিকের অযোগ্যতা বা ভুলের জন্য কর্মী কেন ডকুমেন্ট থেকে বঞ্চিত হবে? এখন বেশির ভাগ শ্রমিককেই তাদের মালিক চেঞ্জ করতে হচ্ছে এবং টাকা দিয়ে নতুন মালিক খুঁজে নিতে হচ্ছে।

আবার যিনি বৈধ হবেন তার নিজ দেশের একটা ভেলিড ফটো আইডি থাকতে হবে। এটা সংগ্রহ করতে অবশ্য তেমন বেগ পেতে হয়না। এটা অনেকের সাথেই আছে। আর যাদের নাই তাদের জন্য তো আমাদের এমব্যাসি আছেই। এমব্যাসি এখন সপ্তাহে সাতদিন খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে তার জন্যও বাঙালিদের আন্দোলন করতে হয়েছে। এখন এমব্যাসির কর্মকর্তারা নিরবচ্ছিন্ন ভাবে সকাল সন্ধ্যা কাজ করে যাচ্ছেন।

বৈধ হতে হলে দ্বিতীয় যে ডকুমেন্ট লাগবে তা হলো চলিত বৎসরের আটই মার্চের পূর্বে থেকেই আপনি এদেশে অবস্থান করছেন তার একটা প্রমাণ পত্র। তা হতে পারে আপনার নামে মাসিক বা বাৎসরিক বাস কার্ড, যারা এদেশে এসাইলাম চেয়ে আবেদন করেছেন তার সাময়িক অফিসিয়াল কাগজপত্র, ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন, বিনা টিকিটে ভ্রমণের উপর জরিমানার রশিদ, পুলিশের কাছে কোনো কারণে ফিংগার দিতে হয়েছে তার প্রমাণ পত্র, বা কোনো স্কুলে ভাষা শিক্ষার জন্য পড়া লেখা করলে তার সার্টিফিকেটে ইত্যাদি। কিন্তু এগুলোর কোনোটাই একজন অবৈধ অভিবাসীর কাছে থাকা প্রায় অসম্ভব। কেননা এগুলো করতে হলে বৈধ ডকুমেন্টস লাগে। এমনকি ডাক্তার দেখাতে হলেও কাগজপত্র আছে এমন কাউকে সঙ্গে নিয়ে যেতে হয়। এই শর্ত বা আইনটি সম্পূর্ণ কন্ট্রাডিক্টরি। আর এখানেই দালালরা চান্স নেয়। তারা কোনো না কোনো ভাবে এইসব কাগজ পত্র ছয়নয় করে বানিয়ে দিয়ে দেয়। যাতে আপানার ফাইল রিজেক্ট হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। আর মাঝপথে তারা হাতিয়ে নেয় মোটা অংকের টাকা।

করোনা মহামারীর কারণে বিশ্ব অর্থনীতি আজ চরম ভাবে বিধ্বস্ত। পৃথিবীর কোনো দেশই কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারছেনা। ইতালি সরকার এ অর্থনৈতিক মন্দা কাটানোর জন্য এই বৈধকরণের পন্থা গ্রহণ করেছে। এটা তাদের অর্থ আয়ের একটা নির্মম কৌশল। আর এর শিকার হচ্ছে নিরীহ অসহায় অবৈধ অভিবাসী। ইতালি সরকার এমন ভাবে এই বৈধতার ঘোষণা দিয়েছে যে এতে অভিবাসীরা তিন স্তরে টাকা খরচ করতে বাধ্য হবে। সরকার পক্ষ, মালিক পক্ষ ও মধ্যস্বত্বভোগী দালাল চক্র। এই তিন পক্ষ যেন চারদিক থেকে অভিবাসীদের ঘিরে ধরেছে। যেন এক মৃত লাশের চারদিকে ঘুরে ঘুরে শকুনেরা উল্লাস করছে। মাংস খুবলে খাবে বলে।

কারণ এই চরম দুর্দিনে লকডাউনের সময় বৈধ শ্রমিকদেরই কাজ নেই। দেশে দেশে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কাজ হারাচ্ছে। তারপরও বৈধ শ্রমিকরা সরকারের পক্ষ থেকে তাদের বেতনের ষাট থেকে আশি শতাংশ পর্যন্ত বেতন কাজ না করেই পাচ্ছেন। কিন্তু অবৈধ শ্রমিকরা তো কিছুই পাচ্ছেননা। তারাও তো মাসের পর মাস কোনো রূপ কাজ কর্ম না করেই বসে আছেন। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবি সংগঠনের সাহায্য সহযোগিতায় তারা কোনোমতে বেঁচেবর্তে আছেন এটাই অনেক। এই অবস্থায় তারা বৈধ হওয়ার জন্য এই বিশাল পরিমাণ অর্থ কোথা থেকে জোগাড় করবেন। এই চিন্তা সরকার, মালিক বা রক্তচোষা দালাল কারোর মাথায় নেই। এটা মানবতার কোন নিষ্ঠুর রূপ?

এই অবৈধ শ্রমিকদের নিজ নিজ দেশও তো এই ভয়াবহ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার বাইরে নয়। তারা এখন চাইলেই তো আর দেশ থেকে টাকা আনতে পারবেননা। দেশে জমি জিরাত বা অন্য কোনো সম্পদ থাকলে তাও এই মন্দার সময় বিক্রি করতে পারবেননা। এখন এই মুহূর্তে কারা জমি কিনবে? জমি বেচা কেনার পরিস্থিতি কি এই মুহূর্তে আছে? যদিও বিক্রি করা সম্ভব হয় তাহলে জলের দামে বিক্রি করতে হবে।

এখন ধরুন কেউ হয়তো যে কোনো উপায়ে দেশে এই টাকাটা যোগাড় করলেন। কিন্তু সে টাকা আনবেন কিভাবে? বাংলাদেশ থেকে সহজে টাকা আনার কোনো উপায় নেই। আনতে গেলেই নানান হয়রানি ও প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। বরং টাকা পাচারের মামলায় পর্যন্ত পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু যখন জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা সরকারের নাকের ডগা দিয়ে পাচার হয়ে যায় তখন কোনো সমস্যা হয়না। অথচ আপনি বিশেষ প্রয়োজনে টাকা আনতে গেলেই পোহাতে হবে নানা ঝক্কি ঝামেলা ও বিপত্তি।

এখন একমাত্র উপায় টাকা চেঞ্জ করা। অর্থাৎ এখান থেকে কেউ টাকা পাঠাতে চাইলে আপনি দেশে তাকে টাকা দিয়ে এখানে ইউরো গ্রহণ করবেন। কিন্তু এই পদ্ধতিতেও এখন পড়তে হচ্ছে সীমাহীন ঝামেলায়। কেননা এই মুহূর্তে কোনো প্রবাসীই দেশে টাকা পাঠানোর মতো পরিস্থিতিতে নেই। এখানে নিজেরাই কোনোমতে বেঁচে আছেন প্রাণ হাতে নিয়ে। কাজ নাই কর্ম নাই অনেকে ছাঁটাই হচ্ছেন। অনেকে আছেন চাকুরি হারানোর হুমকির মুখে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ক’জনই বা দেশে টাকা পাঠাবেন? পুরো বিশ্বের প্রতিটি দেশের প্রতিটি কোণার প্রতিটি মানুষ এখন অর্থনৈতিক মন্দার শিকার। করোনার এই আকস্মিক আক্রমণে দিশেহারা গোটা মানব জাতি। এমতাবস্থায় টাকা চেঞ্জ করতে হলে মধ্যস্বত্বভোগীরা নিচ্ছে চরম সুযোগ। তারা সর্ব নিম্ন রেটে টাকা বদলে রাজি হচ্ছেন। তাই অবৈধ অভিবাসীরা সকল দিক থেকেই অসহায় হয়ে পড়েছেন। বিড়াল যেমন ইঁদুর ধরার পর সাথে সাথে হত্যা করেনা। কিছুক্ষণ শিকার নিয়ে খেলা করে। অনিয়মিত এই অসহায় শ্রমিকরাও যেন আজ ইঁদুরে পরিণত হয়েছেন। তাদেরকে নিয়ে মানবতার নামে চলছে এক নিষ্ঠুর খেলা।

এবার আর আগের মতো বৈধতা প্রদানের পূর্বে বানের জলের মতো অবৈধ অভিবাসীদের ঢল নামছেনা ইতালিতে। তবুও সরকার সকল সেক্টরে বৈধতা দিতে চাচ্ছেনা, শর্তও সহজ করছেনা। এর মাধ্যমে মালিক ও দালাল পক্ষকে টাকা খাওয়ার এক বিরাট সুযোগ করে দিয়েছে সরকার। একজন শ্রমিক কত লক্ষ টাকা খরচ করে এই দেশে এসেছেন এখন আবার বৈধ হওয়ার জন্য যদি তাকে গুনতে হয় আট দশ লক্ষ টাকা। তাহলে তার সর্বমোট ব্যয় কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? এ টাকা তিনি কতদিনে রোজগার করবেন? বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে এই টাকা উপার্জন করা তো আরো কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে পড়েছে।

যাহোক বর্তমানে ইতালিতে আন্দোলন চলছে। যাতে আরো সহজ শর্তে ও কম খরচে এই অসহায় শ্রমিকরা বৈধতা পান তার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবিও জানানো হচ্ছে। সর্বোপরি শ্রমিক টু সরকার পদ্ধতিতে বৈধকরণ করার জন্য সর্বমহল থেকে তৎপরতা চালানো হচ্ছে। যাতে মধ্যস্বত্বভোগীরা শ্রমিকদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিতে না পারে। আশা করছি সকল শ্রমিকরা সহজ শর্তে এবং সহনীয় মাত্রায় ব্যয়ের মাধ্যমে বৈধতা পাবেন এবং তাদের সকলের স্বপ্ন পূরণ হবে।

মোঃ আব্দুর রব: ব্লগার, কলামিস্ট।
রোম, ইতালি।

সম্পাদক: শাহ সুহেল আহমদ
প্যারিস ফ্রান্স থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: