মঙ্গলবার, ৯ অগাস্ট ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ২৫ শ্রাবণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

আয়নায় মৃত জলছবি




মোহনা

সুইডেনের আকাশে এখন মন খারাপ করা মেঘের দল ঘুরে বেড়াচ্ছে। সুইডেনে তুলনামূলক বৃষ্টি হয় কম, এখানে বছরের অধিকাংশ সময় তুষারপাত হয়। তুষার আর বৃষ্টি যেন একে অপরের সহোদর। জানালার পাশে বসে আছে সন্তর্পিয়া, তার হাতের মুঠোয় জীবনানন্দ। ইউরোপে এসে এত ব্যস্ত জীবনের আড়ালেও কখনো সাহিত্যকে নিজের ভেতর থেকে হারিয়ে যেতে দেয়নি সন্তর্পিয়া। সে এখন সুইডেনের একটা স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্সের লেকচারার। তার পাশাপাশি চলছে ঘর-সংসার, সাহিত্য চর্চা, আবৃত্তি চর্চা আরো কত কি! বাংলাদেশে আসার খুব একটা সময় হয়ে ওঠেনা তার। তবু সহস্র বছর আগে ফেলে আসা কোনো এক মায়াবী সন্ধ্যার টানে সে প্রায় প্রতি বছরই খুব অল্প সময়ের জন্য বাংলাদেশে আসে। গ্রামে এলে চারপাশের মানুষ তার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, সমাদর আর শ্রদ্ধাবোধের কমতি হয়না কখনো। অথচ কয়েক বছর আগে সমাজের এই মানুষগুলোই তাকে কটুক্তি করেছিলো যখন সে স্টকহোমে পড়তে যাওয়ার জন্য মনস্থির করেছিলো।

পাড়াগাঁয়ে বেড়ে ওঠা একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে একা একা বিদেশে পড়তে যাবে এটা তাদের কাছে মোটেও শোভনীয় ছিলোনা। তারা অনেক বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে সন্তর্পিয়াকে। এমনকি সন্তর্পিয়ার পরিবারও ছিলো এর বিরুদ্ধে। তবু সে হাল ছাড়েনি। জীবন সংগ্রামে বিনা যুদ্ধে পরাজয় মেনে নেওয়ার মত মেয়ে নয় সন্তর্পিয়া। সে তার পরিবারকে অনেক বুঝিয়েও যখন রাজি করাতে ব্যর্থ হলো, তখন সে তার একরোখা জেদ আর আকাশ ছোঁয়া স্বপ্নকে পুঁজি করে স্কলারশিপ নিয়ে পাড়ি জমালো সুইডেনের সাজানো গোছানো স্বপ্নের মত শহর স্টকহোমে। পরিবার তার সাথে রাগ করে যোগাযোগ করেনি বহুদিন। সে সময়টা সন্তর্পিয়ার জন্য খুব কঠিন ছিলো। একদিকে পরিবার আত্মীয়স্বজন ছেড়ে এত দূরে চলে আসা, অন্যদিকে নতুন দেশ নতুন পরিবেশের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া, সবকিছু মিলিয়ে সে সময়টাতে খুব হিমসিম খেতে হয়েছিলো তাকে। তবু সে বিশ্বাস করতো জীবনে কিছু অর্জন করতে হলে হাজারটা প্রতিকূল পরিস্থিতির বিরুদ্ধে লড়াই করেই জয়ের মুকুট ছিনিয়ে আনতে হয়। সে জানে, অনেক সংগ্রামের পর বিজয়ের শেষ হাসি কতোটা প্রশান্তিময় হয়। তাইতো সে নিজ সিদ্ধান্তে নিজ লক্ষ্যে বদ্ধপরিকর থেকেছে সবসময়। এভাবেই একদিন সে তার স্বপ্নকে ছুঁতে পেরেছে, পরিবারের মানুষগুলোর ভালোবাসা ফিরে পেয়েছে, যে সমাজ তাকে একদিন হাজারটা নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে আটকে দিতে চেয়েছিলো সে সমাজই তাকে আজ বাহবা দেয়, শ্রদ্ধাভরে সমাদর করে। প্রকৌশলী স্বামী আর ফুটফুটে এক কন্যা সন্তান নিয়ে স্বপ্নের শহরে এখন তার অনাবিল সুখে দিন কেটে যাচ্ছে।

অন্যদিকে সন্তর্পিয়ার খুব কাছের ছোটবেলার বান্ধবী জোসেফিন, যে কিনা কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের কাঁটাতারে আটকে পড়ে আজ মানবেতর জীবনযাপন করছে। ঠিক যে সময়টাতে সন্তর্পিয়া সমাজের বেড়াজাল ডিঙিয়ে এক বিস্তীর্ন মহাকাশের সন্ধান করে নিয়েছে, সে সময়টাতে জোসেফিন কিছুতেই এই সমাজের কাঁটাতারের বেড়া ডিঙোতে পারেনি। পরিবারের মুখের দিকে চেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে সে বিয়ের পিঁড়িতে বসে। তার পড়াশুনার পার্ট সেখানেই চুকে যায়। সে নতুন করে স্বপ্ন সাজাতে থাকে তার প্রবাসী স্বামীকে নিয়ে। প্রথম কিছুদিন বেশ সুখেই কাটছিলো। তারপর একসময় জোসেফিন আবিষ্কার করে তার স্বামী নেশায় আসক্ত। সে অনেক চেষ্টা করে তাকে সেই অনিষ্ট পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু সমাজের আট দশটা মেয়ের মত সেও হেরে যায় একসময়। এভাবেই কেটে যায় কয়েক বছে। তারপর তালাকনামায় সই করে সে বাবার বাড়িতে চলে আসে। সমাজের মানুষগুলো তার দিকেই আঙুল তোলে। কথায় বলে- পুরুষ মানুষের গায়ে কখনো কাদা লাগেনা। এ প্রবাদের সত্যতা সেদিন সে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলো, যখন সমাজের মানুষগুলো বলেছিলো- পুরুষ মানুষ একটু আধটু নেশা তো করতেই পারে, তাই বলে তাকে তালাক দিতে হবে, নাকি তোমার অন্য কোথাও পরকীয়া চলছে বলে ঘরের স্বামীকে ছেড়ে চলে এলে! এসব কথা শুনে সেদিন লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যেতে চেয়েছিলো জোসেফিন। আজ সমাজের চোখে সে অলক্ষী, অপয়া, খারাপ মেয়ে মানুষ। অথচ এ সমাজের মানুষগুলোই একদিন তাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য করেছিলো। আজ যখন তার জীবনটা অগোছালো হয়ে গেলো, সমাজ তখন তার এ দায়ভার নিতে নারাজ। বিয়ের আগে সন্তর্পিয়া তাকে অনেক বুঝিয়েছিলো পড়াশুনা বন্ধ করে অল্প বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে না বসতে। সন্তর্পিয়া তাকে বলেছিলো- সমাজের মানুষ কি ভাববে তার জন্যই তুই ইচ্ছের বিরুদ্ধে নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে চাচ্ছিস, অথচ যে সমাজের মানুষগুলোর পিড়াপিড়িতে তুই বিয়ে করতে রাজি হয়েছিস, সে সমাজ তোকে কিছুই দিবেনা, তোর ভবিষ্যৎ নষ্ট হলে এ সমাজের মানুষগুলোর কিছুই যাবে আসবেনা, বরং তারা উপহাস করবে। এ সমাজের মানুষগুলো এরকমই রে। সেদিন সন্তর্পিয়া জোসেফিনকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছিলো। কিন্তু আজ জোসেফিন নিজের জীবন থেকে সব হারিয়ে বুঝতে পারলো সেদিন সন্তর্পিয়ার বলা সব কথাগুলোর সত্যতা।

হঠাৎ সেলফোনের শব্দে চৈতন্যদয় হলো সন্তর্পিয়ার। ফোনটা কানে নেওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সে জানতে পারলো- জোসেফিন আত্মহত্যা করেছে! স্তম্ভিত হয়ে বসে পড়লো সে। তার দু’চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো ছোটবেলার বন্ধুকে হারিয়ে ফেলার যন্ত্রনায় দু’ফোটা অশ্রুজল। আসলে এ সমাজ জোসেফিনদের নিজ হাতে আস্তাকুঁড়ে ফেলে দেয়, এ সমাজ জোসেফিনদের বাঁচতে দেয়না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দু’চোখে জলের চ্ছটা দিলো সন্তর্পিয়া। হঠাৎ সে তাকিয়ে দেখে আয়নার গায়ে তার মুখচ্ছবির পাশে ধূসর দৃষ্টিতে অপলক তাকিয়ে আছে জোসেফিনের মৃত জলছবি।।

লেখক: শিক্ষার্থী, গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ, আজিমপুর, ঢাকা।

সম্পাদক: শাহ সুহেল আহমদ
প্যারিস ফ্রান্স থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: