বুধবার, ১৭ অগাস্ট ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ২ ভাদ্র ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশে ধর্মান্ধতায় সম্মতি ও মুক্তমত প্রকাশে বাধা




লোকমান আহম্মদ আপন

বাংলাদেশের ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠি অযতাই আন্দোলন সংগ্রামের নামে লাফালাফি করে থাকে। সম্প্রতি মুক্তমত প্রকাশের তীর্থভূমি ফ্রান্সে প্রকাশিত কার্টুন ও ফরাসী প্রেসিডেন্ট এর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠি প্রতিবাদের নামে যা করেছে সেটা চরম নেক্কারজনক, অযৌক্তিক ও নজীরবিহীন। মুসলিম ধর্মান্ধরা প্রকাশ্য দিবালোকে রাজপথে ফরাসী প্রেসিডেন্টর কুশপুত্তলিকা ও ছবি পোড়ানোর মতো ঘৃণ্য কাজ করলেও বাংলাদেশের সরকার দোষীদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি।
ফরাসী দূতাবাস ঘেরাও, বয়কট ফ্রান্স, ফরাসী পণ্য বর্জনসহ নানা রকম দাবী দাওয়া নিয়ে রাজপথে অযৌক্তিক আন্দোলন করে ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠি। কিন্তু, ধর্মান্ধতাকে সমর্থনকারী স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকার উল্টো মৌলবাদীদের সেই অযৌক্তিক আন্দোলনকে সমর্থন করেছে। বাংলাদেশের সরকার অবৈধ সেই মৌলবাদী আন্দোলনকে সমর্থন করার পাশাপাশি ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের দাবী মেনে নিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ফরাসী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে। যা বিষ্মিত করেছে মুক্তবুদ্ধির বিবেকবান প্রতিটি মানুষকে।
বাংলাদেশের সরকার ধর্মান্ধতা ও ধর্মীয় অস্থিরতাকে সব বরাবরেই সমর্থন করে থাকে। সেই সমর্থন এখন এই পরযায়ে গিয়ে পৌছেছে যে, বাংলাদেশ সরকার এখন উগ্র ধর্মান্ধদের সাথে একাত্নতা ঘোষণা করে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় একটি দেশ ফ্রান্সের আভ্যন্তরিন এবং ব্যক্তিগত বিষয়েও নাক গলানোর মতো সাহস দেখাচ্ছে। যা সত্যিই বিস্ময়কর। বাংলাদেশে চলছে চরম অপশাসনের পাশাপাশি ধর্মের চরম অপব্যবহার এবং অপপ্রয়োগের যুগ। যে যেভাবে পারছে ধর্মের অপপ্রয়োগ আর অপব্যবহার করে যাচ্ছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলসহ বিভিন্ন মতলবে তথাকথিত রাজনীতিবিদ, তথাকথিত আধুনিক শিক্ষিত মানুষ আর তথাকথিত মোল্লা মৌলানাদের দৌরাত্বে বাংলাদেশ এখন এক অস্থির সময় পার করছে। ধর্মকে ব্যবসার হাতিয়ার করে নিয়ে ইচ্ছেমত অপকর্ম আর দূষণ চলছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের সরকার ধর্মের নামে অস্থিরতা ও উন্মাদনা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত কোন ব্যবস্থা না নিলেও মুক্ত মতপ্রকাশকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
সরকার কিংবা সরকার দলীয় প্রভাবশালীদের অনিয়ম দুরনীতি ও মানবতাবিরোধী কাজের সমালোচনা করলেই হতে হচ্ছে হত্যা, গুম, মামলা হামলাসহ নানা হয়রানির শিকার। ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে মুক্তমত প্রকাশ করলেই হতে হচ্ছে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের হামলার শিকার। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন লেখক, সাংবাদিক, প্রকাশক, ব্লগার ও অনলাইন এক্টিভিস্ট ধর্মীয় উগ্রবাদী হামলায় নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি নিয়মিত ধর্মীয় উগ্রবাদীতায় হামলা নির্যাতন ও হত্যার শিকার হচ্ছেন বাংলাদেশে বসবাসকারী সংখ্যালঘু মানুষ। ধর্মীয় উগ্রবাদী এসব হত্যাকান্ডের একটিরও বিচার হয়নি আজ পরযন্ত। ধর্মান্ধ তথাকথিত আলেম ও মোল্লা মৌলানারা প্রকাশ্য মাহফিলে হাজার হাজার মানুষের সামনে মানবতা বিরোধী, রাস্ট্র বিরোধী এবং তীব্র উগ্রবাদী বক্তব্য দিলেও তাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকার কোন ব্যবস্থা নেয়না, বরং তাদেরকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দিয়ে রাখে।
মুক্তমত প্রকাশকারীরা বাংলাদেশের সরকার এবং ধর্মান্ধদের চিরশক্র। উগ্রবাদী ধর্মান্ধতা কিংবা সরকারের ঘৃণ্য অপকর্মের বিরুদ্ধে কোন কথা বললেই মুক্তমনাদের উপর নেমে আসে চরম দুরযোগ। আওয়ামী লীগ সরকার ধর্মান্ধতায় নমনীয় ও উদার কিন্তু মুক্তমনা লেখক সংবাদিকদের বিরুদ্ধে খুবই কঠোর। বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকারের নানান রকম নিরযাতনের শিকার হয়ে বিনা বিচারে কারাভোগ করছেন বেশ কয়েকজন লেখক, সাংবাদিক ও কার্টুনিষ্ট। উগ্র ধর্মান্ধদের হামলা ও আওয়ামী লীগ সরকারের কোন রকমে জীবন বাঁচিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অভিবাসী জীবনযাপন করছেন বাংলাদেশের অনেক লেখক, সাংবাদিক, প্রকাশক, ব্লগার ও সংখ্যালঘু মানুষ। কিন্তু ধর্মীয় উগ্রবাদীরা দেশে চরম অস্থিরতা তৈরী করলেও সরকারী সমর্থনে বাংলাদেশে তারা আছে বহাল তবিয়তে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলো বাংলাদেশের চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের তীব্র প্রতিবাদ জানালেও বাংলাদেশ সরকার এসবের কোন ভ্রক্ষেপ না করে উগ্র মৌলবাদীদেরকে প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে এবং ভিন্নমত পোষণকারী মুক্তমনা লেখক সাংবাদিক নিধনে ব্যস্তে আছে।
ক্ষমতায় আরোহন ও ঠিকে থাকার জন্যে রাজনৈতিক নেতানেত্রীরা ধর্মান্ধ আর অদূরদর্শী এইসব মোল্লা মৌলানাদের ব্যবহার করে। আধুনিক ও সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত না হওয়ায় এসব ধর্মীয় উগ্রবাদীরা সহজে রাজনৈতিক ট্র্যাপে পরিণত হয়। কিছু উচ্চ ডিগ্রিধারী মৌলানা আবার লোভের বশবতি হয়ে সরকারের চামচামী করে নিজের ব্যক্তিগত ফায়দা হাসিল করেতে গিয়ে তৈরী করে ধর্মীয় বিভাজন ও অস্থিরতা। সঠিক শিক্ষা ও জ্ঞানের অভাবে সাধরন মানুষ এই দুই পক্ষের কুট কৌশল ধরতে পারে না। তারা না জেনে বুঝে, অন্ধভাবে অথবা বাধ্য হয়ে ক্ষমতাসীনদের পক্ষাবলম্বন করে। ধর্মীয় অস্থিরতাকে জিইয়ে রেখে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করে রাজনীতির ব্যবসায়ীরা। বাঙালি হবে একটি অসাম্প্রদায়িক জাতি।
ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি হবে রাষ্ট্রের ভিত্তি। গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের মিশ্র আদর্শে এই ভূখণ্ড পরিচালিত হবে। বিবেকবান,অসাম্প্রদায়িক মুক্তবুদ্ধি, যুক্তিবাদী মনের মানুষ যেন আর তৈরি হতে না পারে তাই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে ছলে -বলে কৌশলে। ভিন দেশের ভাষায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম অর্থ না বুঝে ধর্ম গ্রন্থ পড়লে যা হবার তাই হচ্ছে আজকের বাংলাদেশে। ধর্ম গ্রন্থগুলোকে বুঝে পড়তে হবে। ভয়, ঘৃণা, বিদ্বেষের লেন্স দিয়ে ধর্ম গ্রন্থ পড়া থেকে বিরত থাকতে হবে। বেশিরভাগ ফ্রন্টলাইন মিলিট্যান্ট ধর্ম ব্যাখ্যা দ্বারা প্রভাবিত। তারা বিশ্বাস করে আল্লার রাস্তায় দ্বীন কায়েম করার জন্য নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে বিধর্মীদের জীবন হরণ করাই বেহেশত লাভের পথ । সরকার সমর্থিত এই ধর্মান্ধতা বাংলাদেশকে এক ভয়ানক পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
ছোটবেলা থেকে হৃদয়ে ধারণ করে আছি একটি পরম সত্য বাণী ’সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’ । কিন্তু আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতা একেবারেই তার উল্টো ‘সবার উপরে ধর্ম সত্য মানুষ তো নাই।
লোকমান আহম্মদ আপন: লেখক ও সাংবাদিক। প্যারিস, ফ্রান্স।

সম্পাদক: শাহ সুহেল আহমদ
প্যারিস ফ্রান্স থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: