বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬ খ্রীষ্টাব্দ | ১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Sex Cams

যে শহর বৃষ্টির জন্য বিখ্যাত, সেখানে এখন আগুনঝরা দিন




শাহ সুহেল আহমদ:

দুপুর গড়িয়ে বিকেল। প্যারিসের বিখ্যাত ত্রোকাদেরো চত্বরে দাঁড়িয়ে দূরে আইফেল টাওয়ার দেখা যাচ্ছে। সাধারণত এই সময় পর্যটকদের ভিড়ে হাঁটার জায়গা পাওয়া কঠিন হয়। কিন্তু আজ দৃশ্যটা ভিন্ন। অনেকে গাছের ছায়ায় বসে আছেন, কেউ কেউ মাথায় ভেজা কাপড় চেপে রেখেছেন। রাস্তার পাশের পানির ফোয়ারাগুলোর চারপাশে শিশুদের ভিড়। হাতে পানির বোতল নিয়ে পর্যটকেরা বারবার মুখ ধুয়ে নিচ্ছেন। সূর্যের তাপে পাথরের চত্বর থেকে যেন আগুনের আঁচ বের হচ্ছে।

প্যারিস মেট্রোর কিছু স্টেশনে নেমে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট বোঝা যায়। বাতাস ভারী, গরম আর আর্দ্রতায় অনেক যাত্রী হাতপাখা ব্যবহার করছেন। ট্রেন থেকে নেমেই অনেকে পানির বোতল বের করছেন। স্টেশনের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে কারও কারও কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। ফ্রান্সের রাজধানীতে এমন দৃশ্য একসময় বিরল ছিল।

শহরের বিভিন্ন পার্কেও এখন একই চিত্র। লুক্সেমবার্গ পার্কের ছায়াময় অংশে বেঞ্চগুলো প্রায় পূর্ণ। ঘাসের ওপর শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন অনেকে। কেউ বই পড়ছেন, কেউ কেবল গরম থেকে বাঁচার চেষ্টা করছেন। সেঁন নদীর তীরে সন্ধ্যা নামার পর মানুষের উপস্থিতি বাড়ছে। দিনের তাপ থেকে কিছুটা স্বস্তি পেতে অনেকে নদীর বাতাসের আশায় সেখানে জড়ো হচ্ছেন।

এই দৃশ্য সেই প্যারিসের সঙ্গে খুব একটা মেলে না, যাকে পৃথিবী চেনে বৃষ্টি, মেঘলা আকাশ আর মৃদু আবহাওয়ার শহর হিসেবে।

কিন্তু সেই শহরই আজ তীব্র তাপদাহে হাঁসফাঁস করছে। জুনের শেষ সপ্তাহে ফ্রান্সজুড়ে তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের তাপমাত্রা রেকর্ড হচ্ছে। প্যারিসের রাস্তায় দুপুরের দিকে বের হলে মনে হয় শহরটি যেন তার চিরচেনা রূপ হারিয়ে ফেলেছে। গরম বাতাস মুখে এসে লাগে, ফুটপাতের পাথর উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, আর ছায়াহীন রাস্তায় হাঁটা হয়ে পড়ে কষ্টকর।

বাংলাদেশের পাঠকদের কাছে ৩৮, ৪০ বা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস খুব অস্বাভাবিক মনে নাও হতে পারে। কিন্তু প্যারিসে এই তাপমাত্রা এক ধরনের সামাজিক ও অবকাঠামোগত সংকট তৈরি করে। কারণ শহরটি গড়ে উঠেছে শীত মোকাবিলার জন্য, গরমের জন্য নয়। সিংহভাগ  আবাসিক ভবনে এখনো শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই। দিনের তাপ দেয়াল ও ছাদে জমে থাকে, ফলে রাতেও ঘর সহজে ঠান্ডা হয় না। অনেকের কাছে রাতের ঘুম দিবাস্বপ্নের মতো।

তাপদাহের এই দৃশ্য প্যারিসের ঐতিহাসিক পরিচয়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। উনিশ শতকের সাহিত্যিক ভিকটর হোগো কিংবা পরবর্তী যুগের শিল্পীদের সৃষ্টিতে যে প্যারিসকে দেখা যায়, সেখানে বৃষ্টি ও ঋতুর কোমলতা ছিল এক অপরিহার্য উপাদান। অথচ একবিংশ শতাব্দীর প্যারিস এখন জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি।

প্যারিসের আধুনিক রূপের স্থপতি হিসেবে পরিচিত জেওরজ উজেন হোসমান  উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শহরটিকে নতুনভাবে সাজিয়েছিলেন। সম্রাট নেপোলিয়নের নির্দেশে নির্মিত প্রশস্ত সড়ক, গাছঘেরা বুলেভার্ড ও বিস্তৃত পার্কগুলো শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, জনস্বাস্থ্য ও নগরজীবনের মান উন্নয়নের জন্যও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই সময়ের নগর পরিকল্পনাবিদেরা কল্পনাও করেননি যে একদিন প্যারিসকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার সঙ্গে লড়াই করতে হবে।

শহরের বিভিন্ন পার্কে এখন মানুষ ছায়া খুঁজছে। শিশুদের দেখা যাচ্ছে ফোয়ারার পানিতে খেলতে। কেউ কেউ পানির বোতল হাতে বারবার মুখ ও মাথা ভিজিয়ে নিচ্ছেন। দুপুরের পর অনেক রাস্তা তুলনামূলক ফাঁকা হয়ে যায়। সেঁন নদীর তীরে সন্ধ্যার পর মানুষের উপস্থিতি বাড়ে। দিনের তাপ থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই নদীর বাতাসে কিছুটা স্বস্তি খোঁজেন।

সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন যাঁরা খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন। নির্মাণশ্রমিক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, ডেলিভারি রাইডার কিংবা বিভিন্ন সেবাখাতের কর্মীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদের মধ্যে কাজ করছেন। চিকিৎসকেরা সতর্ক করছেন, অতিরিক্ত তাপ শরীরে পানিশূন্যতা, ক্লান্তি, মাথা ঘোরা এবং গুরুতর ক্ষেত্রে হিটস্ট্রোকের কারণ হতে পারে।

প্যারিসে বসবাসকারী বাংলাদেশি প্রবাসীদের অনেকের কাছেও এবারের গরম অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। তাঁদের কেউ কেউ বলছেন, ঢাকার গরমের সঙ্গে পরিচিত হলেও প্যারিসের এই পরিস্থিতি ভিন্ন। কারণ এখানে গরম মোকাবিলার প্রস্তুতি ও সামাজিক অভ্যাস নেই বললেই চলে। বিশেষ করে পুরোনো ভবনগুলোতে বসবাসকারীরা বেশি সমস্যায় পড়ছেন।

ফরাসিদের কাছে তাপদাহের স্মৃতি অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ২০০৩ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ তাপপ্রবাহ আঘাত হানে। ফ্রান্সে প্রায় ১৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে সরকারি হিসাব জানায়। একা বসবাসকারী বয়স্ক মানুষদের মধ্যে মৃত্যুহার ছিল সবচেয়ে বেশি। সেই ঘটনার পর ফ্রান্স সরকার তাপদাহ মোকাবিলার জন্য বিশেষ সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করে। হাসপাতাল, বৃদ্ধাশ্রম এবং স্থানীয় প্রশাসনকে জরুরি পরিকল্পনার আওতায় আনা হয়।

তবু জলবায়ুবিজ্ঞানীরা বলছেন, পরিস্থিতি ক্রমেই আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব দেখা যাচ্ছে ইউরোপে। তাপপ্রবাহ দীর্ঘ হচ্ছে, ঘন ঘন ফিরে আসছে এবং আগের চেয়ে বেশি তীব্র হয়ে উঠছে। একসময় যে তাপমাত্রাকে ব্যতিক্রমী বলে মনে করা হতো, এখন তা প্রায় নিয়মিত ঘটনার রূপ নিচ্ছে।

২০১৯ সালে প্যারিসে প্রথমবারের মতো ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছিল। তখন অনেকেই একে ব্যতিক্রমী ঘটনা মনে করেছিলেন। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে নতুন নতুন তাপপ্রবাহ দেখিয়ে দিয়েছে।

আজকের প্যারিস পৃথিবীর পরিবর্তিত আবহাওয়ার এক গল্প। যে শহর একসময় বৃষ্টির জন্য বিখ্যাত ছিল, সেই শহর এখন আগুনঝরা দিনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। ইতিহাসের পথে প্যারিস বহু পরিবর্তনের সাক্ষী, রাজতন্ত্রের পতন, বিপ্লব, যুদ্ধ, পুনর্গঠন এবং আধুনিকায়ন। কিন্তু জলবায়ুর এই পরিবর্তন হয়তো সেই সব পরিবর্তনের চেয়েও গভীর, কারণ এর প্রভাব সীমাবদ্ধ নয় কোনো একটি শহর বা দেশের মধ্যে।

সেঁন নদীর তীরে দাঁড়িয়ে যখন উত্তপ্ত বাতাস মুখে এসে লাগে, তখন মনে হয় প্যারিস যেন নীরবে একটি নতুন যুগে প্রবেশ করছে। বৃষ্টিভেজা শহরের সেই চিরচেনা ছবিটি ফিসফিস করে বলে দেয়- ঋতুর ভাষা বদলাচ্ছে, বদলে যাচ্ছে প্যারিসের জীবনও।

সম্পাদক: শাহ সুহেল আহমদ
প্যারিস ফ্রান্স থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: