বুধবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

বাবার তুলনা বাবা নিজেই




মোঃ শামছুল আলম

বাবার মত বিশাল বটবৃক্ষ নিয়ে কিভাবে লিখা শুরু করব, আর কোথায় নিয়ে শেষ করব, এসব ভাবতে ভাবতে চলে যায় দিন, সপ্তাহ, মাস। লিখাতো আর হয় না, কিন্তু দুই -এক কলম না লিখলেও যে মানসিক অস্তিরতা শেষ হবে না, তাই যোগ্যতা এবং জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্তেও বিসমিল্লাহ বলে শুরু করে দিলাম বাদ বাকি আল্লাহ ভরসা।
পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ মেলে প্রশস্ত বৃক্ষের মতো ছায়াদানকারী বাবার বুকে। শত আবদার আর নির্মল শান্তির এ গন্তব্যটি কারোরই অজানা নয়।
শত রাগ, গাম্ভীর্য আর অনুশাসনের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা কোমল স্নেহময় রূপই হচ্ছেন বাবা। তিনিই তো সন্তানদের শেখান কীভাবে পাড়ি দিতে হয় জীবনের অলিগলি আর আঁকাবাঁকা বন্ধুর পথ।

শিক্ষক শব্দের অর্থ হচ্ছে “সম্মানের গুরু” যাকে আমরা শিক্ষা গুরু হিসেবে অভিহিত করি, আমাদের বাবাও (মোঃ ইব্রাহিম আলী মাষ্টার)  ছিলেন একজন আদর্শবান স্কুল শিক্ষক বা একজন “সম্মানের গুরু”।
বাবার চিন্তাধারার সব কিছুই ছিল ছাত্রদেরকে ঘিরে। আমিও বাবার ছাত্র ছিলাম, তাই শিক্ষা গুরু হিসেবে বাবাকে খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। ছাত্ররা পাঠ না বুঝলে বাবা পরম যত্ন সহকারে বুঝিয়ে দিতেন। বাবা ছিলেন ছাত্রদের কাছে অতিব বন্ধুপরায়ণ একজন সহজ-সরল মানুষ। পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকে বাবা খুব ভালবাসতেন এবং গর্ববোধ করতেন।
বাবার মাঝে ছিল একজন নিবেদিত শিক্ষক, একজন অনুপ্রাণিত ছাত্র এবং একজন উদ্যোমি অভিভাবকের মিলিত প্রতিস্রুুতি।
এ পি জে আবুল কালামের একটি উক্তি মনে পড়ে গেল”-If a country is to be corruption free and become a nation of beautiful minds, I strongly feel there are three key societal members who can make a difference. They are the father, the mother and the teacher”.

বাবার কর্মস্থল ছিল আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় আট/দশ কিলোমিটার দূরে ” মক্রম আলী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়”
নয়াবাজার, বিশ্বানাথ। তখন বাবার যোগাযোগের মাধ্যম বলতে ছিল একমাত্র বাইসাইকেলটি। মেঘবৃষ্টিতে রাস্তা-ঘাটের অবস্থা থাকতো খুবই কাহিল, এখনকার মত তখন রাস্তা-ঘাট পাকা ছিল না। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে বাবা প্রতিদিন বাইসাইকেল চালিয়ে যাতায়াত করতেন। বাবা আমাদের কাছে গল্প করতেন যে স্কুল এলাকার লোকজন, স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী ও বাবার সহপাঠিগন বাবাকে খুব ভালবাসতেন, তাই বাবাও আর বদলির চেষ্টা করেননি। তবে শেষ জীবনে অবসরের কয়েক বছর আগে বাবা আমাদের এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ” ধর্মদা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, বিশ্বানাথে” বদলী হয়ে চলে আসেন।
উল্লেখ্য যে বাবার ব্যবহারিক বাইসাইকেলটি ছিল উনার ছাত্র জীবনে কেনা! যেটি দিয়ে বাবা ছাত্র জীবন, কর্ম জীবন ও সংসার জীবন শেষ করে পরপারেও চলে গেছন, কিন্তু এখনও বাবার প্রিয় বাইসাইকেলেটি বাবার স্মৃতি বহন করে আমাদের মাঝে আছে। আমরা অবাক হয়ে যাই কতটুকু সহজ ও যত্ন নিয়ে ব্যবহার করলে একটা সাইকেল ৫০/৫৫ বৎসর ঠিকে থাকতে পারে!

আমরা ভাই-বোন ছয়জন ও বাবা-মা আর দাদীকে নিয়ে ছিল বাবার পরিবার। সারা দিন দায়িত্ব পালন করে এসেও বাবা হাঁসিমুখে সবার খোঁজ-খবর নিতেন। বিশেষ করে বাবার মা অর্থাৎ আমাদের দাদির খবর প্রথমেই নিতেন। বাবার অন্য আর কোন ইনকাম ছিলনা, একমাত্র শিক্ষকতার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ দিয়েই এত বড় সংসার চালাতেন। ছোটবেলায় আমাদের বাড়ি বাঁশ-পালা দিয়ে তৈরি ছিল। প্রতি শুক্রবার বা বন্ধের দিন বাবা ঘরের কাজে নিয়োজিত থাকতেন। যেমনঃ ঘরের খুঁটি বদলানো, বাঁশ-বেত কেটে বেড়া দেওয়া, দরজা জানালা ঠিক করা ইত্যাদি। বাঁশ-কাঠ ও ছনের ছাউনি থাকায়  ঝড়-তোফানে ঘড় খুব সহজে নড়বড়ে হয়ে যেত, তাই প্রায় সারা বছরই বাবার কাজ লেগে থাকত। কোন একটা বন্ধের দিনেও বাবাকে একটু বিশ্রাম নিতে আমরা দেখিনি। আমরা ধীরে ধীরে বড় হওয়ার সাথে সাথে বাবা আমাদেরকে আলাদা রোমের ব্যবস্থা করে দিতেন। এতে রোম বাড়ানো-কমানোর কাজ বাবা একাই করতেন। মাঝে মাঝে আমাদেরকে এটা-সেটা আগ বাড়িয়ে দেবার জন্য বলতেন।
বাবার হাতের কাজ খুব উন্নতমানের ছিল, এলাকার চাচা বা দাদার বয়সি সবাই বাবার কাজের খুব প্রশংসা করতেন। পরিবারের ব্যবহারিক জিনিসপত্র বাবা নিজ হাতে বানাতেন। যেমনঃ খলই, পাটি, জাখা, কুলা, হাতপাখা ইত্যাদি খুবই নিখুঁতভাবে বাবা বানাতে পারতেন।

কোমল ভালোবাসা আর ত্যাগে অগ্রগামী যিনি, তিনিই তো বাবা। বাবা যে কোনো ধরনের দুঃখ-কষ্ট অকাতরে সহ্য করেন। সবসময় চেষ্টা করেন সামান্য কষ্ট যেন সন্তানকে স্পর্শ না করে। আমাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভেবে বাবা সারাজীবন অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন।
প্রতি মাসেই আমাদের স্কুল- কলেজের বেতন, পরীক্ষার ফিস সহ বিভিন্ন ধরনের ফিস বাবাকে দিতে হত। বাবা আমাদের কাছ থেকে শেষ তারিখ জেনে নিয়ে অন্তত দুই/এক দিন আগেই ফিসের টাকা আমাদের হাতে তুলে দিতেন। এত টানাটানির মাঝেও বাবা কারো কাছে হাত পাততেন না।
প্রতি সোম ও শুক্রবারে আমাদের লোকাল বাজার (নাজির বাজারে) হাট বসত। প্রতি হাটবারে বাবা আমাদেরকে ৫টাকা করে পকেট খরচের জন্য দিতেন। এখন পকেটে হাজার টাকা থাকলেও বাবার দেয়া সেই ৫টাকার তৃপ্তি আর পাওয়া যায়না।
নিজের পকেট খরচ, ডাক্তারী খরচ অথবা বাজার খরচের তালিকা কাটছাট করে বাবা আমাদের চাহিদা গুলো পরন করে দিতেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জন সক্ষম ব্যক্তি বাবা আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে, হাসি মুখে সব কষ্ট মেনে নিয়েছিলেন। তাইতো বাবাকে বলা হয়- “A wall of trust and security”.
বাবাকে নিয়ে বলতে ইচ্ছে হয়–

আমি হিমালয় দেখিনি
শুনেছি সেখানে নাকি এভারেস্ট নামের
পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ
দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে!
কিন্তু আমি দেখেছি আমার বাবাকে
যিনি তার অক্ষম সন্তানদের
বিশাল বটবৃক্ষের মত মাথা উঁচু করে
দাঁড়িয়ে থেকে ছায়া দেন অবিরাম।
আমি প্রশান্ত মহাসাগরের নীল জলরাশি দেখিনি
কখনো মাপতে যাইনি এর গভীরতাও,
কিন্তু দেখেছি আমার বাবাকে
যার হৃদয় এতটাই গভীর যে
তার অবুঝ সন্তানেরা এই গভীরতায়
যেভাবে ইচ্ছে বিচরণ করতে পারে।

আমাদের জীবনে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস হচ্ছেন বাবা, ভবিষ্যতের রাস্তায় যাত্রা শুরু করার ক্ষেত্রে বাবা হচ্ছেন  অকৃত্রিম ভালবাসায় তৈরী শক্তির লাঠি, সেটাকে আকড়ে ধরে আমরা পার করে দিতে পারি জীবনের বাকিটা সময়।
বাবার জীবন ছিল কুরআন-হাদীসের আলোকে পরিচালিত।কোন কাজ করার পূর্বে শরিয়তের নির্দেশনা ভালভাবে দেখে নিতেন। বাবা নামাজ-রোজা সহ ফরজ-ওয়াজিব কাজ গুলো আদায় করার জন্য সবসময় উদগ্রীব থাকতেন।
আমলি জিন্দেগীতে বাবা ছিলেন অনেকের ছেয়ে এগিয়ে। রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর অনেক সুন্নতের উপর বাবার পাকা আমল ছিল। যেমনঃ তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া, কোরআন তেলাওয়াত করা, মেছওয়াক করা, সুগন্ধি ব্যবহার করা, তাকবীরেউলার সহিত জামাতে নামাজ পড়া, জুম্মার দিন মসজিদে আগে আগে যাওয়া, জানাজার নামাজে শরিক হওয়া, সবার আগে সালাম দেওয়া, সম্ভব হলে করযে-হাসানা দেওয়া, লোকজনদের বিপদে-আপদে সাধ্য মত সহযোগিতা করা, মেহমানদারী করা ও দাওয়াত রক্ষা করা ছিল বাবার নিত্যদিনের আমল। বাবা আমাদের গ্রামের (সাধুগ্রাম-বায়তুন নাজাত) মসজিদের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন ও মুতাওয়াল্লী ছিলেন।

মাতা-পিতার প্রতি ছিল বাবার অগাদ ভক্তি- শ্রদ্ধা ও ভালবাসা।দাদাকে আমরা দেখিনি, তবে দাদীকে পেয়েছি। দাদীর প্রতি বাবা যে সম্মান দেখাতেন তা অতুলনীয়। কাজ থেকে এসে বাবা প্রথমেই দাদীর খবর নিতেন। দাদী আমাদের কাছে বলতেন, আমার ছেলে আমাকে কখনও কষ্ট দিয়ে বা রাগ করে কথা বলেনি। দাদীর কিছু হলে বাবা অস্তির হয়ে উঠতেন। ডাক্তার-কবিরাজের কাছে দৌড়াদৌড়ি ও নিরবে চোখের পানি ফেলতেন। এতে বাবা, দাদা-দাদীর পরিপূর্ণ দোয়া ও সন্তুষ্টি অর্জন করে নিতে সক্কম হয়েছিলেন।
বাবা বন্ধু -বান্ধব, পাড়া প্রতিবেশী ছোট-বড় ও পরিচিত জনদের সব সময় খোঁজ-খবর নিতেন। দূরের আত্মীয়-স্বজনদের সাথে দেখা করার উদ্দেশ্য বাবা মাঝে মাঝে সফর করতেন। বয়সে ছোট হলেও শিক্ষিত জনদেরকে বাবা সম্মান করতেন। বাবার সাথে কখনও কারো মনোমালিন্য হতে দেখিনি, বাবার অজান্তে কেহ যদি বাবার উপর কষ্ট পেয়েছেন আর বাবা জানতে পারতেন, তাহলে বাবা আগ বাড়িয়ে সালাম দিয়ে কথা বলা শুরু করে দিতেন।
বাবা মুসাফিরের মত সহজ-সরল জীবন যাপন করতে ভালবাসতেন। স্পন্স জোড়া ক্ষয় হয়ে মাঠির সাথে মিশে যাচ্ছে  সেদিকে বাবার কোন খেয়াল নেই, লুংগি-পায়জামা-পাঞ্জাবি বছরের পর বছর ব্যবহার করতেন, এতে বাবা কখনও লজ্জাবোধ করতেন না।
আসলে সন্তানের জন্ম থেকে শৈশব-কৈশোর পেরিয়ে উপার্জনক্ষম করা পর্যন্ত অথবা বিয়ে দেয়া পর্যন্ত বাবারা নিজের একটা বড় দায়িত্ব ও কর্তব্য বলে মেনে নেন। আমরা অনেকেই এটা অনুধাবন করিনা। এর বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হলে পিতৃহীন কোন মানুষের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনটা মিলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে বাবা কতোটা নির্ভরতার প্রতীক। নিজের জীবনের পার্থক্য উপলদ্ধিতে আসবে তখন, অনুভুত হবে বাবাদের ত্যাগ ও তিতিক্ষার কথা।
এজন্যই বলা হয়ে থাকে যে-

বাবাদের শার্টগুলো বেশিরভাগ সময়ই দামি হয় না, বাবাদের ওয়ারড্রব ভর্তি শার্ট-প্যান্ট থাকে না। বাবাদের জুতা চলে বছরের পর বছর, মোবাইলটা একেবারে নষ্ট না হলে বদলান না, ঘড়িটা বৃদ্ধ হয়, তবুও হাতেই থাকে। একা খেতে হলে সবচেয়ে সস্তা খাবার খোঁজেন, একা কোথাও গেলে বাসে চড়েন। রোদ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সঞ্চয় করেন। অথচ স্ত্রী-সন্তানকে সাধ্যের সব চেয়ে দামি জিনিসগুলো কিনে দেন। বাবারা একান্ত বাধ্য না হলে কখনও না বলেন না। নিজের জন্য সবচেয়ে কৃপণ বাবাটা তার স্ত্রী-সন্তানের জন্য সবচেয়ে বেশি বেহিসাবি। বেশিরভাগ বাবাই ভালোবাসি শব্দটা বলতে জানেন না, করতে জানেন। তারা আজীবন তাদের ভাগের বিলাসিতার ভাগ দিয়ে স্ত্রী-সন্তানকে ভালোবেসে যান।
কেউ বাবার খোঁজ-খবর নিলে বা সম্মান জানালে বাবা খুব খুশি হতেন, এবং আমাদের কাছে বলে লোকটির প্রশংসা করতেন। বাবাকে কখনও অযথা বসে আড্ডা দেওয়া বা গল্প-গোজব করতে আমরা দেখিনি। জীবনের সর্বোক্ষেত্রে বাবা নবী (সঃ) এর আদর্শ অনুসরণ করতেন। ক্ষণস্থায়ী এই পৃথিবীর তুলনায় বাবা পরকালের স্থায়ী জীবনকে গুরুত্ব দিতেন বেশি।

খেলাধূলার প্রতি বাবার ব্যাপক আগ্রহ ছিল, সেটা হউক সরাসরি কিংবা টেলিভিশনের পর্দায়।
এলাকাতে কোন খেলা হলে বাবা অনেক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতেন। কৃকেট ছিল বাবার প্রিয় খেলা। দেশের খেলা যেদিন  টেলিভিশনে দেখাত, সেদিন হাতের কাজগুলো আগে ভাগে শেষ করে বাবা টেলিভিশনের সামনে বসে যেতেন। নামাজের সময় হলে বাবা মসজিদে জামাতে শরিক হওয়ার জন্য চলে যেতেন। আসার সময় কাউকে কাছে দেখলেই রান ও উইকেটের কথা জিজ্ঞেস করতেন। যেদিন বাংলাদেশ জয়ী হত সেদিন বাবার খুশীর সীমা থাকতোনা ।
বাবা প্রচুর পরিমানে বই পড়তেন, ইসলামিক বই হইতে শুরু করে সমকালীন প্রায় সব লেখকেরই বই পড়তেন। বাবা পড়ার জন্য লাইব্রেরী হইতে ভাড়া করে বই নিয়ে আসতেন। এতে সব বিষয়ের উপর বাবার কম-বেশি জ্ঞান ছিল। আমরা কোন বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে বাবা অনায়াসে সমাধান বের করে দিয়ে দিতেন।

আমাদের ছোটবেলায় দেখতাম বাবা প্রচুর পরিমাণে চিঠি লিখতেন, তখন যোগাযোগের মাধ্যম ছিল একমাত্র চিঠি। আমাদের পাড়ার প্রচুর লোক বিদেশে থাকেন কিন্তু চিঠি লিখা জানতেন মাএ কয়েক জন, এতে লোকজনদের কাছে পছন্দের তালিকায় বাবা ছিলেন অন্যতম। বাবাও কাউকে ফিরিয়ে দিতেন না, হাঁসি মুখে সময় বের করে সবাইকে চিঠি লিখে দিতেন। চিঠি লিখা শেষ করে যখন বাবা চিঠি পড়ে শুনাতেন তখন আশে-পাশে সবার চোখে পানি চলে আসত, কারন বাবা খুব আবেগ মিশিয়ে চিঠি লিখতে জানতেন।
বাবা ব্যস্ত থাকলে অনেক সময় আমাদের উপরও চিঠি লিখার দায়িত্ব বর্তাতো। আমাদের মাধ্যে বড় ভাইয়ের লিখার ভাষা ও ছন্দ ছিল বাবার মতই, তাই বড় ভাইয়ের ও কদর ছিল।
বাবা আরও কিছু জটিল কাজ জানতেন এজন্য অন্যান্য এলাকার লোকজনও বাবার কাছে আসতেন। যেমনঃ জায়গা কেনা-বেচার সময় মাপজোখ নেয়া, জায়গা কালি করা, মাটি কাটার পরে মাটির হিসাব বের করে দেয়া এবং জায়গা-জমিনের দলিল পড়ানোর জন্যও লোকজন বাবার কাছে আসতেন। এলাকার মুচি সম্প্রদায়ের লোকজনও চামরার ফুট/গজ এবং টাকার হিসেব বের করার জন্য বাবার কাছে আসতেন।

বাবা মারা যান ২০০৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর শুক্রবারে। আগের দিন বৃহস্পতিবার আমি যথারীতি অফিসের কাজে ব্যস্ত। দুপুরের পর বড় ভাইয়ের ফোন “আলম” বাবা বলছেন আজকে একটু তাড়াতাড়ি বাড়িতে চলে আসার জন্য। বাবা বলছেন! হঠাৎ আৎকে উঠলাম। বাবাতো এরকম কোনদিন বলেননি! বসকে বলে কিছুক্ষণের মধ্যেই অফিস থেকে বের হয়ে গেলাম। যাবার পথে, বাবার গত দুই/তিন দিনের কাজগুলো বিশ্লেষণ করে ভাবনায় পড়ে গেলাম! তাহলে কি বাবার কাছে মহান রবের সাথে সাক্ষাতের বার্তা চলে এসেছে!যেমন কয়েকদিন আগে বাবাকে ডাক্তার দেখিয়েছি, বাবা ডাক্তার দেখাতে চাননি, অনেকটা পীড়াপীড়ির পর বাবা রাজী হয়েছিলেন। ডাক্তার যখন কিছু পরীক্ষা দিলেন,তখনও বাবা পরীক্ষা করাতে আর রাজি হননি, তিনি বললেন বাবা এগুলো করে আর কি হবে! আমি বাবার কথার অর্থের দিকে না গিয়ে বললাম বাবা কষ্ট করে যখন চলে আসছেন, তাহলে পরীক্ষা গুলো করে নেয়া ভাল। বাবা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রাজি হয়ে গেলেন।

আমাদের এক ফুফু অর্থাৎ বাবার মামাতো বোন লন্ডন থেকে দেশে এসেছেন, ফুফু দেশে আসলে বাবাকে এমনিতেই দেখতে আসেন, সাথে কিছু উপটৌকন ও নিয়ে আসেন, কিন্তুু এবার ফুফু আসার খবর পেয়েই বাবা উনাকে দেখতে চলে গেলেন।গিয়ে ফুফু কে বলতেছেন আর কোনদিন দেখা হবে কিনা তাই তোমাকে দেখতে চলে আসলাম, ফুফু বাবার এ কথা শুনে অনেক কান্না-কাটি করেছেন। এসব চিন্তা করতে করতে বাড়িতে চলে আসলাম ততক্ষণে বিকেল হয়ে গেছে। এসে দেখি বাবা সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিতেছেন! মুসাফির যেমন কোথাও কিছুদিন থাকার পর তার আসল ঠিকানায় যাওয়ার সময় সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যায়, ঠিক সেরকমই বাবাও সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিতেছেন। দূরের আত্মীয়-স্বজনদের ফোনে বলতেছেন যে আমার জন্য দোয়া করবেন, আর জান্তে বা অজান্তে যদি কোন সময় কোন আঘাত দিয়ে থাকি তাহলে মাফ করে দিবেন, বলা যায়না কখন কোন অবস্থা হয়, সেটা একমাত্র আল্লাহ পাক জানেন।
সকালকের দিকে বাবা মসজিদের হিসাব-নিকাশ ও কিছু জরুরী কাজ আমার ছোটভাইকে বুঝিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। যোহর ও আছর নামাজে বাবা মসজিদে উপস্থিত না থাকায় ইমাম সাহেব ও আমাদের গ্রামের কারী চাচা বাবাকে দেখতে আসলেন। বাবা উনাদেরকে বললেন আপনারা আমাকে একটু তাওবা-এস্তেকবার করান আমার কেমন যেন লাগতেছে। কারী চাচা বাবাকে বললেন আপনারতো সব ঠিক আছে এগুলো মনের দুর্বলতা, তার পরও আপনি মনে মনে  তাওবা-এস্তেকবার করে নিতে পারেন। কিনতু বাবা চাচ্ছেন উনাদের হাতে নিয়ম অনুযায়ী একটা তাওবা করে নিতে। বাবার পীড়া-পীড়িতে ইমাম সাহেব বাবাকে তাওবা পড়ালেন।
ইমাম সাহেবরা চলে গেলে আমরা পরিবারের সবাই বাবার কাছে বসলাম, বাবার সাথে কথা বলতেছি, বাবা বলতেছেন বুকে কিছু ব্যথা করতেছে। আমরাও বাবাকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলতেছি, কিনতু বাবা বলতেছেন তোমরা ব্যস্ত হইও না, আমি ঠিক আছি। রাত ১২ টার দিকে বাবা সবাইকে বললেন তোমরা এখন গিয়ে ঘুমিয়ে পড়, আমার এখন ভাল লাগিতেছে, সমস্যা হলে তোমাদেরকে ডাকব। আমরা সবাই যার যার বিছনাতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। তবে বড় দুই ভাই বাবার আশেপাশেই ছিলেন যাতে বাবাকে খেয়াল রাখা যায়।
রাত তখন ৪টা বাজে ঘুম ভেঙে শুনি বড় ভাইদের কথা-বার্তার আওয়াজ, দৌড়ে বাবার কাছে গেলাম। বাবার তখন অস্তির অস্তির লাগতেছে। সবাই দোয়া-কালাম পড়তেছেন, আমিও ওযু পড়ে এসে সুরা ইয়াছিন তেলাওয়াত শুরু করলাম। মেজ ভাই গাড়ী কল দিলেন, ইমাম সাহেব এসে বাবাকে তেলাওয়াত করে শরীরে ফু দিলেন। গাড়িও চলে এসেছে, এমতাবস্থায় বাবা বলতেছেন তোমরা একটু ধৈর্য্য ধর, রাতটা শেষ হয়ে যাক, তারপর যা করার করবে। আমরা গাড়ী দাঁড় করিয়ে রাখলাম, যাতে ভোরের আলো ফোঁটার সাথে সাথেই বাবাকে নিয়ে হসপিটালে রওয়ানা দিতে পাড়ি। ইমাম সাহেবকে বাবা বললেন ফজরের সময় হয়ে গেছে আপনি মসজিদে চলে যান। ইমাম সাহেব চলে গেলেন। বড় ভাই বাবার কানের কাছে কালেমা শাহাদাৎ পাঠ করলেন। মসজিদ থেকে আযানের ধ্বনি আসতেছে “আসসালাতু খাইরুম মিনাননাউম”। সাথে সাথে বাবাও মাওলার ডাকে সারা দিয়ে পরপারে চলে গেলেন। আমি সুরা ইয়াছিন তেলাওয়াত শেষ করে দেখি বাবার আর কোন সারা-শব্দ নেই।

বাবা মুখে কখনো বলবনা ভালবাসি, তবু জেনে রেখো বাবা-অবিদিত সুতোর টানে, মনের গহীন কোনে- ক্লান্ত, অবসন্ন আর বৈরী সময়ে ভেঙ্গে যাওয়া এই আমি সান্তনা আর সাহস খুঁজে পাই তোমার রেখে যাওয়া জীবনাদর্শ থেকে।
পরিশেষে বলব-বাবা শুধু একজন মানুষ নন, স্রেফ একটি সম্পর্কের নাম নয়। বাবা নামটির মাঝে জড়িয়ে আছে বিশালত্বের এক অদ্ভুত মায়াবী প্রকাশ। বাবা নামটি উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে কোনো বয়সী সন্তানের হূদয়ে শ্রদ্ধা কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসার এক অনুভব জাগে, মানুষটি কতভাবে অবদান রেখে যান সন্তানের জন্য, যার চুলচেরা হিসাব করে কেউ বের করতে পারবেন না। বাবার কাঁধটা কি অন্য সবার চেয়ে বেশি চওড়া? তা না হলে কি করে সমাজ সংসারের এতো দায়ভার অবলীলায় বয়ে বেড়ান বাবা। বাবার পা কি অন্য সবার চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত চলে? নইলে এতোটা পথ এতো অল্প সময়ে কি করে এতো শক্ত করে সব কিছু আগলে রাখেন বাবা! আর বাবার ছায়া..?

সেটাও শেষ বিকেলের বটগাছের ছায়ার চাইতেও বড়! বড় যদি না হবে তবে জীবনের এতো উত্তাপ থেকে কি করে সন্তানকে সামলে রাখেন বাবা! আর বাবার চোখ? সেটাও কি দেখতে পায় কল্পনার অতীত কোনো দূরত্ব। তা না হলে কি করে সন্তানের ভবিষ্যত্ ভাবনায় শঙ্কিত হন বাবা। সত্যি বলতে কি বাবাকে নিয়ে আমরা কেউই এমন করে কখনও ভাবি? শুধু আমাদের বাবা, শত সাধারণের মাঝেও অসাধারণ হয়ে ওঠা আমাদের জনক, আমাদের অকাতরে ভালোবেসে যান তার সামর্থ্যের শেষ বিন্দুটুকু দিয়ে। উজাড় করে দেন তার সবকিছুই শুধু তার সন্তানের জন্য। তার যা কিছু আছে নিজের জন্য আর অবশিষ্ট রাখেন না কোনোভাবেই। সবকিছু উজাড় করে দেয়ার পরও তাকে কোনোভাবে নিঃস্ব বলে মনে হয় না। মনে হয় তিনি যেন পরম তৃপ্তিতে আরও পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। বরং শ্রমে-ঘামে স্নেহে সন্তানকে তিলে তিলে বড় করে তুলতে সচেষ্ট বাবা মহান সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্যেও ফরিয়াদ জানান তার সন্তানের মঙ্গলের জন্য। আর বাবার সেই আহ্বান হয়ত গর্বিত করে তোলে অন্তর্যামীকেও।

মনে রাখবেন, সন্তান যত বড়ই হোক না কেন তার অভিমান আর অবহেলার পরিমাণ যত বিশালই হোক, বাবার স্নেহ সবসময় তার জন্য এক পরম আশ্রয়। বেঁচে থাকার আনন্দে, কষ্টের তীব্রতায়, কঠিন সমস্যায় বাবাই হয়ে ওঠেন বিপদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বন্ধু বা সহায়। অন্যদিকে সন্তান হিসেবে আপনাকে ভাবতে হবে বাবার কথা। তার আবেগ অনুভূতি আর পরিণত বয়সের চাওয়া পাওয়াগুলোর দিকে বাড়তি নজর দিতে হবে। যে বয়সে স্কুল-কলেজে নতুন নতুন বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে সময়গুলো বেশ জমে উঠেছে সে সময়টাতেও ভুলে যাওয়া চলবে না বাবার কথা। আবার যারা পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে দিব্যি কর্মজীবনে প্রবেশ করেছেন আয়-উপার্জন শুরু করেছেন তাদেরকেও সময় করে ভাবতে হবে বাবার কথা। অফিসের ব্যস্ততা আর নানা ঝামেলার মাত্রাটা যতই সীমা ছাড়িয়ে যাক না কেন বাড়িতে ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে কয়েক মিনিটের জন্য হলেও তার পাশে বসতে হবে গল্পের ঝুড়ি নিয়ে।
ভালো থাকুন পৃথিবীর সব বাবারা।
“রাব্বির হাম হুমা কামা রাব্বা ইয়ানি সাগিরা”।

লেখকঃ কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক।

সম্পাদক: শাহ সুহেল আহমদ
প্যারিস ফ্রান্স থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: