শনিবার, ২২ জুন ২০২৪ খ্রীষ্টাব্দ | ৮ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বিশেষ সম্পাদকীয়: প্যারিসে স্বপ্নের শহীদ মিনার, ‘ভুলে’র খোঁজে দূতাবাস এবং অন্যান্য




শাহ সুহেল আহমদ :

বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত প্রহরের দুই দিন পর ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তৈরি করেন প্রথম শহীদ মিনার। প্রথম শহীদ মিনারের নকশাকার সাঈদ হায়দারের তথ্য মতে- প্রথম ‘শহীদ মিনার’-এর গায়ে সাঁটা কাগজের ফলকে এর পরিচয় লেখা ছিল শহীদ ‘স্মৃতিস্তম্ভ’। মিনার বলি আর স্তম্ভই বলি, এ ছিল রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ক্রান্তিলগ্নে নির্মিত এক ঐতিহাসিক স্থাপনা- যে পাষাণের অন্তর্নিহিত অমিতশক্তিতে ভীত হয়ে মুসলিম লীগ সরকা অচিরেই একে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে শেষ প্রস্তরখণ্ডটিও অপসারণ করে। মাত্র তিন দিনের কম আয়ু নিয়ে এসেছিল প্রথম শহীদ মিনার। কিন্তু ৬৫ বছর আগের সেই স্থাপনাটির উত্তরসূরি আজকের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার বছরের পর বছর স্মরণ করিয়ে দেয় বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিকে।

সেটি এখন দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশের মাটিতে আমাদের ভাষা আন্দোলনকে সমুন্নত করছে। বিশ্বের বহু দেশে শহীদ মিনার স্থাপিত হয়েছে। ফ্রান্সেও সেই প্রচেষ্টা চলছিল দীর্ঘদিন থেকে। কিন্তু আলোর মুখ দেখছিল না। দু’ বছর আগে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস থেকে বেশ দূরে তুলুজ শহরে প্রথম শহীদ মিনারের যাত্রা শুরু হলেও ফ্রান্সের প্রাণকেন্দ্র রাজধানী প্যারিসে একটি শহীদ মিনারের আকাঙ্খা প্রত্যেকটা বাঙালির মনে প্রাণে। আর সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতেই অ্যাসোসিয়াশন সিকানো বাঙালি বৃহত্তর প্যারিসে একটি স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করার উদ্যোগ নেয়। সেই স্বপ্নে শহীদ মিনার আলোর মুখ দেখেছে গতকাল রবিবার।

উদ্বোধনী এই মাহেন্দ্রক্ষণকে ঘিরে প্রবাসী বাংলাদেশীদের উচ্ছ্বাসের কোনো কমতি ছিল না। দলমত নির্বিশেষে রবিবার হাজারো প্রবাসী জড়ো হন শহীদ মিনার বেদিতে। যোগ দেন ফরাসী জনগণরে পাশাপাশি নানান ভাষাভাষী মানুষেরা। ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান তারা। আয়োজকরা নান্দনিক পরিবেশনা দিয়ে মাতিয়ে রাখেন অনুষ্ঠান।

কিন্তু সেই ঐতিহাসিক মুহুর্তটিকে কয়েকটি মহল কয়েকটি বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এর একটি হলো- শহীদ মিনারের গায়ে কেন অন্য ভাষার বর্ণ লাগানো হলো? এটি যারা প্রশ্ন করছেন বা এ বিষয়টাকে কেন্দ্র করে যারা ঐতিহাসিক এই মুহুর্তটাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছেন, তারা মূলত উলুবনে মুক্ত ছড়ানোর চেষ্টা করছেন মাত্র। এদের সম্যক ধারণা নেই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার সাথে শুধু বাংলা নয়, বাংলাকে প্রাধান্য দিয়ে বিশ্বের প্রতিটি মাতৃভাষাকে শ্রদ্ধা জানানোর নামই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে ইউনেস্কো কর্তৃক বাংলা ভাষাকে স্বীকৃতি বিশ্বদরবারে এনে দিয়েছে এক বিশাল খ্যাতি। ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে বিশ্বজুড়ে অমর একুশের উদযাপন নিঃসন্দেহে এক বিশাল জাতীয় গৌরব ও সম্মানের। ২০০০ সাল থেকে ইউনেস্কোর সদস্য রাষ্ট্রগুলো এ দিবসটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করে। যে যার জায়গায় নিজের ভাষাটাকেই সম্মান জানানোর নাম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা। তবে যখনই দিনটি স্মরণ করা হবে, খুব স্বাভাবিকভাবেই এর ইতিহাস ঘাটতে গিয়ে বাংলাকে সম্মান জানাতে হবে। আর এভাবেই বাংলা ছড়িয়ে যাবে বিশ্বময়।

আমার মনে হয়- তারা যদি জানার অভাবে শহীদ মিনারে অন্য বর্ণের বিরোধীতা করে থাকেন তাহলে খুব স্বাভাবিক। কিন্তু শুধু বিরোধীতা করার জন্য বিরোধীতা যদি হয়ে থাকে, তবে এটি মানসিক দৈনতা বৈ কিছুই না।

এবার আসা যাক অন্য প্রসঙ্গে। শহীদ মিনার আমাদের জাতীয় প্রতিক না হলেও এটি আমাদের জাতিসত্বার চেতনার জায়গা। আমাদের ঐক্যের প্রতিক। বাঙালি তথা বাংলাদেশীদের আত্মত্যাগের প্রতিক। এ রকম একটি বিষয় সামনে থাকলেও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়নি প্যারিসে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস। এটা উপস্থিত প্রবাসীসহ বিদেশী অতিথিদের ভাবিয়েছে। তবে দু’দিন আগে একটি অনুষ্ঠানে শহীদ মিনারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দূতাবাস উপস্থিত থাকবে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে বলা হয়- প্যারিসের প্রথম স্থায়ী ঐতিহাসিক শহীদ মিনার নির্মাণের সাথে সংশ্লিষ্টরা দূতাবাসকে যে চিঠিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, সেটাতে শহীদ মিনারের ইতিহাসে ভুল রয়েছে। কোনো ভুল ইতিহাসের সাথে দূতাবাস যোগ দেবে না বলে দূতাবাস থেকে জানানো হয়। তবে আয়োজকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে- চিঠিতে কোনো ভুল ইতিহাস নেই। চিঠিতে ফরাসী বিপ্লবের সাথে শহীদ মিনারের সামঞ্জস্যতা দেখানো হয়েছে।

এখানে যদি ধরেই নেই, আয়োজকরা চিঠিতে ভুল করে ফলেছেন- তারপরও তো দূতাবাস এখানে উপস্থিত থাকতে পারতো। কারণ এটা আমাদের জাতিসত্বার বিষয় এবং দূতাবাস বিদেশের মাটিতে আমাদের প্রতিনিধিত্ব করে। চিঠির মতো ছোট্ট একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে দূতাবাস শহীদ মিনারের মতো একটি আবেগের জায়গায় না যাওয়া অবশ্যই দু:খজনক। ঐতিহাসিক মুহুর্তটি ঘিরে কোনো বিতর্কের প্রয়োজন ছিল না। তবে ওইদিন পাকিস্তানের সাথে ক্রিকেট ম্যাচ খেলেছে আমাদের দূতাবাস। অবশ্য জয়ও পেয়েছে, যা খানিকটা আমাদের আনন্দ দিয়েছে।

শেষ করছি, তবে দুজন মানুষের কথা কৃতজ্ঞতাভরে উল্লেখ করতেই হয়। একজন আয়োজক সংগঠনের সভাপতি সরুফ সদিউল এবং ওই সংগঠনের প্রধান উপদেষ্ঠা ও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রধান সমন্বয়ক কাজী এনায়েত উল্লাহ। তাদের নিরলস প্রচেষ্ঠা প্যারিসের বুকে একটি স্থায়ী শহীদ মিনারের বাস্তব রূপায়ন পেলেন প্রবাসীরা।

বাংলা ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে বহির্বিশ্বে ভারত ও বাংলাদেশের পর ব্রিটেন ও আমেরিকায় সবচেয়ে বেশি চর্চা হয়ে থাকে। এর বাইরে চীন, জাপান, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, জার্মানি, পোল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বাংলা ভাষার সংস্কৃতি চর্চা হচ্ছে। আমেরিকায় কমপক্ষে ১০টি বিশ্ববিদ্যালয় ও এশীয় গবেষণা কেন্দ্রে বাংলা ভাষার চর্চা হচ্ছে। এর মধ্যে নিউইর্য়ক,শিকাগো,ফ্লোরিডা, ক্যালিফোর্নিয়া, ভার্জিনিয়া উল্লেখযোগ্য। কিন্তু ফ্রান্সে তা ক্ষিণ।

প্যারিসের মাটিতে ঐতিহাসিক শহীদ মিনার উদ্বোধন হয়েছে ঠিক। এখন বাংলা ভাষার চর্চাকে কীভাবে ফ্রান্সের বুকে বাড়ানো যায়, সেটাই হোক মুখ্য বিষয়।

 

লেখক : শাহ সুহেল আহমদ, সম্পাদক- বাংলা টেলিগ্রাম ফ্রান্স ।

সম্পাদক: শাহ সুহেল আহমদ
প্যারিস ফ্রান্স থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: