রবিবার, ৩ জুলাই ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১৯ আষাঢ় ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

প্রবাসী বাংলাদেশীদের ঠকানোর সংস্কৃতি




১৯৯১-র সেপ্টেম্বরে বিলেতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডর্মিটরিতে উঠলাম। ভাড়া সপ্তাহে সাড়ে ৩৭ পাউন্ড। মাসে গড়পড়তা এক শত সাড়ে বাষট্টি পাউন্ড। রুম হিটিং চার্জ আলাদা। ক্লিনিং ফি জাতীয় আরও একটি কি দুটো চার্জও মাঝে মধ্যে আরোপ করা হয়। ক্লাসে আসা যাওয়ার পথে দ্বিতীয়বার দেখা হল মৌলভিবাজারের আবদুল মতিনের সাথে। তার বাড়ি ডিঙিয়েই যেতে হয়। তিনিই বললেন, যদি দু’দশ পাউন্ড বাঁচাতে চান ডর্মিটরি ছেড়ে দিন, ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।

ব্যবস্থা করে দিলেন তার রেস্তোরাঁর কিচেন বরাবর ঠিক উপরের রুমটিতে; ভাড়া মাসে আশি টাকা। তিনি টাকাই বলতেন, পাউন্ড নয়। আমার বেঁচে গেলে মাসে সাড়ে ৮২ পাউন্ড, হিটিং-এর জন্য বাড়তি চার্জ দিতে হল না, আর রুমটি সরাসরি কিচেনের উপর হওয়ায় এমনিতেই উষ্ণ, এবং ডর্মিটরির নির্বান্ধব রুমের চেয়ে অনেক বেশি আরামদায়ক। বাড়তি আরও পাওয়ার আছে, আবদুল মতিন সুযোগ পেলে উপরে উঠে আসেন, দেশের কথা শুনতে এবং বলতে আসেন। আর আসার সময় নিয়ে আসেন তারই রেস্তোরাঁর কোন না কোন খাবার–নিদেন পক্ষে পুরু ফ্লেঞ্চফ্রাই, বিলেতিরা বলে চিপস।

ধনতান্ত্রিক দেশে জীবন ও জীবিকার জন্য এলেও তিনি নিজ দেশের জন্য সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখতেন। সংবিধানের একটি বড় স্তম্ভ সমাজতন্ত্র, দীর্ঘদিন লন্ডনে বসবাসরত চাচার পুত্র সেজে আবদুল মতিন হিথ্রো এয়ারপোর্টে পৌঁছলেন, অতঃপর চাচার সাথে হ্যাকনি। লন্ডনি কন্যার বাজার তখনও ভালো, এখনও যেমন। কিন্তু চাচাত বোনটির প্রতি তার আগ্রহের ঘাটতি থাকায় এবং এতে চাচি অসন্তুষ্ট হওয়ায় (তখনও তার স্বপ্ন বাংলাদেশে ফেলে আসা তার খালাত বোনটিকে নিয়ে)। এক শীতের রাতে অভিমান করে সেই আশ্রয় ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন আবদুল মতিন। বিপুলা এই বিশ্বে শেষ পর্যন্ত মানুষের ঠাঁই হয়ে যায়। তিনি কিচেন পোর্টার হিসেবে সপ্তাহে ৩৫ পাউন্ড বেতনের চাকরিতে ঢুকে গেলেন। থাকা ও খাওয়া দুই-ই ফ্রি, রেস্তোরাঁতে। অন্য কোন খরচও তার নেই। প্রথম তিন সপ্তাহের কামাই ১০৫ পাউন্ড যখন তার পকেটে, খবর পেলেন বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম নেতাদের একজন লন্ডনে, তার কর্মস্থলের দু’একটি রাস্তার পরেই তার অবস্থান।

আবদুল মতিন মুগ্ধ হয়ে নেতাকে কাছ থেকে দেখলেন, তার সাথে মোছাফা করলেন এবং বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তার হাতে পাঁচ পাউন্ড তুলে দেবেন না কুড়ি পাউন্ড দেবেন এই নিয়ে নিজের সাথে বোঝাপড়া করতে করতে এক সময়, কেবল পাঁচটি পাউন্ড পকেটে রেখে একশত পাউন্ড তুলে দিলেন নেতার হাতে।

এটা নেতার হক। তাকেই যদি ডলার পাউন্ড না দেন তো কাকে দেবেন। তিনি আবদুল মতিনের একশত পাউন্ড না গুনেই পকেটে ভরে ফেললেন। নেতা কিছুক্ষণ পর ধর্মীয় আন্দোলনে যোগ দেন। আবদুল মতিনের সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন তিনি কোথায় সমাহিত করেছেন তিনিই জানেন।

আবদুল মতিনের কষ্টকর বিদেশ বাসের সময় হাড়ভাঙা খাটুনির প্রথম তিন সপ্তাহের উপার্জিত ১০৫ পাউন্ডের ১০০ পাউন্ডই কীভাবে নেতার পকেটে ঢুকে গেলে এই এপিসোডটি আমি অন্য একটি লেখাতেও যোগ করেছিলাম।

আবদুল মতিন উদ্যোগী মানুষ, বসে থাকেন নি, উদ্যোগ তাকে বড় করেছে, স্বাচ্ছন্দ্য দিয়েছে।

আমি জিজ্ঞেস করি, আপনার শিক্ষা হয়েছে?

আবদুল মতিন হাসেন এবং বলেন, জি না ভাইসাব হয়নি।

এখন সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন গোটা পৃথিবীতেই মার খেয়ে গেছে। এখন আছে ক দল খ দল গ দল ঘ দল ইত্যাদি। সংগ্রামের মূল মন্ত্র হচ্ছে দলের আদর্শ বাস্তবায়ন। দলের নেতারা এখনও ম্ওকা পেলেই বিদেশে আসেন, স্বদেশীদের কাছ থেকে সম্বর্ধনা নেন। আবদুল মতিন তখনও, কিছু, কিছু তার ভাষায় ‘দান খয়রাত’ করেন। কারণ নেতারা তো ‘আশা’ নিয়ে আসেন। খালি হাতে ফেরত যাওয়াটা কি ভালো দেখাবে?

বাংলাদেশের ভিআইপিদের বিলেত সফরের সময় অভিবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যে যে সাড়া পড়ে যায় তা কাছে থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। কোথাকার ব্রিটিশ প্রধান মন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার, জন মেজর, টরি ব্লেয়ার, গর্ডন ব্রাউন এবং ডেভিড ক্যামেরন–তাদের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের কোন মন্ত্রীর এপিএস, অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রাইভেট সেক্রেটারি। বিলেতের বাড়িটি কেনাই হোক কি কল্যাণকর রাষ্ট্রের নীতিমালা অনুযায়ী কাউন্সিলের বিনে ভাড়ার বাড়িই হোক–এই বাড়ির জন্য তো অভিবাসী বাংলাদেশির কোন বাড়ির টান নেই, তার টান বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাড়িটির জন্য। দেশে কী হচ্ছে, কে মেম্বার হচ্ছেন, কে চেয়ারম্যান, কে এমপি, কে মন্ত্রী সেটা জানতে পারাই তাদের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বের বিষয়।

মন্ত্রীর এপিএস থেকে শুরু করে উপমন্ত্রীর এপিএস পর্যন্ত সকলেই যে কত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব বিলেত তা টের পাইয়ে দেয়।

নেতা-উপনেতা, তাদের সন্তান-সন্ততি, তাদের ভাগ্নে-ভাগ্নি দয়া করে একবার হিথ্রো এয়ারপোর্টে নামলেই হল, বাকি সব আয়োজন করার জন্য আমাদের দেশী ভাইরা তো আছেনই। থাকা, খাওয়া, কেনাকাটা, রাতভর এখানে সেখানে ঢু মারা সব সহায়তায় দেশী ভাই। বলাই বাহুল্য, ব্যতিক্রমধর্মী নেতাও আছেন। ভিআইপি সফরের সময় সফরসঙ্গীরা হয়ে ওঠেন মহা ভিআইপি। আমার দেখার সুযোগ হয়েছে প্রবাসী বাংলাদেশী ভক্তের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে কেউ কেউ পৌঁছে গেছেন অক্সফোর্ড স্ট্রিটে, হ্যারড্‌স্‌-এ, মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার সুপার স্টোরে ঢুকে নতুন স্যুটে নতুন জুতায় নতুন মানুষ সেজে বিলেতের রাস্তায় নেমে এসেছেন।

নেতার উপকারী, নেতার আত্মীয় স্বজনদের উপকারী এই অভিবাসী মানুষগুলো যখন বাংলাদেশে আসেন, খালি হাতে আসেন না, গিফট র‌্যাপারে জড়ানো লোক দেখানো উপহার না, বিলেতি বাজারের শ্রেষ্ঠ দ্রব্যটি যা কখনও নিজের জন্য, নিজের বউ বাচ্চার জন্য কেনেন নি তাই পলিথিন ব্যাগে লুকিয়ে নেতা ও তাদের স্বজনদের হাতে তুলে দেন।

অভিবাসী ভক্তের গুরুত্ব এ পর্যন্তই। কারণ নেতা বলেই ফেলেন, আজ দারুণ ব্যস্ত, অন্যদিন এসো, ফোন করে এসো।

দেশে এসে যিনি এই দু’দণ্ডের দেখা পেলেন তিনি তো ভাগ্যবান। দ্বিতীয় দেখা আর হয়ে ওঠে না। বিষণ্ন মনে নেতাভক্ত অভিবাসী একদিন বাংলাদেশের আকাশ সীমানা ছাড়িয়ে বিলেত ফিরে যান। দলের নাম ক হোক কি খ হোক কিংবা গ হোক কি ঘ, প্রবাসী স্বদেশীদের ঘাড় মটকাতে কেউ কারো চেয়ে কম যান না। বিলেতের বাংলাদেশীদের অনেককেই দেখেছি ঘাড় পেতেই রাখেন। তাদের লাভের মধ্যে নেতার সাথে তুলে রাখা ক্যামেরার কয়েকটি স্ন্যাপশট। ছবিটা বাঁধিয়ে রাখেন আর শীতার্ত লন্ডনে ওভারকোটের বড় পকেটে ঢুকিয়ে রাখেন একটি ছোট অ্যালবাম; নেতার সাথে তার ছবি, তিনি নেতাকে মালা দিচ্ছেন, তিনি নেতার প্লেটে আমদানি করা বড় কই মাছ তুলে দিচ্ছেন, নেতা তার ঘাড়ে হাত দিয়ে রেখেছেন–এ ধরনের এক বিরল ছবি। আজকাল ডিজিটাল ক্যামেরায় ফিল্ম কেনার ঝামেলা নেই, সবই ইন-বিল্ট, নেতাকে কাছে পেয়ে কেবল ক্লিক করা।

দিনের শেষে এটাই ভক্তের সান্তনা নেতার সাথে তো ছবি আছে, দশজনকে দেখানো যায়। দশজন গুরুত্বপূর্ণ মনে করে এই ভক্তকে, এটুকুই।

দু’ দফায় দু’টি পালাবদলের সময় বিলেতে অবস্থান করে অভিবাসী বাংলাদেশী মানুষের উচ্ছ্বাস দেখার এবং আকাঙ্ক্ষার কথা শোনার সুযোগ হয়েছে। এক পক্ষ বলছে এবার দেশ রসাতলে যাবে, অন্য পক্ষ বলছে, রসের অতল থেকে তুলে এনে এবার দেশ রসের উপর ভাসবেই। কেউ বলছেন, নেতা তো আমার বাড়িতে উঠেছেন, থেকেছেন, খেয়েছেন এবং নিয়েও গেছেন। আমি পাব না তো কে পাবে।

তার ন্যূনতম প্রত্যাশা ব্রিটেনে বাংলাদেশের হাইকমিশনার হওয়া লন্ডনে, মানচেস্টারে, বাকিংহামে, গ্লাসগোতে ব্রিটেনের সর্বত্র অবস্থানরত বাঙালীদের সেবা করবেন। কারও কারও যোগ্যতারও ঘাটতি নেই। কিন্তু আশা মিটে না। সরকারের বিবেচনা ও ভঙ্গের প্রত্যাশা বরাবর এক লাইনে যায় না সুতরাং হাইকমিশনের দায়িত্ব নিয়ে গেলেন পেশাদার কোন কূটনীতিবিদ কিংবা সরকারের বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ অন্য কেউ। ভক্ত অল্প সময়ের জন্য ম্রিয়মান থেকে আবার জেগে ওঠেন। নেতারা আসছেন, এখনই দৌঁড়াতে হবে হিথ্রো এয়ারপোর্ট।

আবদুল মতিন ঠকেই যান।

ঠকাটাই এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

সম্পাদক: শাহ সুহেল আহমদ
প্যারিস ফ্রান্স থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: