শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬ খ্রীষ্টাব্দ | ২৭ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

Sex Cams

কলাম: সাইবার অশ্লীলতা ও মানহানির কালো থাবা




সাইবার অশ্লীলতা ও মানহানির কালো থাবা

সাইফুল ইসলাম রনি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বাংলাদেশের মানুষের অভিব্যক্তি ও মত প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই মত প্রকাশের মাধ্যমের অন্ধকার দিক হচ্ছে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ, ব্যক্তির সম্মানহানি, মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবে কাউকে হেয় করার প্রবণতা। ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউব কিংবা এক্স (সাবেক টুইটার) প্রতিটি প্ল্যাটফর্মে এখন দলমত নির্বিশেষে এক শ্রেণির মানুষ প্রতিপক্ষকে কেবল যুক্তি দিয়ে নয়, বরং জঘন্য অশ্লীলতা ও ব্যক্তিগত আক্রমণের মাধ্যমে ‘ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন’ করছে। এটি কোনো স্বাধীনতা নয়, এটি সামাজিক পচন। এই প্রবণতার লাগাম না টেনে ধরলে সমাজ যে কেবল বিশৃঙ্খলার দিকে যাবে তা-ই নয়, বরং সুস্থ আলোচনার সংস্কৃতি চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন প্রতিদিন হাজার হাজার পোস্ট ও মন্তব্যে ব্যবহৃত হচ্ছে এমন ভাষা, যা এক যুগ আগেও কল্পনাও করা যেত না। কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক, লেখক, শিক্ষক বা সাধারণ নাগরিক কেউই রেহাই পাচ্ছেন না। শুধু রাজনীতি কেন, খেলাধুলা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় আলোচনা, এমনকি ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও অশ্লীল টিপ্পনী কাটা হচ্ছে। বিশেষ করে নারী ও সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর প্রতি এই আক্রমণ আরও নির্মম। অনেকে মনে করেন, পর্দার আড়ালে পরিচয় গোপন রেখে যা খুশি বলা যায় এর কোনো শাস্তি নেই। কিন্তু এই ‘ডিজিটাল নির্লজ্জতা’ ধীরে ধীরে বাস্তব সমাজের আচার-আচরণকেও বিকৃত করছে।

একটি মিথ্যা বা বিকৃত পোস্ট, একটি কটাক্ষপূর্ণ কমেন্ট বা ভিডিও ক্লিপের মাধ্যমে কারও ‘ইমেজ’ নিমেষে ধ্বংস করা যায়। এর শিকার ব্যক্তি হতাশা, বিষণ্ণতা, সামাজিক বর্জন, চাকরি হারানো, এমনকি আত্মহত্যার মতো চরম পথ বেছে নেন এমন উদাহরণ বাংলাদেশে অনেক আছে। সামাজিক মাধ্যম আজ ‘ভার্চুয়াল লিঞ্চিং’-এর জায়গায় পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রকৃত সত্যের বিচার না করেই মানুষ রায় দিয়ে দেয়। এই মানহানি কেবল অনলাইনে থেমে থাকে না, তা অফলাইনে গিয়ে প্রতিবেশী, সহকর্মী, আত্মীয়-স্বজনের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে ভুক্তভোগীর বাস্তব জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।

যখন কোনো সমাজে ব্যক্তির সম্মান ও মর্যাদা সুরক্ষিত থাকে না, তখন সেখানে স্বাভাবিক শৃঙ্খলা থাকে না। সমাজে দেখা দেয় বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্ট হয় অস্থিরতা।
যেমন একজন আরেকজন কে গালি দিলে বা হেয় করলে, পাল্টা আরও কটু ভাষায় জবাব দেওয়া হয়। এর ফলে সামাজিক সম্পর্কগুলোকে বিষিয়ে তোলে। একটি মিথ্যা পোস্টের জেরে মারধর, ভাঙচুর এমনকি হত্যার মতো ঘটনা সম্প্রতি বাংলাদেশে বহুবার দেখা গেছে। যখন অশ্লীলতা ও গালিগালাজকে ‘স্বাধীন মত প্রকাশ’ বলে চালানো হয়, তখন প্রকৃত সমস্যা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা সম্ভব হয় না। সমাজ স্তব্ধ হয়ে যায়।

এর থেকে উত্তরনের উপায় হচ্ছে কোনো পোস্ট বা মন্তব্য করার আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন এটা কি সত্য? এটা কি প্রয়োজন? এটা কি সৃজনশীল? এটা কি কারও ক্ষতি করবে? ভিন্নমতের সঙ্গে শালীনতায় জবাব দিন, একমত না হওয়া মানেই গালিগালাজ নয়। যুক্তি দিয়ে, তথ্য দিয়ে, ভদ্র ভাষায় প্রতিবাদ করুন। আক্রমণের শিকার হলে আইনি পদক্ষেপ নিন। পাল্টা গালি দেওয়ার বদলে স্ক্রিনশট রাখুন, রিপোর্ট করুন, আইনের আশ্রয় নিন।
এছাড়াও বাবা-মা ও শিক্ষকদের উচিত শিশু-কিশোরদের সোশ্যাল মিডিয়ায় শিষ্টাচার ও ডিজিটাল এথিক্স শেখানো। স্কুল-কলেজে ‘সাইবার সচেতনতা’ বাধ্যতামূলক পাঠ্যক্রমের অংশ হওয়া জরুরি। অশ্লীল ভাষা ও ব্যক্তির সম্মানহানি-সংক্রান্ত পোস্ট দ্রুত শনাক্ত ও অপসারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ব্যবহারকারীর রিপোর্টিং ব্যবস্থা জোরদার করা যেতে পারে। বারবার নীতিমালা ভঙ্গকারী অ্যাকাউনটির বিরুদ্ধে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

বাংলাদেশে সাইবার নিরাপত্তা আইন (ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধিত সংস্করণ) ও মানহানি আইন রয়েছে। কিন্তু এগুলো কার্যকর প্রয়োগের অভাব রয়েছে। সাইবার ট্রাইব্যুনাল ও তদন্ত সংস্থার দক্ষতা বাড়াতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অনলাইনে ব্যক্তির সম্মানহানি ও গালিগালাজের ঘটনায় দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ ও ব্যবস্থা নিতে হবে।

শুধু আইন ও প্রযুক্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন একটি ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন। গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ, ধর্মীয় নেতা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সাধারণ নেটিজেনদের যৌথ উদ্যোগে ‘শালীন সোশ্যাল মিডিয়া’ ক্যাম্পেইন চালানো দরকার। হ্যাশট্যাগ, পোস্টার, ওয়েবিনার, সচেতনতামূলক ভিডিও সব মাধ্যমেই প্রচার করতে হবে যে, অনলাইনেও মুখের ভাষা ও আচরণের দায়িত্ব আছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একটি শক্তিশালী অস্ত্র। এটি যেমন জ্ঞান-বিজ্ঞান, সংহতি ও মুক্তির হাতিয়ার হতে পারে, তেমনি অশ্লীলতা ও মানহানির অস্ত্র হয়ে সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে। আজ যদি আমরা এই সাইবার অশ্লীলতা ও সম্মানহানির লাগাম টেনে না ধরি, তবে আগামী দিনের সমাজ হবে হিংসা, অবিশ্বাস ও বিশৃঙ্খলার প্রতীক। তখন আর কান্না করেও লাভ হবে না। তাই এখনই সময় ব্যক্তি হিসেবে সংযত হওয়ার, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার, আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করার, এবং সবার আগে নিজেকে ‘ডিজিটাল সভ্য’ হিসেবে গড়ে তোলার। মনে রাখবেন, পর্দার আড়ালেও আপনার শব্দের দাগ কেউ না কেউ বহন করে। সেই দাগ যেন কাউকে রক্তাক্ত না করে। সচেতন হোন, শালীন হোন, সমাজকে বাঁচান।

সম্পাদক: শাহ সুহেল আহমদ
প্যারিস ফ্রান্স থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: