শুক্রবার, ১৯ অগাস্ট ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ৪ ভাদ্র ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

অভিবাসনের দ্বৈত নীতিতে সমালোচিত ইউরোপ




বিশেষ রিপোর্ট:

ইউক্রেন-রাশিয়া সঙ্কটে ৩.৫ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ ইউক্রেন থেকে প্রতিবেশী দেশগুলিতে পাড়ি দিয়েছে, ডা কয়েক দশকের মধ্যে ইউরোপে বৃহত্তম গণ অভিবাসন ঘটাতে শুরু করেছে। সেখানখার দাতব্য সংস্থাগুলি নবাগতদের সাহায্য করার জন্য ছুটে এসেছে। এমনকি, ছোট বাচ্চাদের সাথে ইউক্রেনীয় মহিলাদের জন্য রেল স্টেশনে পোলিশ মায়েদের বেবি স্ট্রলার রেখে যাওয়ার মতো ক্ষুদ্র ও ব্যক্তিগত প্রচেষ্টাও উল্লেখযোগ্য।

অথচ, গত বছর যখন মধ্যপ্রাচ্যের শরণার্থীরা পোল্যান্ড এবং বেলারুশের মধ্যে একটি হিমায়িত বাফার জোনে আটকা পড়েছিল, তখন অন্তত ১৯ জনের মৃত্যু ঘটে। কারণ পোলিশ সরকার তাদের সাহায্য করা থেকে বিরত ছিল। ২০১৫ সালে ১৩ লাখেরও বেশি লোক সিরিয়া, আফগানিস্তান এবং ইরাকের যুদ্ধ থেকে ইউরোপে আশ্রয় চেয়েছিল। জার্মানির মতো কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম দেশ ছাড়া, যারা ১০ লাখেরও বেশি শরণার্থী গ্রহণ করেছিল, বেশিরভাগ ইউরোপীয় দেশগুলিই তাদের বেশি সংখ্যায় গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিল। পূর্ব ইউরোপের মনোভাব ছিল অত্যন্ত কঠোর, বিশেষ করে হাঙ্গেরিতে ডানপন্থী রক্ষণশীল প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান মুসলিমনদেরকে একটি ‘সভ্যতা ও নিরাপত্তা হুমকি’ হিসেবে উল্লেখ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আশ্রয়প্রার্থীদের দূরে রাখার জন্য ১ শ’ মাইল-লম্বা কাঁটাতারের বেড়া তৈরি করেছিলেন। এ মুহুর্তে ইউরোপে উদ্বাস্তু সঙ্কটের গতি ও মাত্রা নজিরবিহীন। ইউরোপীয় প্রতিক্রিয়াও তাই। এখন তারা অতি অনুক‚ল হয়ে শরণার্থীদের জন্য দরজা খুলে দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কটে দরজা বন্ধ করা পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি এবং অন্যান্য দেশ ভাগ্য এবং ভ‚গোলের পরিহাসে ইউক্রেনের উদ্বাস্তু সঙ্কটের দ্বারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এবং ইতিহাসের উল্টোরথে চেপে তারা, এমনকি পোল্যান্ড এবং হাঙ্গেরিও ইউক্রেনীয়দের উষ্ণ অভ্যর্থনা দিচ্ছে।
ইউক্রেনের প্রতি সংহতির বিরল প্রদর্শনীতে ইইউ মন্ত্রীরা সর্বসম্মতিক্রমে ২০০১ সালের একটি নির্দেশনা প্রথমবারের মতো ব্যবহার করে ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের সুরক্ষার চাদরে মুড়ে দিয়েছেন, যা তাদের তিন বছর ধরে ইউরোপীয় দেশগুলিতে বসবাস, ভ্রমণ এবং কাজ করার অনুমতি দেয়। জেনেভা ভিত্তিক গেøাবাল ডিটেনশন প্রজেক্টের র‌্যাচেল রেইলি বলেন, ‘সিরিয়ায় কী ঘটেছে তা দেখুন, আফগানিস্তানে কী ঘটেছে তা দেখুন, ইরাকে দেখুন। এই সমস্ত দেশের শরণার্থীরা আগ্রাসন, সঙ্ঘাত, যুদ্ধ, মানবাধিকার লঙ্ঘন, বৈরিতার অনুরূপ পরিস্থিতি থেকে পালাচ্ছিল এবং তারা একই অভ্যর্থনা পায়নি।’

রেইলি বলেন, ‘যারা আগত তারা অন্য ধর্মে বেড়ে উঠেছে এবং একটি আমূল ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে। তাদের অধিকাংশই খ্রিস্টান নয়, কিন্তু মুসলিম।’ তিনি বলেন, ‘এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, কারণ ইউরোপ এবং ইউরোপীয় পরিচয় খ্রিস্টধর্মের মধ্যে নিহিত।’ পোল্যান্ডে ২০১৫ সালে ক্ষমতায় আসা ‘পপুলিস্ট-কনজারভেটিভ ল’ অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি’ বলেছে যে, শরণার্থীরা সন্ত্রাসবাদী বা রোগের বাহক হতে পারে। ব্রাসেলসে মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউট ইউরোপের সিনিয়র নীতি বিশ্লেষক ক্যামিল লে কোজ বলেন, ‘এটি চ্যালেঞ্জ করা যায় না যে, ইউক্রেনীয়রা ইউরোপীয়। এবং ইউরোপের কিছু অংশে সংহতির অনুভ‚তি রয়েছে, যা ইউক্রেনীয়দের জন্য প্রযোজ্য কিন্তু সিরিয়ান বা আফগান, বা ইথিওপিয়া এবং ইরিত্রিয়া বা সোমালিদের জন্য প্রযোজ্য নয়।’
রেইলি বলেন, ‘এটি একটি ইউরোপীয় সঙ্কট হিসাবে বিবেচিত।’ উদাহরণস্বরূপ, তিনি বুলগেরিয়ার প্রধানমন্ত্রী কিরিল পেটকভকে উদ্ধৃত করেছেন। পেটকভ বলেছেন, ‘এই লোকেরা ইউরোপীয়। এই লোকেরা বুদ্ধিমান, তারা শিক্ষিত মানুষ। এটি তেমন শরণার্থী ঢেউ নয়, যাতে আমরা অভ্যস্ত ছিলাম, আমরা তাদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলাম না, অস্পষ্ট অতীত বিশিষ্ট লোক, যারা এমনকি সন্ত্রাসীও হতে পারে।’ রেইলি বলেন, ‘রাজনীতিবিদদের বক্তৃতা এই ধারণাকে প্রতিফলিত করে যে, ইউক্রেনীয়রা ‘প্রকৃত উদ্বাস্তু’ এবং ইউরোপীয় মহাদেশের বাইরের সঙ্কট থেকে পালিয়ে আসা ব্যক্তিদের মতো তারা কোনো হুমকি নয়। মনোভাবের এই আপাত পরিবর্তন অনেকভাবেই ইউক্রেনীয় প্রেক্ষাপটের প্রতি নির্দিষ্ট এবং এখনও বর্ণবাদ এবং সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ দ্বারা অত্যন্ত কলঙ্কিত।’ সূত্র : সিএস মনিটর।

সম্পাদক: শাহ সুহেল আহমদ
প্যারিস ফ্রান্স থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: