শুক্রবার, ১৯ অগাস্ট ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ৪ ভাদ্র ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং গণমাধ্যমগুলোর বয়ানের কার্যকারিতা !




তানভীর আহমদ তোহা

সপ্তাহখানেক আগে আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো ! পুরো দুনিয়ায় শ্বাসরুদ্ধকরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলো তাদের এবারকার নির্বাচন! মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কেন্দ্র করেই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের তীর্থস্থানের এবারের ব্যালট যুদ্ধে সবার বাড়তি মনোযোগ ছিলো !! এবারকার  আমেরিকার প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনকে   নিয়ে  অনেক পয়েন্ট অব ভিউ থেকে  কথা বলা যায়!!
আমি শুধুমাত্র গণমাধ্যমের সম্পর্কিত  একটি বিষয়ই তুলে আনতে চাই!
২০১৬ সালের প্রেসিডেন্সিয়াল ইলেকশনে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন  রিপাবলিকান পার্টির দলীয় মনোনয়ন লাভের লড়াইয়ে  অর্বতীর্ণ হোন ;তখন  বেশীরভাগ গনমাধ্যমেই ট্রাম্পের সর্বাত্মক বিরোধিতায় অবতীর্ণ হয়। ট্রাম্প শুরু থেকেই তার দাম্ভিক আচরন, অস্থির ব্যাক্তিত্ব, ব্যাপক মিথ্যাচার, বিভেদ ও সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক বক্তব্য , অগ্রহণযোগ্য বডি ল্যাংঙ্গুয়েজ দ্বারা আমেরিকার মেইন স্ট্রিম গণমাধ্যমের বিরোধিতায় অবতীর্ণ হোন! ফলত ; ট্রাম্প এবং আমেরিকার মেইনস্ট্রিম গণমাধ্যম পরস্পর বিপরীতমুখী অবস্থান নেয়। ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে যখন আন্তঃদলীয়  প্রার্থীতা বাছাই প্রক্রিয়ায়  ট্রাম্পের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছিল, তখন বাহিরে দুনিয়ায় মানুষের কাছে আমেরিকার প্রধান প্রধান গনমাধ্যম ট্রাম্পকে একজন অপদার্থ ব্যক্তি হিসাবেই উপস্থাপন করেছিলো।বাহিরের দুনিয়ায় মানুষও ট্রাম্পের বাস্তব কার্যক্রম দেখে তাকে নিতান্ত একজন ভাড় হিসাবে চিহ্নিত করেছিলো! কেউ তখন কল্পনাই করেন নি ডোনাল্ড ট্রাম্প রিপাবলিকান পার্টির প্রেসিডেন্সসিয়াল নমিনেশন  পেতে যাচ্ছেন কিংবা বিশ্বের সর্বাধিক ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হতে চলছেন  । কিন্তু,সব জল্পনা -কল্পনাকে  উড়িয়ে দিয়ে ডনাল্ড ট্রাম্প রিপাবলিকান পার্টির মনোনয়ন পান!!  একই ঘটনা ঘটে  প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও!! বিভিন্ন প্রভাবশালী সংস্থার জরিপ এবং গনমাধ্যমগুলোর আগাম বার্তায় বরাবারই বলা হচ্ছিল  বিপুল ভোটে এবং বীর বিক্রমে  হোয়াইট হাউসের হট চেয়ারে বসতে যাচ্ছেন মার্কিন ঝানু রাজনীতিবিদ হিলারী ক্লিনটন। কিন্তু, ফলাফল হয়েছিলো  ঠিক উল্টো। ব্যালট যুদ্ধে  হিলারী অনেকটা এগিয়ে থাকলেও  মার্কিন নির্বাচনী সিষ্টেম “ইলেক্টোরাল কলেজের”  সমীকরণে নির্বাচনী বৈতরণি পার হয়ে হোয়াইট হাউসের অধিপতি হয়ে ছিলেন মার্কিন ধনাঢ্য ব্যাবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রেসিডেন্ট হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন হটকারী সিদ্ধান্ত, মুসলিম এবং ইমিগ্রেন্ট বিরোধী বক্তব্য  দিয়ে আমেরিকার বহুত্ববাদী সংস্কৃতিকে করেছিলেন প্রশ্নবিদ্ব এবং সকটাপন্ন। তাছাড়া,জলবায়ু সমস্যার মতো বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা ছিলো চরম হতাশাজনক । ট্রাম্পের বিতর্কিত বহু কর্মকান্ডের কারনে আমেরিকান অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক অভিযোগ করেছিলেন  যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প  বিশ্ব নেতৃত্ব থেকে আমেরিকাকে ক্রমশ ঘুটিয়ে নিচ্ছেন। এমন প্রেক্ষাপটে গত ৩ রা নম্ভেম্বর অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো প্রেসিডেন্ট নির্বাচন!  এবারের প্রসিডেন্ট পদে রিপাবলিকান  ডনাল্ড ট্রাম্প্রের প্রতিধন্ধী হিসাবে লড়েছিলেন  ডেমোক্র্যাট দলীয় জো বাইডেন।৭৭ বছর বয়সী জো বাইডেনের রয়েছে দীর্ঘ ৫০ বৎসররের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার। এবারের নির্বাচনে মার্কিন জনগন রেকর্ডসংখ্যাক তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। এই নির্বাচনে মার্কিন জনগন যতখানি বাইডেনের  অর্থনৈতিক পলিসি এবং উদার অভিবাসন নীতির কারনে তাকে ভোট দিয়েছে, তার চেয়ে  বেশী ভোট দিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঠেকানোর কারনে। ডোনাল্ড ট্রাম্প যাতে ফের  আমেরিকার রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসতে না পারেন সেই জন্যই  আমেরিকার ভেতরে এবং বাহিরের সকল উদারপন্থী গনমাধ্যমগুলো ডোনাল্ড ট্রাম্প্রের মতো উদ্ভত্য,  অহংকারী এবং বিভেদ ও সাম্প্রদায়িক ঘৃনা সৃষ্টিকারী  ব্যাক্তিত্বকে ঠেকানোর বিরুদ্ধে  জোরদার প্রচারনা করেছিলো।
কিন্তু, মূল কথা হচ্ছে যে ডোনাল্ড ট্রাম্প্রের বিরুদ্ধে  গণমাধ্যমের এতো শক্তিশালী  প্রচারনার পরও তিনি কিভাবে ২০১৬ সালে  প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন?  পাশাপাশি,  এবারকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জো বাইডেন মার্কিন ইতিহাসের রেকর্ড সংখ্যক ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেও, ট্রাম্পকে হারিয়ে নির্বাচনে বিজয়ী হতে বাইডেনের প্রচুর ঘাম ঝরাতে হয়েছে।বাইডেনের এই বিজয়ের পথে তিনি অনেক রেকর্ড গড়েছেন। প্রথমত সবচেয়ে বেশি ৭৭ বছর বয়সে তিনি প্রেসিডেন্ট হলেন। দেশের ইতিহাসে তিনিই সবচেয়ে বেশি সাত কোটি ৬১ লাখ ৯৩ হাজার ৯০৫ ভোট পেয়েছেন। সবশেষ পরিসংখ্যানে শতাংশের হিসাবে এই সংখ্যা ৫০.৮। ইতিহাসে তৃতীয় নারী হিসেবে ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেটর কমলা হ্যারিসকে রানিং মেট হিসেবে নিয়েছিলেন বাইডেন। আগের দুই নারী প্রার্থী পরাজিত হলেও এবার বিজয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন কমলা। একই সঙ্গে তিনিই প্রথম আফ্রিকান আমেরিকান ও এশীয় বংশোদ্ভূত
অন্যদিকে,সবশেষ পরিসংখ্যানে মোট ভোটের ৪৭.৫ শতাংশ পেয়েছেন ট্রাম্প। সংখ্যার হিসাবে যা দাঁড়ায় সাত কোটি ১৩ লাখ ৫০ হাজার ৩০৭। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট। ২৪টি রাজ্যে তিনি জয় পেয়েছেন; তাঁর প্রিয় ফ্লোরিডা, টেক্সাসসহ।
মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর পক্ষ থেকে এতো বিরোধিতা সত্বেও  ডনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনে  এতো ভোট  পাওয়া কি প্রমাণ হয় না গণমাধ্যমগুলো আর আগের মতো জনগনের  আস্থায় নেই?! সাধারণত সকলের কাছে এতো দিন এই ধারণা প্রতিষ্টিত ছিলো যে, গণমাধ্যম শুধুমাত্র   মানুষের নিকট সংবাদ প্রচার ও প্রসার করে তা নয়,  সমাজকে যে কোন সিদ্ধান্তে পৌছাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাছাড়া,কোন সুনির্দিষ্ট বিষয়ের উপর সমাজের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের একই মনস্তত্ত্ব  গড়ে তুলতেও গনমাধ্যম ব্যাপক ভূমিকা রাখে।
কিন্তু,আমেরিকায় পরপর দুটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দেখা গেছে  ব্যাপক সংখ্যাক সাধারন মানুষ গনমাধ্যমের প্রচারনার উপর ভিত্তি করে নয়, অনেকেটাই নিজের মতো করেই তারা তাদের রাজনৈতিক   সিদ্ধান্ত নিয়েছে । সবশেষ নির্বাচনে  ডোনাল্ড ট্রাম্প হারলেও এবং  দুঃখজনক হলেও এটা প্রমাণ হয়েছে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেপরোয়া উক্তি, অভিবাসন বিরোধী মনোভাব এবং  তার হোয়াইট সোপ্রিমেসিক মনোভাব  আমেরিকার কোটি মানুষ পছন্দ ও সমর্থন করে।
অন্যদিকে, আমরা যদি বাংলাদেশে সাধারণ জনগণের উপর  গনমাধ্যমগুলোর বয়ানের কার্যকারিতা দেখি  ; তখন তো আমাদের সামনে আরও হতাশাজনক চিত্র ফুটে উঠে। বাংলাদেশের মেইনস্ট্রিম গণমাধ্যমগুলোর কোন রাজনৈতিক বয়ান জনগন এখন আর আস্থায় নেয় না। কারন   মেইনস্ট্রিম গণমাধ্যমের রাজনৈতিক বয়ানকে বাংলাদেশের মানুষ এখন বর্তমানে চলমান হাসিনা নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিবাদেরই অশ্লীল এবং বেসুর তথ্যসন্ত্রাসই মনে করে। ফলশ্রুতিতে, বাংলাদেশের মানুষ মেইনস্ট্রিম গণমাধ্যমগুলোর বিপরীতে দাড়িয়ে তারা নিজেদের  চিন্তাকে এবং বক্তব্যকে খুবই চমৎকারভাবে এক অন্যের কাছে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশে সর্বত্র এখন  ফ্যাসিবাদ বিরোধী চরম মনোভাব তৈরী হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং বাংলাদেশের পরিস্থিতি দেখলে সহজে বোঝা যায় গণমাধ্যমগুলো এখন তাদের বয়ানগুলোর দ্বারা  সাধারণ জনগণের মাঝে আর তেমন কোন শক্তিশালী প্রভাব সৃষ্টি করতে পারছে না। তবে আমেরিকা এবং বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলোর অবশ্যই কিছু গুনগত প্রার্থক্য রয়েছে। আমেরিকার বেশীরভাগ  মেইনস্ট্রিম গণমাধ্যমগুলো দলবাজি এবং তেলবাজিকে কোন প্রশ্রয় না দিয়ে গনতন্ত্রের মহান মশালকে শক্ত হাতে প্রজ্বলিত করে আমেরিকার জাতীয় স্বার্থকে সর্বদাই এগিয়ে রেখে নিজেরা পথ চলছে । অন্যদিকে, বাংলাদেশের বেশীরভাগ মেইনস্ট্রিম গনমাধ্যমগুলো এক ব্যাক্তির শাসনকে ঠিকিয়ে রাখতে দূবৃিত্ত, সন্ত্রাসী এবং দিল্লীর  অবৈধ ইচ্ছার সাথে প্রতিনিয়ত  পরকীয়া করে নিজেদের ঠিকিয়ে রাখছে।তবে এটা এখন সত্য যে , সাধারণ মানুষ এখন গণমাধ্যমের উপর ভরসা ছাড়াই নিজেদের বয়ান নিজরাই তৈরী  করছে। এটা হোক আমেরিকা কিংবা বাংলাদেশে।
লেখক: কো-অর্ডিনেটর; আন্তজার্তিক ডেস্ক, বাংলা-টেলিগ্রাম।

সম্পাদক: শাহ সুহেল আহমদ
প্যারিস ফ্রান্স থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: