শুক্রবার, ২ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ঈদ উৎসবে কৌশলে মাতি করোনাকালে




মোহাম্মদ আব্দুল হক

ইসলামের অনুসারী নবী মুহাম্মদ সাঃ এর অনুসারী মুসলমানদের জন্যে দুটি বিশেষ আনন্দের দিন নির্ধারিত আছে। একটি হচ্ছে রোজার ঈদ, যা দীর্ঘ একমাস রমজান মাসের সিয়াম সাধনার পরে আকাশে শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেলে সারা পৃথিবীর মুসলমানদের সাথে আমরা বাংলাদেশের মানুষও তা পালন করি। আরেকটি হচ্ছে কোরবানির ঈদ যা আরবি জিলহজ্জ মাসের দশ তারিখ আমরা পালন করে থাকি। আমাদের দুটো ঈদের উৎসব আমরা ধর্মীয় নিয়ম নীতির মধ্যে থেকে ঘটা করে অর্থাৎ আড়ম্বরপূর্ণ চেহারায় পালন করি। কিন্তু গত বছরের ডিসেম্বরে চীনে এবং  এবছরের শুরু থেকেই বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে করোনা ভাইরাসের আক্রমণ। করোনা ভাইরাসের আক্রমণে মানুষের  দেহে কোভিড-১৯ রোগ হয। এই অসুখটি একজন থেকে অন্যজনে সংক্রমিত হতে হতে একসময় বিশ্ব মহামারীর রূপ ধারণ করে। বাংলাদেশ এ থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। ইতিমধ্যে সংক্রমণ দুইলক্ষ ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশে গত মার্চ মাস থেকে এপর্যন্ত কোভিড-১৯ এ মারা গেছেন প্রায় তিন হাজার মানুষ। সারাবিশ্বে আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান দেখলে যে কেউ আঁতকে ওঠেন। বিশ্বের ছয় লক্ষের বেশি মানুষ কোরোনা ভাইরাসের আক্রমণে মারা গেছেন। এমন পরিস্থিতিতে পৃথিবীর দেশসমূহের ন্যায় বাংলাদেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়।গত ১৭মার্চ ২০২০ থেকে বন্ধ হয়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যেহেতু লোকসমাগম বেশি হলে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ বেশি হওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাই সরকারি আদেশে দেশের আদালত সম্পূর্ণ বন্ধ ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও অফিস প্রথম দিকে সীমিত আকারে খোলা রাখা হয়েছিলো। দেশের মসজিদেও এক সঙ্গে অধিক মানুষের উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিলো। এমন অবস্থায় আমরা মে মাসে পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাজ ঈদগাহতে না পড়ে মহল্লার মসজিদে পড়ি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষিত সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে। আমরা এখনও ঝুঁকিতে আছি। এরই মধ্যে এসেছে আমাদের বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব পবিত্র কোরবানি ঈদ। সুস্থ জীবনের স্বার্থে এখানেও অবশ্যই আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে সরকার ও ইসলামিক ফাউণ্ডেশনের ঘোষণা মেনে এবারের ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ উদযাপন করবো। এবছর ঈদ পালন যেমনই হোক না কেন, ঈদের উৎসব সামনে নিয়ে ঠিক যেখান থেকে লেখা শুরু করলে একটি প্রকাশযোগ্য ও পঠনযোগ্য লেখা হবে সে চেষ্টা করতে-তো আপত্তি নেই। নিশ্চয়ই অন্যান্য বছরের মতো এবারের ঈদেও পত্রিকাটি হাতে নিয়ে বা অনলাইনে ঈদের লেখা পড়তে ভালো লাগবে।
ঈদের দিন কাছাকাছি ঘনিয়ে এলে মনে জাগে বহুদিন আগের ঈদের মজার সব ঘটনা। আমাদের সময়ের যারা অর্থাৎ যাদের দীর্ঘ বয়স হয়েছে, তাদের সাথে ঈদের আগে বা ঈদের পরে দেখা হলে প্রায় সকলেই সমস্বরে বলে থাকেন যে কথাটি, “আহা! আমাদের ছোট বেলায় ঈদের সময় কত মজা-ই-না হতো।” ঠিক এখানটাতেই একটি কথা বলে ফেলতে খুব ইচ্ছা করে, “আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে আমরা যখন ছাত্র অর্থাৎ বয়সে খুব ছোটো তখন আমাদের ধর্মের সবচেয়ে আনন্দময়ী উৎসব ঈদের শেষে আমরা বলতাম, “এবারের ঈদে খুব মজা পেয়েছি।” আর এখনকার স্কুল-কলেজের ছেলে-মেয়েরা বলে থাকে, “এবারের ঈদে খুব আনন্দ করেছি।” বাক্য দুটির মজা এবং আনন্দ পদ দুটি সমার্থক, তারপরও কেমন যেনো দুটি বাক্যে দুই ধরনের প্রাণের স্পন্দন পাওয়া যায়। তখন প্রযুক্তি বলতে রেডিও ছিলো আমাদের একমাত্র বিনোদন মাধ্যম যা আমাদের ঈদের গান শুনাতো, আর টেলিভিশন নামক ম্যাজিক বাক্সটি সবেমাত্র ঐ সময়ের বিত্তবানদের এবং পড়াশুনার সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু পরিবারের ঘরের ভিতরে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। এখনকার ছেলে-মেয়েরা বিজ্ঞানের  কল্যাণে অর্থাৎ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার নানা রকম প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে হরেক রকম আনন্দ করতে পারে । ওদের এই সময়কে আমার খুবই ভাল লাগে । এই প্রজন্মের গঠনমুলক চিন্তা জগতের সাথে, ওদের সৃজনশীল ভাবনার সাথে নিজেকে মিলাতে পারলে খুবই খুশি হই মজা পাই।
দেখুন; আমাদের ছোটবেলায় খুব বেশি ঝড় বৃষ্টি হলে ঈদের দিন আমরা ঘরের বাইরে যেতে পারতাম না। এমনকি প্রচন্ড শীতে ঈদ হলে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকতাম। কিন্তু এখনকার ছেলে-মেয়েরা মন খারাপ করে ঘরে বসে  থাকে না। তারা ঠিকই আনন্দ উপভোগ করে। ধরুন দেখা গেল ঈদের দিন প্রকৃতি বিরূপ আচরণ করছে। বৈরী  আবহাওয়ার কারণে নতুন জামা-কাপড় পড়ে বন্ধুদের সাথে দেখা করতে পারছে না। তাতে ওদের খুব বেশি মন খারাপ হয় না। কারণ  এখনকার বিজ্ঞান মনষ্ক ছেলে-মেয়েরা ঠিকই নতুন জামা-কাপড় পড়ে সেজে গুজে বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে আনন্দ সৃষ্টি করে নিতে পারে। কেউ সেলফি তুলে আবার কেউবা পরিবারের অন্যদের সাহায্য নিয়ে ঘরের ভিতরে কিংবা বারান্দায় নানান ভঙ্গিতে হাতের স্মার্টফোন দিয়ে ছবি তুলে হয় ফেইসবুকে না-হয় হোয়াটস্ এপ্ এ বন্ধুদের সাথে শেয়ার করছে। এখানে বলে রাখা দরকার যে বিদেশী ভাষার শেয়ার শব্দটি এখন ইংরেজী চেয়ার টেবিল এর মতোই বাংলা শব্দ ভান্ডারে মিলেছে। এছাড়া টেলিভিশনের হাজারটা চ্যানেলের হাজারটা প্রোগ্রাম-তো রয়েছেই। অতএব, বিনোদনের অভাব হয় না। এভাবেই তারা আনন্দের সাথে ঈদের দিনকে উপভোগ্য করে তোলে। আমিও তো শিখে গেছি। কাজেই আমিও কি বসে থাকি নাকি? আমিও ফেইসবুকে মনের যতো কথা লিখে থাকি এবং ছবি শেয়ার করে বন্ধুদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে বর্তমান সময়ের মতো আনন্দে সময় কাটাতে কার্পণ্য  করি না মোটেই। প্রিয় পাঠক, যেহেতু ঈদের উৎসবে এবার করোনাকালে আমাদেরকে ইচ্ছে মতো ঘুরে বেড়ানোর ক্ষেত্রে সরকার ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিষেধ মেনে চলতে হবে, তাই আমরা এবছর প্রযুক্তির সহযোগিতায় বন্ধু ও আত্মীয় স্বজনদের সাথে ঈদ উদযাপন করবো। এজন্যে সরকারের কাছে আহবান রাখলাম, এবার ঈদ উপলক্ষে নূন্যতম তিন দিন ইন্টারনেটে ফ্রী ডাটা সুবিধা পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিবেন।
যাই হোক এখনকার ছেলে-মেয়েদের ঈদ আয়োজন আমাদের চোখের সামনেই তো হচ্ছে । কিন্তু আমাদের ছোটোবেলায় ঈদে কিভাবে মজা করতাম তা-তো ওরা জানে-না । তাই আজ আমার স্মৃতির ভান্ডার থেকে কয়েক লাইন জানিয়ে দিতে খুবই ইচ্ছে করে । তখন ঈদের সময় ঘনিয়ে এলেই শুরু হয়ে যেতো নানান জল্পনা-কল্পনা। রাত পোহালেই ঈদ। আর ঈদ মানে ঈদ ! রীতিমতো বড় ঈদ বা বখরা  ঈদ। আমরা সে সময় আমাদের ভাষায় কোরবানী ঈদকে বখরা ঈদ বলতাম । রোজার ঈদের মতো কোরবানী ঈদে নতুন জামা কেনার দিকে খুব বেশি ঝুঁক না থাকলেও একেবারেই যে কেনা হতোনা তা কিন্তু নয়। তবে বড়ো শিং-অলা কোরবানীর গরুর দিকেই আকর্ষণ থাকতো বেশি। যদিও ভয় পেতাম তারপরও ঘুরে ফিরে বাড়ির উঠুনে বাঁধা গরুর কাছেই ছুটে যেতাম বারে বারে। আমাদের সময়ে একটি মজার উৎসব হতো দুই ঈদেই। আমাদের গ্রামের বাড়ির সামনে বিরাট পুকুরের কথা আজ-ও মনে পড়ে । ঈদের দিন খুব ভোরে কাক ডাকার আগেই চিৎকার করে ‘ আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ‘ বলে দৌড়ে ছুটতাম পুকুর ঘাটে। তারপর বড়োদের সাথে সাঁতার কেটে গোসল সেরে ঘরে এসে নতুন জামা-কাপড় পড়ে শুরু হতো বড়দেরকে পা ছুঁয়ে সালাম করা। ঈদের নামাজের জন্যে বড়োদের সাথে মিলে ঈদগাহ তে যেতাম পায়ে হেঁটে । অবশ্য বর্ষা হলে নৌকায় চড়ে ঈদের জামাতে শরীক হতাম । ঈদের নামাজ শেষে শুরু হতো বাড়িতে বাড়িতে গরু জবাই । গরু জবাই ও কাটাকাটি শেষ হলে গরুর ভিতর থেকে এক ধরনের পাতলা চামড়া দিয়ে আমরা ভাঙা মাটির কলসির মুখে লাগিয়ে রোদে শুকিয়ে ঢোল বানাতাম। এসব মনে হলে এখনও মজা পাই। আমাদের নতুন প্রজন্মের উদ্দেশ্যেে বলি, তোমরা তোমাদের এই সময়ের ঈদকে মনে রেখে শব্দের দ্বারা সাজিয়ে লিখে রাখো।
যেকোনো উৎসব আয়োজনে সবচেয়ে বেশি প্রাণোৎফুল্ল থাকে আমাদের শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণী। কিন্তু এবার আমাদের এই অগ্রবাহিনী তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় চারমাসের অধিক সময় মনমরা হয়ে সময় কাটাচ্ছে। আমি বলবো আমাদেরকে আরেকটু সয্য করতে হবে। এ বছর করোনাকালে আমাদেরকে অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে। তাই আমরা এবছর একটু সয়ে চলবো, সুন্দর আগামীর আশায়। আমরা একটু কৌশলী ভূমিকা নিয়ে এবারের ঈদ পালন করবো। এই দুঃসময় চলে যাবে ইনশাআল্লাহ। সময় চলে যায় তবু অনেক ঘটনা একেবারে যেনো জীবন্ত থেকে যায় । এ-কাল বলি আর সে-কাল বলি সবার সব কথার শেষ কথা হলো ঈদ মানেই আনন্দ । মনে জেগে থাকুক আমাদের ঈদ। প্রাণবন্ত হোক ঈদ সকল সময়ের । করোনার পাশাপাশি  এবার বন্যায় আমাদের দেশের মানুষ বিপর্যস্ত। তাই অসহায় মানুষের কথা মাথায় রেখে বলি – ঈদ হোক সকলের ।।
মোহাম্মদ আব্দুল হকঃ কলামিষ্ট , কবি ও প্রাবন্ধিক।

সম্পাদক: শাহ সুহেল আহমদ
প্যারিস ফ্রান্স থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: