বৃহস্পতিবার, ১ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

Sex Cams

লেখালেখিতে পেশাদারিত্ব ও চৌর্যবৃত্তি




 

 

কোনও কাজ করে সেই কাজ থেকে অর্জিত আয় থেকে জীবিকা নির্বাহ করাকেই তো আমরা পেশা বলি। তাই নয় কি? আর আয় যদি নির্ধারিত করসীমায় পড়ে, তাহলে ওই আয়ের বিপরীতে কর পরিশোধ করব এই তো শর্ত। এই বিবেচনায় হাল অতীত ও বর্তমানে এমন লেখক কি আমাদের রয়েছেন?

লেখক  এবং লেখক নামধারী অলেখকও রয়েছেন যারা জনপ্রিয়তার জাদুবলে লেখালেখি থেকে অনেক অর্থকড়ি আয় করেন। পাশাপাশি তারা অন্যবিধ কাজের সঙ্গেও যুক্ত। যেমন কেউ অধ্যাপক, সম্পাদক, সাংবাদিক, ঠিকাদার, ব্যাংকার, চিকিৎসক, প্রকৌশলী বিবিধ। তবে পেশাদারিত্বের বিবেচনায় আমি মাত্র কয়েকটা নাম উল্লেখ করব। যারা লেখালেখিকে রক্তে ধারণ করেছেন আর নিঃশ্বাসে বহন করেছেন। তারা হলেন আহমদ ছফা, সৈয়দ শামসুল হক এবং নির্মলেন্দু গুণ। উনাদের সম্পর্কে বলা যায় কোন বাধাধরা আয় না থাকলেও ছকবাঁধা চাকরি না করেও লেখালেখির আয় দিয়েই লেখালেখিতে টিকে থাকার লড়াইটা করে গেলেন।

আমাদের দেশে যেখানে প্রকাশক লেখককে টাকা দেবার মত খাসলত খুব একটা রাখেন না, পত্রিকাগুলোও অনেকটা টাকা ছাড়াই লেখার পাহাড় জমাতে পারেন। বস্তা বস্তা লেখা ছাপাতে পারেন- সেখানে লেখককে টাকাটা দিবেন কেন?

ঢাকা শহরের লেখালেখির জগৎটা এমন পর্যায়ে গেছে এমন পদধারী কর্পোরেট লেখকও রয়েছেন- যারা লেখা ছাপানোর অজুহাতে পত্রিকাগোষ্ঠীকে বিজ্ঞাপনের জাদুতে খুশি করতে পারেন – সম্পাদকের জন্যে উপঢৌকন প্যাকেজের ব্যবস্থাও করতে পারেন। এরকম কথাবার্তা নানা অসমর্থিত সূত্রে চালু আছে। কথা কিন্তু সত্য।

পণ্যের প্রচারের জন্যে নিজের টাকা খরচ করে ব্যবসায়ীরা যেমন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন ছাপে। ক্ষেত্র বিশেষে লেখকদেরও কি সেরকম বাস্তবতার মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে? আমাদের ঈদসংখ্যাগুলোর ময়নাতদন্ত হলে এরকম কিছু সত্য বের হয়ে আসতেও পারে। বছর খানিক আগে একটি দৈনিকে প্রকাশিত একটি লেখায় সাহিত্যের পুরস্কার নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে অভিজাত ক্লাবে মজমা বসিয়ে পুরস্কার প্রভাবিত করতে পারে এরকম মানুষদের পানাহার করিয়ে পুরস্কার লাভ করার কথা ইংগিত করা হয়েছে। এরকম বাস্তবতায় হলফ করে বলে দেওয়া যায় লেখালেখিতে পেশাদারিত্ব সম্ভব জীবিকার জন্য অন্য কোনও আয়ের উৎস থাকলে। যেমন কারো বাবার জমিদারি থাকলে অথবা জীবনসঙ্গী বা সঙ্গীনির পর্যাপ্ত আয়ের উৎস এবং সেই আয় থেকে অনুপ্রেরণামূলক সহযোগিতার মনোভাব থাকলে।

তবে ধ্রুপদী বাস্তব হল লেখালেখির আয় থেকে জীবিকা নির্বাহ যে অসম্ভব সেই সত্য মেনে নিয়েই কিছু বোকাপ্রজ মানুষ সৎভাবেই লেখালেখিতে আত্মনিয়োগ করেন। আখেরে টিকেও যান। এরকম উদাহরণও কম নয়; এই সত্যটা কম আর বেশি প্রায় সব দেশে একই।

আধুনিক বাস্তবতায় লেখকের আয়ের উৎসগুলো কী?

১. বইয়ের মেধাস্বত্ব থেকে প্রাপ্য টাকা

২. সরকারি আধাসরকারি এবং স্বাধীন সংস্থা বা ফাউন্ডেশন থেকে বৃত্তি বা বরাদ্দ

৩. সম্পাদনা থেকে আয়

৪. অনুবাদ

৫. বিভিন্ন সভা সেমিনার বা কর্মশালা উৎসবে অংশগ্রহণ থেকে আয়

৬. পত্রপত্রিকার লেখালেখি থেকে আয়

৭. পুরস্কার প্রাপ্তি থেকে অর্থ লাভ

৮. স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা

এই কয়টি উৎসের মধ্যে দ্বিতীয় উৎসটি ছাড়া বাকিগুলো কিছুটা উপরের আলোচনায় আমরা ধারণা পেয়েছি।

আমাদের বাস্তবতা কী? এবার আমি দ্বিতীয় এবং অষ্টম উৎসটা নিয়ে দুই একটা কথা বলব। ইউরোপের বাস্তবতায় প্রায় সবদেশেই লেখালেখির প্রতিষ্ঠানিক দায় ও দায়িত্ব স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। সরকারি বাজেটে নির্দিষ্ট তহবিলে অর্থ বরাদ্দ ও স্বাধীন তহবিল চালার বন্দোবস্ত থাকে নানা কাঠামোয়। আর প্রতিষ্ঠানগুলোও লেখকের মেধা ও শ্রমে সম্মান, স্বীকৃতি ও পারিশ্রমিক দিতেও বদ্ধপরিকর। বিশেষ করে উত্তর ইউরোপের দেশগুলোতে যেমন নরওয়ে, সউডেন, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক ও আইসল্যান্ড প্রভৃতি দেশে পেশাদার লেখকদের জন্যে স্বাধীন তহবিল রয়েছে –  যেমনটা রয়েছে আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। ওইসব স্বাধীন তহবিল থেকে লেখকরা স্বচ্ছতা আর যোগ্যতার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট পরিমাণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শতকরা পঞ্চাশ ভাগ বেতন, বৃত্তি ও অন্যান্য দেশে সভা সেমিনার ও উৎসবে অংশ নেবার জন্যে ভ্রমণ ভাতা পেয়ে থাকেন।

অধিকন্তু এসব দেশের লেখকরা বছর ধরে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, গ্রন্থাগার, থিয়েটার এমন কি গির্জায় লেখালেখি ও বই বিষয়ক নানা কর্মযজ্ঞে আমন্ত্রিত হয়ে থাকেন এবং সম্মানী পেয়ে যান। এবার আমাদের বাস্তবতার দিকে তাকালে কী দেখব? আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গ্রন্থাগারগুলোতে কি সেই ঐতিহ্য আমরা গড়ে তুলতে পেরেছি? না কি সেই বাজেট বরাদ্দ রয়েছে?

এবার লেখালেখিতে চৌর্যবৃত্তি বা নকল প্রবণতা নিয়ে কিছু কথা বলব। যা নানাভাবে লেখালেখিতে পেশাদারিত্বের জন্যে একটা ক্ষত। তার আগে দুটি গল্প বলতে চাই।

ছোট ভাই কবিতা লেখে বড় বোনকে দেখায়। প্রতিবারই বড়বোন তার কবিতা বাতিল করে দেয়- তোর কবিতা কিচ্ছু হয়নি। একবার ছোটভাইটি রবীন্দ্রনাথের কবিতা নকল করে নিজের বোনকে দেখালো, সেটাও বাতিল হয়ে গেল – কিচ্ছু হয়নি বলে।

অনেকেই জেনে থাকবেন সুইডিশ নাট্যকার অগাস্ট স্ট্রিন্ডবার্গ এবং হেনরিক ইবসেনের মাঝে তিক্তমধুর সম্পর্ক ছিল। তাদের দুজনের কখনো দেখা হয়নি। পত্রযোগাযোগ ছিল। ইবসেনের ব্রান্ড নাটক পড়ে স্ট্রিন্ডবার্গ পত্র লিখলেন, “এত সুন্দর নাটক। আপনি আমার গুরু। ইস্ আমিও যদি এরকম লিখতে পারতাম।”

সেই একই স্ট্রিন্ডবার্গ ইবসেনের ‘হেডা গেবলার’ নাটক পড়ে ইবসেনকে লিখছেন, “আপনি আমার ধারণা চুরি করেছেন।”

স্ট্রিন্ডবার্গ তার মিস জুলি নাটককে ইংগিত করে এই কথা বলেছিলেন। সত্য হলো- স্ট্রিন্ডবার্গের অভিযোগের কোন ভিত্তি ছিল না।

ইবসেনের পড়ার টেবিলের উপরে দেয়ালে স্ট্রিন্ডবার্গের ছবি ঝোলানো ছিল। এই ছবি নিয়ে জার্মান এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ইবসেনের বক্তব্য এরকম- লড়াইয়ে শত্রুর মুখটি মনে রাখতে হয়।

লেখালেখিতে অনুকরণ বা চৌর্যবৃত্তি নিয়ে থমাস স্টারন্স এলিয়ট বা টি এস এলিয়ট বলেছেন, নতুন কবিরা করেন অনুকরণ আর বুড়ো কবিরা করেন চুরি।

এবার নতুনদের কথা নয়। বুড়োদের কথাই একটু বলি। সত্যজিৎ রায়ের ‘দ্য এলিয়েন’ অনির্মিত সিনেমার পাণ্ডুলিপি নকল করে স্টিভেন স্পিলবার্গ টি ডট এন ডট (T.N.) ছবি বানিয়ে দুনিয়া জুড়ে আলোড়ন তুলেছেন।

এরকম অভিযোগ রয়েছে হুমায়ুন আজাদের ‘ভাষা শিক্ষা ও ভাষাবিজ্ঞান পরিচিতি’, ‘নারী’ এবং ‘আমার অবিশ্বাস বই’ তিনটি নিয়েও। এসব নিয়ে সৈয়দ শামসুল হক এবং আহমদ ছফা মুখ খুলেছিলেন।

এরকম চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ দিল্লিতে নির্বাসিত আমাদের এক বোনের বিরুদ্ধেও। যিনি চুরি করা লেখা নিয়ে আনন্দ পুরস্কার পর্যন্ত পেয়েছিলেন। এর পরের আনন্দ আদান-প্রদানের গল্পও ঢের আমরা জানি। আমাদের সমসাময়িক জীবিত বেশকয়েকজন লেখকের কথা জানি, যারা হুবুহু চৌর্যবৃত্তির সাথে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। নানা সময়ে তাদেরকে প্রশ্ন করা হলেও সেটি তারা এড়িয়ে গেছেন। সেই আলোচনা অনেক বিস্তৃত। পরে একসময় আলোচনা করা যাবে হয়তো।

লেখালেখিতে যারা আসেন তারাও মানুষ। মসজিদে গেলে যেমন জুতা চুরি যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যেমন গবেষণাকর্ম চুরি করে নিজের নামে ছাপিয়ে ডিগ্রি নেন। অমুক্তিযোদ্ধা আমলা যেমন মুক্তিযোদ্ধার নকল সনদ নিয়ে সুযোগ সুবিধা নেন, ব্যবসায়ী যেমন পণ্যে ভেজাল মেশান। তবে ওসবের নজরদারির জন্যে প্রতিকারের জন্যে, ওসব থেকে পরিত্রাণের জন্য ব্যবস্থাও থাকে। কিন্তু লেখালেখিতে এই প্রবণতা ঠেকানোর জন্যে আমাদের দেশে কি কোন নিয়ম নীতি আছে?

লেখালেখিতে চৌর্যবৃত্তি বা নকল প্রবণতা নতুন কোন বিষয় নয়। এরকম চৌর্যবৃত্তির খতিয়ান তুলে ধরে মুনীর চৌধুরী ‘আসুন চুরি করি’ শিরোনামে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলেন। লেখা চুরির ওই খতিয়ানে অন্যদের মধ্যে যাদের কথা বলেছিলেন তারা হলেন বুদ্ধদেব বসু, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, শিবরাম চক্রবর্তী, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ এবং কাজি আফসার উদ্দিন।

লেখাটা শেষ করার আগে আরো একটি প্রশ্ন: হাল আমলে অনলাইন যুগে ফেইসবুক ও বিভিন্ন ব্লগে প্রায়ই দেখি একজনের লেখা আরেকজনের নামে হরহামেশাই ছাপা হচ্ছে। এর শেষ কোথায়?

সম্পাদক: শাহ সুহেল আহমদ
প্যারিস ফ্রান্স থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: