বুধবার, ১৭ অগাস্ট ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ২ ভাদ্র ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

সিলেটে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে বন্যা




সিলেট অফিস:

বন্যা পরিস্থিতির ভয়াবহতার মধ্যে সিলেট বিভাগে বয়ে গেছে কালবৈশাখী ঝড়, সেই সাথে বজ্রপাত। গত বুধবার সন্ধ্যার পর থেকে থেমে থেমে কালবৈশাখী ঝড় আঘাত হানে বিভাগের বিভিন্ন স্থানে। এতে কোথাও কোথাও ঘরবাড়ির ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে কোন খবর পাওয়া যায়নি হতাহতের। এছাড়া সিলেট জেলাজুড়ে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ভারতের আসাম ও মেঘালয়ের পাহাড়ি এলাকায় বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। এখন পর্যন্ত অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছে সিলেটের জমিনে। বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও সিলেট নগরীর কয়েকটি এলাকার লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছেন। পানির নিচে তলিয়ে আছে অসংখ আবাসিক এলাকার রাস্তাঘাট। এসব এলাকার অধিকাংশ বাসাবাড়িতে পানি প্রবেশ করায় দুর্ভোগে আছেন বাসিন্দারা। বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য ও শৌচাগারের অভাবে অনেকে তাদের বাসাবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে যাচ্ছেন। সময় যত যাচ্ছে এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। গতকাল সিলেট সদর, কানাইঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জকিগঞ্জ, জৈন্তাপুর, দক্ষিণ সুরমা, বালাগঞ্জ ও ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। বিভিন্ন উপজেলায় প্লাবিত হয়েছে নতুন নতুন এলাকা। প্লাবিত এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়াও বাঁধ ও পাকা রাস্তাসহ বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন লোকজন। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস, ঔষধ, জ্বালানি তেলের দোকান পানির নিচে থাকায় এসব উপজেলায় মানবিক বিপর্যয়ের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এদিকে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সিলেটের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা। জেলার লক্ষাধিক গ্রাহক বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন। সিলেট নগরীতে অর্ধ লক্ষাধিক গ্রাহক এই দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন গেল দুইদিন ধরে। সিলেটে বরইকান্দি সাবস্টেশন ও শাহজালাল উপশহরে একটি ফিডার পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ আছে। বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এসব স্টেশন পুরো চালু করা সম্ভব নয় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে, ভারি বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পহাড়ি ঢলে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তণীয় রয়েছে হাওরের জেলা সুনামগঞ্জে। এজেলায় নিম্নাঞ্চলের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে, শিক্ষাঙ্গন, মসজিদসহ ও কবরস্থান প্লাবিত হয়ে ব্যাপক ক্ষতি ও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। রাস্তাঘাটের পাশাপাশি বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। ক্রমে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। বন্যায় পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবন যাপন করছে জেলার অর্ধলক্ষাধিক মানুষ।

গতকাল বিকেল ৫ টা পর্যন্ত সুনামগঞ্জের প্রধান নদী সুরমাসহ, যাদুকাটা, কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, গত বুধবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পানি বেড়েছে। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত পানি স্থির হয়ে ছিলো। গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় সুনামগঞ্জের ষোলঘর পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

এদিকে ছাতকে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ১০০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী ৪৮ ঘন্টা ভারতের মেঘালয়, আসাম সীমান্তে ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভবনা রয়েছে, এতে সুনামগঞ্জ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

এদিকে বন্যার পানি সড়কে উঠে যাওয়ায় জেলার তাহিরপুর-বিশ্বম্ভরপুর-সুনামগঞ্জ এবং সুনামগঞ্জ -হালুয়াঘাট – মঙ্গলকাটা সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
ভারি বর্ষণ এবং উজানের ঢলে সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার সুরমা, দোহালিয়া, দোয়ারাবাজার সদর ও ছাতকের ইসলামপুর, নোয়ারাই, সিংচাপইর, উত্তর খুরমা, ছাতক সদরসহ ১০টি ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। দোয়ারাবাজার উপজেলার ৩টি ইউনিয়নের এক হাজার ২০০ পরিবার এবং এক হাজার গবাদি পশু। ছাতক উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের ছয় হাজার পরিবার ও চার হাজার গবাদিপশু পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। দুইটি উপজেলায় ২টি আশ্রয়কেন্দ্রে শতাধিক পরিবার আশ্রয় নিয়েছে।

পাহাড়ি ঢলে ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার নিচু এলাকার সড়কগুলো ডুবে যাওয়া সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দা সাফিউদ্দিন বলেন, ছাতকের বিভিন্ন এলাকার বাড়িঘর ও রাস্তা ঘাটে বন্যায় প্লাবিত। পানিবন্দি মানুষ ডুবে যাওয়া কাঁচা বাড়িঘর ও গৃহপালিত পশু নিয়ে বিপাকে পরেছেন।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহুরুল ইসলাম ইনকিলাবকে জানান, উজানে বৃষ্টিপাত হলে পানি বাড়বে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। আগামী ৪৮ ঘণ্টায় উজানে মেঘালয়, আসাম এবং হিমালয় প্রদেশে ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা আছে।

সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, পাহাড়ি ঢল ও অতি বৃষ্টিতে সুনামগঞ্জে সুরমা নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি মানুষের জন্য ১৫ মেট্রিকটন চাল ও ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৫টি উপজেলা বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। বন্যা মোকাবেলায় সকল ধরণের প্রস্তুতি রয়েছে।

অন্যদিকে, জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার কুলকান্দি ইউনিয়নের মিয়াপাড়া গ্রামে যমুনা নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের একটি স্থানের ৪০ মিটার অংশ ধসে গেছে। গত বুধবার সন্ধ্যা থেকে বাঁধের ওই এলাকায় ধস শুরু হয়। এমন পরিস্থিতিতে দ্রæত বাঁধসংস্কারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এদিকে, উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল ও অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে যুমনা নদীর পানি অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। এতে উপজেলার নিচু এলাকাগুলো প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা।

স্থানীয়রা জানায়, পাহাড়ি ঢলের কারণে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে নদীতে ব্যাপক স্রোত হচ্ছে। কুলকান্দি ঘাট থেকে প্রায় ৮০০ মিটার দূরে বাঁধের একটি অংশে ভাঙন দেখা দিয়েছে। পানির স্রোতে বাঁধ থেকে বøকগুলো ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।

পাউবো জামালপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবু সাঈদ জানান, পাহাড়ি ঢলে নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। পূর্ব পাশে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। এর ফলে এই অংশে পানির চাপ বেশি। একই সঙ্গে নদীতে তীব্র স্রোত রয়েছে।

ছাতক (সুনামগঞ্জ) উপজেলা সংবাদদাতা জানান, সুনামগঞ্জের ছাতকে বন্যায় বেড়েছে মানুষের দুভোর্গ। উপজেলার প্রতিটি গ্রাম ও বসতবাড়িগুলোতে প্রবেশ করেছে পানি। রাস্তাঘাট ব্রিজ কালভার্ট পানির নিচে। সব এলাকা এখন বন্যায় প্লাবিত। এ পর্যন্ত উপজেলার প্রায় লাখো মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। পানি বৃদ্ধির কারণে এখন সারা দেশের সাথে ছাতকের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

বন্যার পানিতে পৌর এলাকার বাঁশখলা, চরেরবন্দ, মন্ডলীভোগ, দক্ষিণ বাগবাড়ী, ভাজনামহলসহ বেশির ভাগ অলিগলিতে পানি ঢুকে পড়ায় পরিবার নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন এসব এলাকার লোকজন। বন্যার পানির প্রবল স্্েরাতে ছাতক-দোয়ারা ভায়া সুনামগঞ্জ সড়কের বিয়ানিবাজার এলাকার একটি সেতু ভেঙ্গে পড়েছে। এতে জেলা সদরের সাথে সড়ক যোগাযোগ পুরোপুরিভাবে বিচ্ছিন্ন ।

সম্পাদক: শাহ সুহেল আহমদ
প্যারিস ফ্রান্স থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: