রবিবার, ২৬ জুন ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১২ আষাঢ় ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

অধরা স্বপ্ন




আব্দুল ওয়াদুদ ময়নুল

মাধবের ছেলে অপু তুখোড় মেধাবী ও প্রখর বুদ্ধিমান। মাধব লোহার মিস্ত্রি। সারাদিন হাতুড়ি পেটে। নিজে লেখাপড়া না করলেও সে চায় তাঁর ছেলে উচ্চশিক্ষিত হবে, ভাল চাকরি করবে, একসময় প্রচুর টাকা হবে। গ্রামের স্কুল-কলেজ থেকে মেট্রিক ও ইন্টারমিডিয়েটে অপু এ গ্রেডে উত্তীর্ণ হয়ে ভীষণ খুশি। তাঁর পরিবার এবং প্রতিবেশী খুশিতে আত্মহারা। স্বপ্ন দেখতে থাকে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা ভাল বিষয় নিয়ে গ্রাজুয়েট করবে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রফেসর,আইনজীবী হবে।

সেই স্বপ্ন নিয়েই গ্রাম্য পরিবেশে বেড়ে উঠা ছাত্রটি গ্রাম ছেড়ে শহরে আসলো। শহরে আসার পর এই আরেক অচেনা, অজানা জগতের বাসিন্দা সে। হাজারো মেধাবী ছাত্র ভর্তিযুদ্ধে তার সহযাত্রী। কাঙ্ক্ষিত কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স না পেয়ে অবশেষে কোন এক বিদ্যাপীঠে তার পছন্দ নয় এমন একটা বিষয়ে স্নাতক করার সুযোগ পেল।

গ্রাম থেকে শহরে আসা ছেলেটির উপর মা-বাবা আশা করেই বসেন, আমার ছেলেটি ব্যারিষ্টার হতে যাচ্ছে। লেখাপড়া শেষে আমার ছেলে অনেক বড় একটা চাকরি পাবে। গ্রামের অন্য সাধারণ সহজ সরল মানুষরা এই ছেলেকে যথেষ্ট সম্মান করে, ভালবাসে, অনেক গর্ব করে। গ্রামের অন্য পিতামাতার কাছে সে উদাহরণ হয়ে থাকে।

এদিকে শহরে আসা অপু বিশ্ববিদ্যালয়ে পা দিয়েই বুঝার বাকী থাকেনা যে, সে কতটুকু সফল হবে। এখানে তার মত হাজার ছাত্ররা একই স্বপ্ন নিয়ে পড়তে এসেছে। বাস্তব জীবনে সে কতটুকু সফল হতে পারবে। মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের স্বপ্ন সে কতটুকু পূরণ করতে সক্ষম হবে।

এই হিসেব দিয়ে শুরু করতে থাকে তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন। পাঁচ-ছয় বছর শুধু একই বিষয়ের উপর পরিক্ষা দিবে সে। যখন শুনতে থাকে এ বিষয়ে ভাল রেজাল্ট পেয়েও কবির, করিম ও কলিমরা আজ বেকার, চাকরি নেই! হাজারো শিক্ষার্থী প্রতি বছর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উত্তীর্ণ হয়ে সার্টিফিকেট নিয়ে ঘরে বসে আছে। ঢাবি, চবি ও শাবির ছাত্রদের বেকারত্বের গল্প শুনতে থাকবে-তখনই হতাশা, দুঃশ্চিন্তা, বিষন্নতায় ভোগবে। তখন কৈশোরের স্বপ্ন নিজের কাছে রূপকথার কল্প-কাহিনীর মত মনে হবে। এবং এটাই বর্তমান বাস্তবতা…

এরপর শুরু হয় চাকরির প্রস্তুতি। এটা আরেক নতুন জগত। মহাকাশ জয়ের মত। চাকরির বাজারে এখন কতজন হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন তার সংখ্যা ভুক্তভোগীরাই জানেন। চাকরির পাওয়া শুধু কল্পনা করা ছাড়া আর কিছুই নেই। তারপরেও শুরু হয় চাকরি নামক সোনার হরিণের পেছনে ছুটাছুটি। বিভিন্ন সেক্টরে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি কালেকশন। “চাকরির খবর” পত্রিকা অনুসন্ধান। বিভিন্ন নিয়োগ পরিক্ষায় সরব উপস্থিতি। ক্ষমতাসীনদের পেছনে ছুটাছুটি…। এই হচ্ছে ছাত্র জীবনের স্বপ্নের পরিসমাপ্তি এবং বেকারত্ব নামক অভিশাপের যাত্রা শুরু। এতটুকু লেখাপড়া শেষ করা ছাত্রটি কীভাবে শহর ছেড়ে গ্রামে মা-বাবার কাছে বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে আশ্রয় নিবে? তার পরের জীবন তো কর্মময় জীবন হয়ে থাকে। কেউ ভাগ্যগুনে ভাল চাকরি পেয়ে যায়, কারো ঠাই হয় বেসরকারী স্কুল, কলেজের শিক্ষক হিসেবে। কেউ ব্যবসায়ী হয়। আবার কেউ প্রবাসেও আসে।

এতটুকু লেখাপড়া করে যারা প্রবাসে আসতে চাচ্ছেন। তাঁদের বলবো-কারিগরি প্রাকটিক্যাল শিক্ষা ছাড়া এখানে দেশের পুঁথিগত সার্টিফিকেটের তেমন মূল্য নেই। যতটুকু বুঝি হতাশা থেকে এমন চিন্তা আসছে। এই প্রবাস হচ্ছে পৃথিবীর আরেক জগত। শিক্ষা- অশিক্ষার কোন পার্থক্য নেই এখানে। আছে শুধু নৈতিক মূল্যবোধের পার্থক্য। এর বাহিরে সবাই শ্রমজীবী। কর্মক্ষেত্রে সবাই একই প্লাটফর্মে অবস্থান করছে। এখানে শান্তি নেই, পরিবার ও বন্ধুবান্ধব নেই। শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবাই মাঠে গোল করার জন্য দৌড়াচ্ছে, মেসি রোনালদোর মত দক্ষ খেলোয়াড় খুবই কম এই জগতের বাসিন্দাদের ভাগ্যে ঘটে। সবাই দেশে রেখে আসা সদস্যদের সুখের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিচ্ছে। একটু সুখের আশায় হন্য হয়ে শান্তির পেছনে ছুটাছুটি করছে…এই জগতের বাসিন্দারাও।

এই দুটো অভিজ্ঞতার সম্মুখীন আমি নিজেই। প্রবাসের এই অশান্তময়, অভিশপ্ত জীবনের চেয়ে তুমরা এই বেকারত্ব, হতাশা, দুশ্চিন্তা ও বিষন্নতা নিয়েও সাহেবজাদাদের মত সুখে আছো, সম্মানে আছো, শান্তিতে আছো।

আব্দুল ওয়াদুদ ময়নুলঃ প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট।

সম্পাদক: শাহ সুহেল আহমদ
প্যারিস ফ্রান্স থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: