মঙ্গলবার, ৯ অগাস্ট ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ২৫ শ্রাবণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ঈদ নেই সিলেট-সুনামগঞ্জের অর্ধকোটি মানুষের




হুমায়ূন রশিদ চৌধূরী:

সিলেটের বিভিন্ন উপজেলার যেসব স্থান থেকে বন্যার পানি নেমেছে, সেসব এলাকায় এখন চলছে আশ্রয়হীন মানুষের বিলাপ। অনেকেই বড় সড়কের পাশে পলিথিন টানিয়ে গত ২০ দিন ধরে বসবাস করছেন। ঘর গেছে, গেছে আসবাবপত্রসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও। সামনে ঈদুল আজহা-এর মধ্যে চলমান বন্যায় মানুষের হাজারো সমস্যা। এই পরিস্থিতিতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সিলেট ও সুনামগঞ্জের অন্তত অর্ধকোটি মানুষ অসহায়।

দুর্যোগ ও ব্যবস্থাপনা ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বলেছেন, ‘সিলেটের ১২২ বছরের ইতিহাসে এমন বন্যা হয়নি। এদিকে, আবার সিলেটে বৃষ্টি শুরু হলে বানভাসি মানুষের মন ভীষণ খারাপ। আবার মঙ্গলবার রাত থেকে বৃষ্টি শুরু হয়। হালকা ও মাঝারি আকারের বৃষ্টিতে নদ-নদীর পানিও বাড়তে থাকে। বুধবার আবহাওয়ায় বার্তায় বলা হয় সিলেটে ৫০-৬০ কিলোমিটার বেগে ঝড় বইতে পারে। রবিবার পর্যন্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এতে চলমান বন্যা পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা ভেবে-এলাকার বাসিন্দা অস্থির।

আগামীতে আরও বন্যার ঝুঁকি: চেরাপুঞ্জিতে ২৭ বছরের রেকর্ড

সম্প্রতি সিলেট সফরকালে বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি শেলডন ইয়েট সিলেটের সাম্প্রতিক বন্যার জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করেছেন। এ কারণে আগামীতে এ অঞ্চলে আরও বেশি বন্যার ঝুঁকি রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে ২৭ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত ভারতের মেঘালয় রাজ্যের চেরাপুঞ্জিতে ১৬ জুন বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সকাল থেকে ১৭ জুন শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৯৭২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা ১৯৯৫ সালের পর থেকে জুন মাসের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত বলে জানিয়েছে ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগ (আইএমডি)।

আইএমডির তথ্যে দেখা গেছে, তারা রেকর্ড রাখা শুরু করার পর থেকে বিশ্বের অন্যতম বৃষ্টিবহুল শহর চেরাপুঞ্জিতে জুনের একদিনে এ পর্যন্ত নয়বার ৮০০ মিলিমিটারেরও বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। আসামের গুয়াহাটিতে আইএমডির আঞ্চলিক কেন্দ্রের আবহাওয়া বিজ্ঞানী সুনিত দাস সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, চলতি মাসের গত শুক্রবার পর্যন্ত চেরাপুঞ্জিতে মোট ৪ হাহার ০৮১ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।

লাখ লাখ মানুষ নিঃস্ব

এদিকে, স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় সিলেট বিভাগের চার জেলার ৬৩ লাখ মানুষ বিপন্ন হয়ে পড়ে। এর মধ্যে সিলেট ও সুনামগঞ্জেই লক্ষাধিক লোক গৃহহারা। রাস্তাঘাট, বিভিন্ন অবকাঠামো, বাড়ীঘর, ফসলের মাঠ, পুকুরের মাছ, প্রাণিসম্পদ এমনকি বহু মানুষের চাল-চুলা পর্যন্ত ভাসিয়ে নেয় বন্যার পানি। শহর-গ্রাম, হাওর নদী একাকার হয়ে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়। বিশেষ করে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার ২৪ উপজেলার লাখ লাখ মানুষ অসহায় নিঃস্ব।

বড় সড়কের উপর বসবাস

যাদের বাড়ি আছে এখন বসবাসের উপযুক্ত নয়। যারা বাড়ি হারা হয়েছেন তারা আশ্রয় শিবির বা বড় সড়কের পাশে ঠাঁই নিয়েছে। সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়ক ও সিলেট-জগন্নাথপুর অঞ্চলিক সড়কের পাশে পলিথিন টানিয়ে শত পরিবার এখানো বসবাস করছে। তাদের অনেকেউ জানান, রাতে তারা ঘুমাতে পারেন না। কখন যে বেপরোয়া গাড়িগুলো তাদের পিষে নিয়ে যায়।

এদিকে, নদীর পানিও নামছে খুব ধীরে। তাই সিলেটের সুরমা ও কুশিয়ারা তীরবর্তী অনেক জায়গা জলমগ্ন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আবার সুরমা-কুশিয়ারার পানি বাড়তে থাকে। এতে তীরবর্তী বসিন্দারা শঙ্কিত হয়ে উঠেন। বুধবার পানি কিছুটা কমলেও বিকাল পর্যন্ত বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এদিকে বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। দুর্গত এলাকায় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ ও চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় সাহায্য প্রার্থী বেশী। ঘরে ঘরে জ্বরসহ পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব।

গৃহনির্মাণে প্রধানমন্ত্রীর অনুদান

প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ৫ হাজার পরিবারকে গত সোমবার গৃহনির্মাণ বাবদ ১০ হাজার টাকা করে প্রদান শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান। অনুরূপভাবে সুনামগঞ্জ জেলার ক্ষতিগ্রস্ত ৫ হাজার পরিবারকে গৃহনির্মাণ বাবদ অনুদান দেওয়া হচ্ছে।

৫৬ জনের মৃত্যু

সিলেট স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় সিলেট জেলায় ১৮ জনসহ পুরো বিভাগে ৫৬ জনের মৃত্যু হয়। বন্যা বা বন্যাজনিত কারণে যারা মৃত্যু বরণ করেছেন, তাদের বিশেষ সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন বলে অনেকেই বলেছেন।

সম্পাদক: শাহ সুহেল আহমদ
প্যারিস ফ্রান্স থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: