মঙ্গলবার, ৯ অগাস্ট ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ২৫ শ্রাবণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

দিন যায় কাজের সন্ধানে রাত কাটে পার্কে




কামরুল হাসান জনি:

রাত তখন ৩টা। দুবাইয়ের একটি পাবলিক পার্কে কোথাও একজন, কোথাও দু’জন নিজের মালপত্র মাথার কাছে রেখে ঘুমিয়ে আছেন। রাত যত বাড়ে, এখানে ঘুমকাতুরে মানুষের সংখ্যা বাড়ে। সারাদিন কাজের জন্য ঘুরে ক্লান্ত কপর্দকহীন প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা এই পার্কটি। এখানে রাত কাটানো কেউ ভিজিট ভিসা নিয়ে, আবার কেউ বা ফ্রি ভিসা কিনে দেশ থেকে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় এসেছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাত। দালালদের ফাঁদে পা দিয়ে এখন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি তাঁরা।

মৌলভীবাজারের তানভীর (ছদ্মনাম) ভ্রমণ ভিসা নিয়ে দুবাই এসেছেন ছয় মাস হলো। এখনও কাজের কোনো বন্দোবস্ত হয়নি তাঁর। দেশ থেকে টাকা এনে দু’বার ভিসাও নবায়ন করেছেন। কিন্তু কাজ না থাকায় বাসা ভাড়া নিতে পারছেন না, নেই প্রতিদিনের তিনবেলা খাবারের টাকাও। নিরুপায় তানভীর সারাদিন কাজের সন্ধানে দিজ্ঞ্বিদিক ঘুরে রাতে দুবাইয়ের এই পাবলিক পার্কের সবুজ ঘাসে ক্লান্ত শরীরকে এলিয়ে দেন। খোলা আকাশের নিচে শুয়ে ভাবেন- কবে জুটবে একটি কাজ, কবে হবে অপেক্ষার অবসান।

তানভীর অভিযোগ করেন, নিজ দেশের মানুষের মাধ্যমে বেশিই প্রতারিত হচ্ছেন। প্রতারিত হয়েই দেশ থেকে এসেছেন। এখানে এসে দ্বিতীয় দফায় প্রতারিত হচ্ছেন। অনেকে কাজ দেওয়ার কথা বলে প্রথমে দুই হাজার দিরহাম দাবি করে। তাদের একজনের হাতে টাকা তুলে দিলে আর কোনো যোগাযোগ করে না। মোবাইলও বন্ধ পাওয়া যায়।

সিলেটের বড়লেখার সবুজেরও (প্রকৃত নাম নয়) একই অবস্থা। ভ্রমণ ভিসায় এসেছেন পাঁচ মাস হয়ে গেছে। কিন্তু এখনও ভালো কাজ জোটেনি। যেসব কাজ পেয়েছেন, সেগুলো অধিক পরিশ্রম ও ঝুঁকির; নয়তো বেতন অনেক কম। এখন নিয়মিত দেশ থেকে টাকা এনে খাবারের খরচ মেটালেও রাতটা কাটাতে হয় খোলা আকাশের নিচে পার্কের কোনো এক কোনায়।

ঢাকার রফিকের (ছদ্মনাম) গল্পটা আরও করুণ। দালালের মিষ্টি কথায় পড়ে সাড়ে ৩ লাখ টাকা হাতে তুলে দিয়ে দুবাই আসেন তিনি। সোনার হরিণ ছোঁয়ার স্বপ্ন নিয়ে প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণও তুলেছেন তিনি। দালাল বলেছিল, দুবাই পৌঁছলে বিমানবন্দর থেকে গাড়িতে করে বাসায় নিয়ে যাবে। ভালো কাজ, বিনামূল্যে খাওয়া ও থাকার ব্যবস্থা করা হবে। এই প্রলোভনে পড়ে তাঁর সঙ্গী হন আরও ১০ তরুণ। কিন্তু দুবাই পৌঁছেই বুঝতে পারেন বড় ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন তাঁরা। এরপর একটি আবদ্ধ ঘরে কর্মহীন কাটতে থাকে তাঁদের মাসের পর মাস। এসব বিষয়ে দুবাই বাংলাদেশ কনস্যুলেটে অভিযোগও দায়ের করেন তাঁরা।

জানা গেছে, গত দুই-তিন বছরে অন্তত ২ লাখ বাংলাদেশি ভ্রমণ ভিসা নিয়ে এ দেশে এসেছেন কাজের সন্ধানে। ভিসার মেয়াদ থাকতে কাজের বন্দোবস্ত হয়ে গেলে সুযোগ আছে ভিসার ধরন পরিবর্তন করার। আর এই সুযোগ কাজে লাগাতে গিয়ে প্রতিদিন দালালদের ফাঁদে পা দিচ্ছেন হাজার হাজার বাংলাদেশি। আবার ফ্রি ভিসার নামেও একই কায়দায় কর্মসংস্থান ভিসা বিক্রি করছে দালাল চক্র। এসব ভিসা নিয়ে দেশ থেকে আসার আগে একবার প্রতারণার শিকার হওয়া প্রবাসীরা কাজ খুঁজতে গিয়ে দ্বিতীয়বার ঠকছেন।

দুবাই ও উত্তর আমিরাত কনস্যুলেটের কনসাল জেনারেল বিএম জামাল হোসেন সমকালকে বলেন, যথাযথ ভিসা নিয়ে এলে প্রতারিত হওয়ার সুযোগ কম। কিন্তু কোনো অসাধু চক্র মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে এবং মিথ্যা কাগজপত্র তৈরি করে এখানে অনেককে নিয়ে আসে। তারপরও এ ধরনের অভিযোগ পেলে তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, বিদেশগামীদের আরও বেশি সচেতন হতে হবে। দালালদের মিথ্যা প্রলোভনে পা না দিয়ে মন্ত্রণালয় ও বিএমইটির মাধ্যমে ভিসা যাচাই করে তবেই বিদেশ যাত্রা করা উত্তম।

সম্পাদক: শাহ সুহেল আহমদ
প্যারিস ফ্রান্স থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: