বুধবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

বদরী চেতনা বদরী শিক্ষা




শাহ সুহেল আহমদ

ঐতিহাসিক বদর দিবস আজ। প্রতিবছর বদরের এই দিনে আমরা বিভিন্ন রকমের আয়োজন করে মুসলমানদের ঐতিহ্যকে তুলে ধরি। নানা অনুষ্ঠানাদির মধ্য দিয়ে আমরা নিজেদের ইতিহাসকে খুঁজে ফিরি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বদরের ইতিহাস থেকে আমরা খুব কমই শিক্ষা গ্রহণ করি।

বদরের ওই দিন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত সমগ্র দুনিয়ার মুসলমানগণ বদরের রূহকে নিজেদেরকে মধ্যে জাগরুক রাখার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে। এটা মূলত আমাদের প্রতি সাহাবিদের একটি উপদেশ।

প্রখ্যাত সাহাবি সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস বলেন, ‘আমরা কোরআনের একটি সূরাকে বুঝার জন্য যেভাবে প্রচেষ্টা চালাতাম, আল্লাহর রাসূলের (স.) একটি গাযওয়াকেও বুঝার জন্যও আমরা একই রকম প্রচেষ্টা চালাতাম।’

বদরী ঈমানের সাথে বর্তমান মুসলমানদের ঈমানের তুলনা করা হয়তো ঠিক হবে না। কিন্তু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট রাষ্ট্রগুলোতে ইসলামের ধারক-বাহকদের বর্তমান অবস্থা দেখলে বদরের সাথে তাদের একটু মেলাতেই হয়। বদর আমাদের বলেছিল, আল্লাহ ব্যতিত আর কোথাও মাথা ন্যুয়ানো যাবে না। অথচ বর্তমান বিশ্বের মুসলিম নেতাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণে বদরের শিক্ষা কোথায় আছে তা খুব পরিষ্কার। বদর বলেছিল- শত সহস্র বাধা উপেক্ষা করে ঈমানদীপ্ত থাকতে হবে। অথচ আজকে যারা ঈমানের পতাকা হাতে নিজেদের ইসলামের ধারক-বাহক বলে পরিচয় দেন, সেসব আলেমকুলই বা কোন্ পথে হাঁটছেন, তাও কি প্রশ্নবিদ্ধ নয়?

ক্লাসে একবার শিক্ষক বলেছিলেন- প্রাতিষ্ঠানিক বড় বড় ডিগ্রি নিয়ে তা সর্বত্র সমানতালে ব্যবহার করা যাবে না। স্থান কাল পাত্র ভেদে কথা বলতে হবে। উদাহরণ হিসেবে বলেছিলেন- কৃষকের কাছে গিয়ে রকেট কীভাবে আবিষ্কার হয়, সে গল্প করে নিজেকে জাহির করা মানে জ্ঞানীর পরিচয় দেয়া নয়, এটা মুর্খতারই নামান্তর।

কথাটা বলতে হলো এজন্য যে, ইদানিং বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশী জনৈক আলেমের দেয়া ভুলে ভরা ফতোয়া নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে সর্বত্র। সম্প্রতি তিনি ফতোয়া দিয়েছিলেন- খুব কঠিন কোনো কাজে কর্মরত থাকলে রমজানের রোজা না রাখলেও চলবে। পরে সময় করে একবার রেখে নিলে হবে। উদাহরণ হিসেবে তিনি রিক্সাওয়ালাদের কথা বলেছেন।

হাদীসে এ বিষয়ে কী বলা হয়েছে, সে বিষয়ে আমি আলোচনা করছি না। আলোচনার বিষয় হলো- যদি এ রকম কোনো হাদীস থেকেই থাকে তবে এটা তিনি কাদের কাছে বলতে পারেন? যে আমজনতা খুব কঠিন মাসআলার মধ্যেও ফরজ নামাজ পড়ে না কিংবা লুকিয়ে লুকিয়ে রোজা ভেঙে খায়, সেই আমজনতার কাছে এই সহজলভ্য ফতোয়াটা কতটুকু যুক্তিযুক্ত?

অথচ বদর যুদ্ধের শিক্ষা ছিল শত কষ্টের মাঝেও ঈমানের মৌলিক জায়গা থেকে যেন মুসলমানরা সরে না যায়। বদর যুদ্ধে ইসলামের মুজাহিদ ছিলেন ৩১৩ জন, অপরপক্ষে কাফেরদের সংখ্যা ছিল এক হাজারের অধিক। কিন্তু ইতিহাসের কোথাও উল্লেখ নেই ইসলাম কায়েম করতে গিয়ে কোনো সাহাবি কিংবা মুহাজির ফরজ রোজা ছেড়ে যুদ্ধ করেছেন।

অথচ, যুদ্ধক্ষেত্রটিতে মুসলমানেরা যে স্থানটিতে অবস্থান নিয়েছিলেন সেখানে সূর্যের তেজ সরাসরি তাদের মুখের ওপরে পড়েছিল। কিন্তু কাফেরদের মুখে দিনের বেলায় সূর্যের আলো পড়ে নি। মুসলমানেরা যেখানে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করেছিলেন সেখানের মাটি একটু নরম ছিল, যা যুদ্ধেক্ষেত্রের জন্য উপযুক্ত নয়।

অপর দিকে কাফেররা যেখানে অবস্থান নিয়েছিলো সেখানের মাটি শক্ত এবং যুদ্ধের জন্য স্থানটি ছিলো উপযুক্ত। এতো কষ্ট করে যারা যুদ্ধ করলেন, ইসলামের পতাকাকে উড্ডয়ন করলেন, তারা রোজা ছাড়লেন না। কিন্তু আমাদের কেউ কেউ সামান্য দৈহিক পরিশ্রমের দোহাই দিয়ে ফরজ রোজা ছেড়ে দেয়ার ফতোয়া আওড়াচ্ছেন।

আমরা তো এই ফতোয়া সকলেই জানি- যে ব্যক্তি খালিস নিয়তে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ একবার পড়বে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। যদি ফতোয়াদানকারী ওই আলেমকে প্রশ্ন করা হয়, এ কালেমা পাঠ করার পর আর এতো ইবাদাতের প্রয়োজন কী?তবে তিনি কী উত্তর দিবেন?

আমি অনেককে বলতে শোনেছি, ওই আলেম নাকি তরুণ সমাজকে নিজেরমুখি করে রাখতে তাদের মতো করে ফতোয়া খুজে বের করেন। এটাই যদি হয় মূল লক্ষ, তবে ইসলাম প্রচার এখানে প্রশ্নবিদ্ধ।

বদর যুদ্ধের পর নবীজির সা. অবস্থান ছিল পরাজিত আত্মসমর্পণকারীদের হত্যা না করা ও কষ্ট না দেওয়া। যুদ্ধ শেষে নবীজি সা. প্রথম ঘোষণা করলেন: ‘তাদের হত্যা কোরো না।’ ‘বদরের বন্দিদিগের প্রতি হজরত মোহাম্মদ সা. যে আদর্শ ব্যবহার দেখালেন, জগতের ইতিহাসে তার তুলনা মেলা ভার।

বদর যুদ্ধের পরও কাফিরদের প্রচেষ্টা থেমে যায়নি। বরং আবু জেহেলের উত্তরসূরিদের চক্রান্ত অব্যাহত রয়েছে। মুসলমানদের ৩১৩ জনের ক্ষুদ্র বাহিনীর হাতে অস্ত্রশস্ত্র সম্বলিত ১০০০ সন্যকে পরাস্ত করা চাট্টিখানি কথা নয়। তা সম্ভব হয়েছে ঈমানী বলে বলীয়ান সাহাবীদের ঈমানী জযবার জন্য। যার জন্য সেদিন ফেরেশতা পাঠিয়েছিলেন স্বয়ং আল্লাহ।

কিন্তু, অতীতের সেই গৌরাবান্বীত মুসলিম জাতীরা আজ কেন এত বিভক্ত? ঐক্য, ভালবাসা, সৌহার্দ্য নেই। বিভিন্ন দলে গোত্রে বিভক্ত এ জাতি। সে সময়ের তুলনায় আজ মুসলমানদের শক্তি, সামর্থ ও জনসংখ্যা অনেক বেশি। তার পরও সারা বিশ্বে ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ সহ ইসলাম বিদ্ধেষীদের হাতে মার খেয়েই যাচ্ছে। সারা বিশ্বে প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।

সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন, কাশ্মির, মিয়ানমার, চীন এই দেশগুলোর দিকে তাকালে মনে হয় যেন মুসলমানরাই একমাত্র সেই জাতি যাদের জীবন, সম্পদ, ঘরবাড়ি এবং তাদের মা-বোনদের ইজ্জতের কোন মূল্য নেই। যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে ভিটে-মাটি থেকে উচ্ছেদ করে তাদের সম্পদ দখল করতে পারে, মা-বোনদের ইজ্জত যত ইচ্ছা লুন্ঠন করতে পারে। আজকাল এই সভ্য পৃথিবীতে যারা মানবাধিকারের কথা বলে তাদের নেতৃত্বেই মুসলিম নিধন চলছে দেশে দেশে। যেন মুসলিম নিধনই মানবতার একটি অংশ মনে হয়।

চলমান প্রেক্ষাপটে আমরা এখনও আশাবাদ ব্যক্ত করতে পারি, যারা ইসলামকে ব্যবহার করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করছেন, যারা মুসলমানদের মাথাকে কাফেরদের পিষ্ঠে ঠেলে দিচ্ছেন, তারা শোধরাবেন। আবার জেগে উঠবেন বদরী চেতনায়।

 

লেখকঃ সাংবাদিক, কলামিস্ট।

সম্পাদক: শাহ সুহেল আহমদ
প্যারিস ফ্রান্স থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: