রবিবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ধর্মমনা বনাম মুক্তমনা




লেখক

আব্দুল ওয়াদুদ ময়নুল

স্পর্শকাতর ও পরিচিত দুটি বিষয় ধর্মমনা এবং মুক্তমনা। বিষয় দুটির পরিধি ব্যাপক। এখনকার সমাজে এই দুই শ্রেণীর মধ্যে নানামুখী আলোচনা, সমালোচনা, বাক-বিতণ্ডা লেগেই থাকে। এমনকি শেষ পর্যন্ত হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যেতে দেখা যায়। ধর্মমনা বলতে নির্দিষ্ট কোন ধর্ম নয়, সব ধর্ম থেকে যারা ধর্মকে বিশ্বাস করে, সমর্থন করে, ধর্মের আদেশ-নিষেধাবলী মেনে চলার চেষ্টা করে তাদের সবাই ধর্মমনার অন্তর্ভুক্ত। এতে সকল ধর্মের সাধারণ, মূর্খ, পন্ডিত, ধর্মভীরু, ধর্মান্ধ, কট্টরপন্থী, মডারেট সব শ্রেণীর লোক’ই অন্তর্ভূক্ত। এদিকে মুক্তমনা বলতে যাদের মধ্যে ধর্ম নিয়ে সংশয়, সন্দেহ, বিজ্ঞানমনস্ক, অবিশ্বাস কাজ করে তাঁরাই।

ধর্ম বলতে বোঝায় কোনো প্রাণী বা বস্তুর বৈশিষ্ট্য। ধর্ম মৃলত অন্তরের বিশ্বাস। যা নির্ভর করে প্রতিটি মানুষের পারিবারিক, সামাজিক এবং সর্বোপরি নিজের চিন্তা চেতনার উপর। যুগে যুগে ধর্ম এসেছে মানুষকে খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখার জন্য। যখন মানুষ প্রথম আগুন আবিস্কার করল, এর আশ্চর্য ক্ষমতা দেখে মানুষ আগুনকেই পূজা করা শুরু করল। তারপর সূর্যের ক্ষমতা দেখে সূর্যকে ঈশ্বর ভাবা শুরু করল। এভাবে কালে কালে প্রকৃতির বিভিন্ন উপকরণকে মানুষ স্রষ্টা বানিয়ে তাদের আরাধনা করত। এভাবেই ছিল তাঁদের ধর্মীয় বিশ্বাস। কালের বিবর্তনে একজন একজন করে স্রষ্টার বার্তাবাহক দাবি করে আসছে। ঈসা (আঃ), মুসা (আঃ) থেকে শুরু করে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) পর্যন্ত। সবার দাবী স্রষ্টা তাদের পাঠিয়েছেন মানুষদের ঠিক রাস্তায় পরিচালনা করার জন্য। তাদের অনুসারী, অনুগামী বাড়তে লাগল। এক অদৃশ্য ফেরেস্তা এসে তাদের কাছে স্রষ্টার বার্তা পৌঁছে দিত। এই যে অদেখা কোন বিষয়কে মনে প্রাণে বিশ্বাস করাটাই ধর্মের বিশ্বাস, ধর্মের সৌন্দর্য্য।

স্রষ্টা সর্বদাই মানুষের তথা সমগ্র সৃষ্টির কল্যাণ চান। মানুষসহ সমগ্র সৃষ্টির কল্যাণার্থে কাজ করাই মূলত ধর্মের কাজ বা পুণ্যের কাজ। প্রতিটি ধর্মের উদ্দেশ্যই হলো মানুষের কল্যাণ, সৃষ্টির কল্যাণ। যা কিছু অকল্যাণকর তা অবশ্যই অধর্ম তথা পাপকর্ম। এই সাধারণ বোধটুকু যখন মানুষের মধ্য থেকে লুপ্ত হয়ে যায় তখনই ধর্মের অপব্যাখ্যা দ্বারা মানুষ ভুল পথে পরিচালিত হয়। তারা বুঝতেই পারছে না যে, কোনটা প্রকৃত পক্ষে ধর্মের কাজ আর কোনটা করতে স্রষ্টা নিষেধ করেছেন। ধর্মমনাদের ধর্মের অপব্যাখ্যা, নিজ ধর্মের মাঝে মতানৈক্য, গোঁড়ামি, উগ্রতা থেকেই মুক্তমনারা জন্ম নেয়। যেমন একটা লোক যখন নিজ ধর্মের কোন বিধিনিষেধের ব্যাপারে একটু সমালোচানা করে, যুক্তিতে যায়, ধর্মমনাদের মধ্যে গোঁড়া টাইপের ধর্মান্ধরা না জেনেই তাকে নিয়ে গালি, হাসি ঠাট্টা শুরু করে দেয়। অথচ ধর্মের শিক্ষা হল তার যুক্তির খন্ডন করা। তাঁকে ধর্মের বাণী দিয়ে বুঝানো। আপনি যে ধর্মেরই মানুষ হন না কেন, জীবনে চলার পথে ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে ধর্ম থেকে পাওয়া শিক্ষা এবং সঠিক ব্যবহার খুব দরকার।

মুক্তমনা শব্দটিও ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। মুক্তচিন্তক, যুক্তি, মানবতা, বিজ্ঞানমনস্ক, সংশয়ী, অবিশ্বাসী সবাই মুক্তমনা পরিবারের সদস্য। তাঁদেরও একটি আন্তর্জাতিক চক্র রয়েছে। তাঁদের একটি সংগঠনও রয়েছে। সবসময় ধর্মের খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে যুক্তি দাঁড় করিয়ে দেয়া তাদের কাজ। মুক্তমনারা বর্তমান সমাজে বিশ্বাসনির্ভর প্রচারণার বিপরীতে একটি বিজ্ঞানমনস্ক এবং যুক্তিবাদী ধারা প্রবর্তনে বদ্ধপরিকর। ১৬০০ সালকে আধুনিক মুক্তচিন্তা যুগের শুরু হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কারণ এই বছরেই প্রাক্তন ডমিনিকান ধর্মযাজক জর্দানো ব্রুনোকে স্প্যানিশ অনুসন্ধানে ইতালিতে আগুনে পুড়িয়ে মারে।

নাস্তিক, অজ্ঞেয়বাদ, সংশয়বাদ এবং মানবতাবাদ এই চারশ্রেণীর মানুষকে মুক্তমনা হিসেবে ভাবা হয়। এদের একেক শ্রেণী আবার বৃহৎ পরিসরে ব্যবহৃত হয়। বিশ্বের বড় বড় সমাজবিজ্ঞানী, দার্শনিকগন তাদের আলাদা আলাদা পরিচয় দিয়ে গেছেন। এই চারশ্রেণীর মানুষের মাঝে যে কোন একটা বিষয় উপস্থিত থাকলেই সে মুক্তমনা। তার মানে একজন নাস্তিক সে মুক্তমনাদের অন্তর্ভূক্ত, কিন্তু একজন মুক্তমনা সে কিন্তু নাস্তিক নাও হতে পারে। সে হতে পারে অজ্ঞেয়বাদী বা সংশয়বাদী।

মুক্তমনাদের আস্থা যুক্তিতে, মুক্তবুদ্ধিতে, অন্ধবিশ্বাসে নয়। বংশপরম্পরায় পাওয়া কোন রীতিনীতিকে, মতকে বা বিশ্বাসকে অবলীলায় বিশ্বাস করতে হবে এমন যুক্তি মুক্তমনারা মানেন না। তাঁরা মুক্তমনে প্রতিটি ধারনাকে যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্তে পৌছান। আধুনিক বিজ্ঞানকে তারা বেশি গুরুত্ব দেয়। বলতে পারেন বিজ্ঞান’ই তাঁদের ধর্ম। বিশ্বে এই মুক্তমনাদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। ইউরোপ এবং আমেরিকাতে এর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। ইউরোপের অনেকে দেশে এখন নাস্তিকরাই সংখ্যাগুরু। চীনে ৬১ শতাংশ সরাসরি স্রষ্টার অস্তিত্ব অস্বীকার করে। এভাবে বেড়ে থাকলে ধারণা করা হচ্ছে একসময় মুক্তমনারা বিশ্বের একটা বড় শক্তিতে পরিণত হবে।

তাঁদের দাবী- মুক্ত-মনারা ধর্ম-বিরোধী নয়, ধর্মের কঠোর সমালোচক। কারণ তাঁরা মনে করেন ধর্ম জিনিসটা পুরোটাই মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত। মুক্তমনারা সর্বদা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি আস্থাশীল, আজন্ম লালিত কুসংস্কারে নয়। তাঁরা মনে করে কুসংস্কারের কাছে আত্মসমর্পণ আসলে নিজের সাথে প্রতারণা ছাড়া কিছু নয়। তবে মুক্তমনাদের ধর্ম-বিরোধী হওয়ার একটা বড় কারণ হল, ধর্মগুলোর মধ্যে বিরাজমান বৈষম্য, গোঁড়ামি, উগ্রতা, ভূল ব্যাখ্যা। ধর্মের মধ্যে কিছু কিছু বিষয় কঠোর হওয়াতে তাঁরা এটা মেনে না নিয়ে সমালোচনায় লিপ্ত থাকে। অথচ তার ব্যাখ্যাও ধর্মগ্রন্থে দেওয়া আছে এটা মানতে নারাজ।

ধার্মিকেরাও মুক্তমনা হতে পারে মুক্তমনারা দাবি করলেও আমি একমত নই। আমরা যারা ধর্মমনা, ধর্ম বিশ্বাস করি আমাদের বিশ্বাস, বিজ্ঞানীরা যত কিছুই আবিষ্কার করছে তা ধর্মগ্রন্থ থেকে পাওয়া। ধর্মগ্রন্থে তা অনেক আগেই স্রষ্টা ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন। যা মুক্তমনারা মানতে নারাজ। অথচ পবিত্র কোরআন শরিফে মানব সৃষ্টি থেকে শুরু করে এখন অবদি পর্যন্ত কি ঘটবে তা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে উল্লেখ করা হয়েছে। মুক্তমনাদের প্রতিটি প্রশ্নের জবাব দেওয়া আছে। প্রতিটি ধর্মেই মানবতার বাণী প্রচার করে। এই কথা তাঁরা বিশ্বাস’ই করে না।

আজকাল মুক্তমনা দাবিদার অনেকেই শুধু নির্দিষ্ট ধর্মের বিরোধীতা করেই যাচ্ছে। অথচ এটা মুক্তমনাদের কাজ নয়। মুক্তমনার নামে ধর্ম বিদ্বেষী মনোভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধর্মমনাদের মধ্যে যারা গোঁড়া, মুর্খ তারা যেমন ধর্মের জন্য ক্ষতিকর, তেমনি মুক্তমনাদের মধ্যে যারা ধর্ম বিদ্বেষী, ধর্ম বিরোধী তারাও মারাত্মক বিষাক্ত। তাঁরা সবসময় ধর্ম নিয়ে উস্কানিমূলক কথা বলে। মুক্তমনাদের প্রতিটি যুক্তিকে আমরা ধর্মের বাণী দিয়ে যুক্তি খন্ডন করলে একসময় সেও ধর্মকে বিশ্বাস করতে পারে। ধর্মের সমালোচনা করলেই তাঁকে রাস্তাঘাটে প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্য হত্যা কোন ধর্ম’ই নির্দেশ দেয়নি। এটা উগ্রদের কাজ, সন্ত্রাসবাদীদের কাজ। যা মুক্তমনারা মানতেই রাজী না।

ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, নাস্তিকদের তুলনায় ধর্মমনা ব্যক্তিরা ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সহনশীল। ধর্মমনাদের দৃষ্টিভঙ্গি নাস্তিকদের চেয়ে অনেক উন্নত।

পরিশেষে বলি, আমরা ধর্মমনারা ধর্মভীরু, ধার্মিক হই। গোঁড়া, উগ্র, কট্টর নয়। নিজ ধর্মের মধ্যে কোন লোক যদি কোন বিষয়ে সমালোচনা বা যুক্তি উপস্থাপন করে আমরা তাঁকে ধর্মে পাওয়া যুক্তি দিয়ে বুঝাই, গালি দিয়ে নই। কাউকে না বুঝে না জেনে নাস্তিক, কাফের বলা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করি। ধর্ম আমাদের সহনশীল হতে শেখায়। আমাদের চরিত্র গঠনের পথ বাতলে দেয়। আমরা সুন্দরভাবে সমাজে চলাচলের রাস্তা দেখিয়ে দেয়। শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) সে সময়ে কঠিন পরিস্থিতিতে মক্কা-মদিনাবাসীর মন জয় করেছিলেন ভালবাসা দিয়ে। আমরা ধর্মের বাণীকে কাজে লাগিয়ে ভালবাসা দিয়ে অবিশ্বাসী ও অন্য ধর্মের মানুষের মন জয় করি। আমাদের এসব গুন দেখে মুক্তমনারাও একসময় ধর্মের ছায়াতলে আশ্রয় নিবেই।

আব্দুল ওয়াদুদ ময়নুলঃ প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।

সম্পাদক: শাহ সুহেল আহমদ
প্যারিস ফ্রান্স থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: