মঙ্গলবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

Sex Cams

হোসনে আরা বেগম (ডলি)’র কাব্যগ্রন্থ কবিতার জলরঙ : জীবনবোধের প্রচ্ছায়া




বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল

কবিতা সাহিত্যের প্রাচীনতম শাখা। তবুও আজ পর্যন্ত কবিতার সুনির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা পাওয়া যায় নাই। একেক জনের দৃষ্টিতে কবিতার সংজ্ঞা এক এক রকম স্বাদ ও ভাষা পেয়েছে। কবিতা কখনো হয়েছে আবেগকেন্দ্রিক, কখনো অনুভূতিপ্রবণ মনের বহিঃপ্রকাশ, কখনো সমকালের মুখপাত্র, কখনো শাব্দিক ঝংকার, কখনো বেদনাবিধুর হৃদয়ের কান্না, কখনো শোকাহত হৃদয়ের আর্তনাদ, কখনো সংগ্রামী সশস্ত্র সৈনিক, কখনো বা অধিকার বঞ্চিত শ্রমজীবী মানুষের মুখপাত্র। কবিতার জন্য কবিতার সৃষ্টি; আর কারো জন্য নয়।
মানুষের মন থেকে আগত যে কোনো ভাব, মস্তিষ্ক ব্যবহারে ভাবনা, দক্ষতার সাথে তার পর্যবেক্ষণ ইত্যাদি ছন্দবদ্ধ আকারে প্রকাশই হচ্ছে কবিতা। কেউ কেউ বলে থাকেন, ‘পয়েট্রি ইজ ইমিটিশন অব লাইফ’, ‘ক্রিটিসিজম অব লাইফ’, ‘মিরর অব লাইফ’। এটাই যে কবিতার সংজ্ঞা; প্রকৃতপক্ষে তা কিন্তু নয়।
কবিতা বোঝার বিষয় নয়, এটাকে অনুভব করতে হয়। কারণ কবিরা লিখে থাকেন অনুভব করে। জীবন ও জগতের নানাবিধ ভাবনা তাদের মাথায় ঘুরপাক খায় কিংবা সামাজিক অনাচার-অবিচার অথবা প্রাকৃতিক কোনো বিষয়; মনের আবেগতাড়িত কোনো মধুর বিষয়কেই কবিতায় রূপ দেওয়া হয়। তাই তো বলা হয়ে থাকে, সর্বোত্তম ভাবের সাথে সর্বোত্তম শব্দের সংযোগই পারে সর্বোত্তম কবিতা সৃষ্টি করতে। অর্থাৎ, কবিতা হচ্ছে সর্বোত্তম ভাবের সর্বোত্তম শব্দের সর্বোত্তম প্রকাশ।
কবিতা পরিতৃপ্তির বিষয়। কবিতা তখনই সার্থক হয় যখন কবি মনের পরিতৃপ্তিতে পূর্ণতা আসে। বিশ্বকবি শেলি বলেন, ‘কবিতা হলো পরিতৃপ্ত এবং শ্রেষ্ঠ মনের পরিতৃপ্তি এবং শ্রেষ্ঠ মুহূর্তের বিবরণ’। আর ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলেন, ‘কবিতা সমস্ত জ্ঞানের শ্বাস-প্রশ্বাস আর সূক্ষ্ম আত্মা’। এটা এক গভীর অনুভূতিপ্রবণ মনের পরিচায়ক। মূলত মন, আত্মা ও অনুভ‚তির চমকপ্রদ প্রকাশই হচ্ছে কবিতা। মন কিংবা আত্মার কথাগুলো যখন ভাব ও ভাষায় রূপ নেয়, তা-ই কবিতা হয়ে যায়। এই যে কবিতার নানামাত্রিক ধারণা এবং দর্শন-এগুলোর উপর ভিত্তি করেই এগিয়ে যাচ্ছে বাংলা কবিতা। এজন্যই সাহিত্যে কবিতার আবেদন অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। আর তাই কবিতাকে বলা হয় শিল্পীর মানসসন্তান। পাশাপাশি তিনি হয়ে থাকেন একজন যথার্থ জীবনশিল্পী। জীবন ও জগতের নানাবিধ বিষয়কে তিনি দেখেন অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে। উপমা, উৎপ্রেক্ষা এবং চিত্রকল্পের মোড়কে তিনি কবিতাকে শিল্পের ব্যঞ্জনায় ফুটিয়ে তুলেন। কবিতায় যেমন ফুটে ওঠে জীবনের প্রচ্ছন্ন বোধ; তেমনই এ কবিতায় ভেসে আসে বিরহের গান-যেন রাখালিয়া বাঁশির সুরে মনোহরিণী জীবনকে এক অকৃত্রিম মায়ায় বেঁধে রেখেছে। বাংলা কবিতায় তাই বারবার প্রতিফলিত হয়েছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের হাত ধরে। অবিনশ্বর জীবন ও জগতের যে বোধ কবিদের মধ্যে জন্ম হয়-অনেকক্ষেত্রে কবিরা সেটাকেই কবিতায় ফুটিয়ে তুলেন। বিশেষ করে-মরমি কিংবা আধ্যাত্মবাদকে বিশ্বাস কিংবা ধারণ করেন-এমন কবিরাই এসব নিয়ে কবিতা লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তবে কবিতার এটি একটি চিরন্তন আবেদন যে, কবিতা কখনো তাঁর লৌকিকতা কিংবা সার্বজনীনতাকে পরিহার করে না। যদিও বা কবিদের ক্ষেত্রে এটা অনেক সময় ভিন্নতায় রূপ নিতে পারে। তবে বেশিরভাগ কবিই জীবন ও জগতকে নিয়ে লেখার পরিবর্তে প্রেম-ভালোবাসা এবং মানবিক সম্পর্ক নিয়ে কবিতা লিখতে আনন্দ খোঁজে বেড়ান।
বাংলা কবিতায় সিলেট এক প্রচ্ছন্ন ছায়ার অংশীদার। এ অঞ্চলে জন্ম নিয়েছেন কবি দিলওয়ার, কবি আফজাল চৌধুরী, বাউলশিল্পী শাহ আব্দুল করিম, হাসনরাজা, রাধারমণসহ অসংখ্য সাধক। যাদের কবিতা এবং সংগীত ছন্দ-সুরের মোহনায় আবিষ্ট করেছে মানুষের মন। তাদের চিন্তা এবং চেতনা সেই বিশ্বলৌকিক মর্মকেই প্রতিভাত করছে-যা আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের একেকটি সমৃদ্ধ অংশ। ঐতিহাসিক পটভূমিকায় বাংলা কবিতার যে অগ্রযাত্রা-তা প্রতিটি সময়েই স্বর্ণোজ্জ্বল অবদানের স্মারক। এটা অস্বীকারের কোনো উপায় নেই যে, সাহিত্যে সিলেট প্রাগ্রসরতার দাবিদার। এ অঞ্চলে যেমন অসংখ্য পুরুষ কবি কাব্যচর্চায় ব্রতী হয়েছেন, তেমনই নারীরাও কম যান না। বাংলা কবিতায় অনন্য ধাত্রী কবি সহিফা বানু থেকে শুরু করে কবি লাভলী চৌধুরী, কবি মাহবুবা সামসুদ, শামসাদ হুসামসহ অনেকেই কাব্যচর্চায় রেখেছেন অসাধারণ ভূমিকা। তাঁদেরই অন্যতম হলেন কবি হোসনে আরা বেগম (ডলি)। প্রবাসে থেকেও যিনি লালন করেন কাব্যচর্চার এক অকৃত্রিম মমত্ববোধ। জীবন ও জগতের নানাবিধ বাস্তবিকতা তাঁকে আঁকড়ে ধরলেও তিনি ভুলে যাননি শেকড় ও ঐতিহ্যের কথা। সৃজন ও মননে তিনি সেই সকল নারীদের সহযাত্রী-যারা সিলেটের ইতিহাস-ঐতিহ্য নির্মাণে অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন সময়ে সময়ে। এক অনালোচিত যাপনভাব সৃষ্টিশীলতা থেকে দূরে রাখলেও তিনি যে আবেগ-অনুভূতিকে ছড়িয়ে দেন পড়ন্ত বেলায়-তা মোহিত করার মতোই। তাই তার কবিতার আলোচনা সময়ের বিবেচনায় অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
হোসনে আরা বেগম (ডলি) একাধারে কবি, শিক্ষক ও আবৃত্তিশিল্পী। তবে লেখালেখি তথা সৃজনশীলতার মধ্যেই তিনি জীবনের আনন্দ খোঁজে পান। এ আনন্দে যেমন কৃত্রিমতার কোনো প্রলেপ নেই, তেমনই জীবনের নেই কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা। বরং এ আনন্দের মধ্যে মিশে আছে সাবলীল এবং সহজ-সরল জীবনের এক মূর্ত প্রতিচ্ছবি। এছাড়া কবি হোসনে আরা ডলি সুযোগ পেলেই সংস্কৃতি চর্চায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। আত্মপরিচয় এবং আত্মোপলব্ধি যে সাংস্কৃতিক চর্চায় নিবদ্ধ-তিনি সেটাকেই বারবার খোঁজে ফিরেন। কবি নিজের জীবনের ভালালাগাকে প্রাধান্য দেন বলেই রন্ধন শিল্পকে খুব পছন্দ করেন। গভীর জীবনবোধ এবং আত্মজিজ্ঞাসার মধ্যে নিজেকে যাপিত করেন। এ দুটি বিষয়ের সমন্বিত চিন্তা তাঁর কবিতায় স্থান পায় সৌন্দর্যময়তার সাথে। বিশ্বাস এবং সৌন্দর্য তাঁর কবিতা থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হয় না। এ যেন গর্ভধারিণী মা-যিনি তার সন্তানকে নিজের মধ্যেই লালন করছেন।
বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী কবি হোসনে আরা বেগম (ডলি) ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দের ১ এপ্রিল চট্টগ্রাম জেলার নন্দনকাননে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম মোহাম্মদ মহিউদ্দীন চৌধুরী বাংলাদেশ পুলিশ বিভাগের এসপি ছিলেন। মা মরহুমা দিলারা মহিউদ্দীন রুনু ছিলেন গৃহিণী। তাদের পৈতৃক নিবাস বালাগঞ্জ উপজেলার বড় হাজিপুরে এবং তার নানাবাড়ি গোলাপগঞ্জের রনিকাইলের বারোকোটে। কিন্তু তাঁরা সপরিবারে টিলাগড়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। পিতার চাকুরির সুবাদে কবি হোসনে আরা বেগম (ডলি)-এর বাল্যকাল তথা যৌবনকাল কেটেছে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়ায়। প্রায় প্রতিটি জেলার আলো-বাতাস তথা প্রাকৃতিক পরিবেশে তিনি বড় হয়েছেন। তিনি দেখেছেন বিচিত্র মানুষ, ভাষা-সংস্কৃতি এবং জীবনাচরণ। যা তাঁর জীবনের গভীর উপলব্ধিকে আরো বেশি শানিত করেছে। কবি হোসনে আরা বেগম (ডলি) চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর নাড়ির সম্পর্ক বিদ্যমান আছে শাহজালালের পুণ্যভূমি সিলেটের সঙ্গে। তাঁর কবিতায় এর গভীর প্রভাব লক্ষ করা যায়। মূলত শাহজালাল (রহ.)-এর পুণ্যভূমি সিলেটের অধিবাসী হওয়ায় তাঁর মধ্যে বিশ্বাস এবং সৌন্দর্যটা দারুণভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল। যা তার জীবনবোধে এখনো গভীরভাবে প্রবাহিত। প্রবাসে থেকেও তিনি এর লালিত্যবোধ করেন তাঁর হৃদয়ে। পৈতৃক নিবাস টিলাগড় যেন নৈসর্গিক আত্মায় বাঁধা রক্তীয় সম্পর্ক। বাবা এবং দাদাবাড়ি-নানাবাড়ির প্রভাবেই তাঁর সিলেট ও টিলাগড় এলাকাপ্রীতি আরো সুদৃঢ় হয়েছিল। তাই তো জীবনের এই সময়ে তিনি যেখানেই গিয়েছেন-সেখানেই খোঁজে ফিরেছেন আপন মাটির গন্ধ। অথচ তা তাঁর কবিতায়ই শেষপর্যন্ত মূর্ত হয়ে ওঠেছে রূপকভাবে।
কবি হোসনে আরা বেগম (ডলি) ‘রাঙামাটি সরকারি হাইস্কুল’, ‘চট্টগ্রাম নাসিরাবাদ সরকারি মহিলা কলেজ’ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষার আনন্দঘন, সফলতার উজ্জ্বল সময় কাটিয়েছেন। শিক্ষাজীবনের প্রতিটি স্তরে তিনি রেখেছিলেন প্রতিভার স্বাক্ষর। অর্জন করেছেন প্রতিভার স্বীকৃতি। কিন্তু তিনি বরাবরই প্রচার, প্রসার এবং প্রশংসায় অনাগ্রহী বলেই থেকেছেন নীরবে-নিভৃতে। অথচ তাঁর সাহিত্যচিন্তা যে প্রাজ্ঞতার পরিচায়ক, তাকে তিনি কখনোই সামনে আনতে চাননি। তাঁর কবিতায় প্রচ্ছন্ন আলোয় ফুটে উঠেছে জীবনবোধের বহুরূপী বিবেচনাদিক।
কবি হোসনে আরা বেগম (ডলি) ব্যক্তিজীবনে নোয়াখালী মাইজদী কোর্টের স্বনামধন্য সাংবাদিক ও আইনজীবী মরহুম শাহ আখতার (প্রাণধন)-এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি আইনপেশার পাশাপাশি সাংবাদিকতার সাথে জড়িত ছিলেন। দাম্পত্য জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে সিলেট, ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং নোয়াখালীতে। তাঁদের এক ছেলে এবং এক মেয়ে। উচ্চশিক্ষা অর্জন করে তারা স্ব স্ব অবস্থানে সুপ্রতিষ্ঠিত এবং আমেরিকা-টেক্সাসের ‘হিউস্টন’ শহরে বসবাস করছেন। ‘জেইন’ ও ‘জানিশ’ নামক দুটি নাতি নিয়ে তিনি সুখ-শান্তিতে বসবাস করছেন। প্রবাসজীবন থেকেও তিনি প্রতিনিয়ত উপলব্ধি করেন ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন এবং পরিজনের মায়া। এ মায়াকেই তিনি সৃজনশীলতায় রূপ দিয়ে থাকেন।
কবি হোসনে আরা বেগম (ডলি) শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। জীবনের অর্ধেক সময় তিনি শিক্ষকতায়ই কাটিয়ে দেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি সাহিত্যসাধনায়ও নিমগ্ন হন। এজন্য তিনি রবীন্দ্র, নজরুল, জসীম উদ্দীন, জীবনানন্দ, সুকান্তসহ বাংলাসাহিত্যের কিংবদন্তি সাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে গভীর অধ্যয়ন করেন। তাঁদের সৃষ্টিকর্ম থেকে নিজেও অনুপ্রাণিত হন। এর মাধ্যমেই তিনি কবিতা তথা সাহিত্যসাধনায় আত্মনিয়োজিত করেন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও নিজেকে জড়িত রেখেছেন।
কবি হোসনে আরা বেগম (ডলি)-এর লেখালেখির হাতেখড়ি হয় স্কুলজীবনেই। তাঁর পিতা পুলিশ বিভাগে চাকরি করলেও সাহিত্যের প্রতি ছিলেন অনুরাগী। তাই বাবাই তাঁকে লেখালেখিতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। এরপর থেকে তিনি বিভিন্ন জাতীয় পত্র-পত্রিকা ও সাময়িকীতে অনবরত লিখছেন। এছাড়া অনলাইনেও তিনি বেশ সক্রিয়। তবে তাঁর কোনো লেখাই গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়নি। ‘কবিতার জলরঙ’-ই তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ। এ কাব্যে তাঁর সৃষ্টিশীলতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
কবি হোসনে আরা বেগম (ডলি)-এর হৃদয় প্রবলভাবে স্মৃতিকাতর। নস্টালজিক চেতনায় তিনি মূহ্যমান। স্মৃতির মধ্যে জীবনের যে আনন্দ-কবিরা তা খোঁজে বেড়ান আমৃত্যু। কবি হোসনে আরা বেগম (ডলি)ও ব্যতিক্রম নন। জীবনাস্তিত্বের সংঘাত যেখানে প্রবল, সেখানে স্মৃতি মানুষকে তাড়িত করে, আবেগাপ্লুত করে। কবি হোসনে আরা বেগম (ডলি) নস্টালজিক চেতনায় মিশে গিয়ে লিখেন :
‘জীবনের অস্তিত্ব জুড়ে স্মৃতি-ফেলে আসা দিনের অন্তরালে,
অম্ল মধুর বেদনাবিধুর স্মৃতি ভরা প্রীতি,
আশা দুরাশার গীতি
সময় ফিরে ফিরে ঘুরে সময়ের আড়ালে।’
(স্মৃতি কাতরতা)
কবি হোসনে আরা বেগম (ডলি) বিশ্বাস ও জীবনবোধের শিল্পী। জীবনের চিরায়ত রূপ কিংবা এর নশ্বরতা সম্পর্কে তিনি মোটেই অজ্ঞ নন। বরং মানবজীবনের চিরন্তন আহ্বানকে তিনি লালন করেন তাঁর মননে; যেখান থেকে তিনি জীবনের সঞ্জীবনী শক্তিকে উপলব্ধি করে থাকেন। একটি অবশ্যম্ভাবী পরিস্থিতির চিত্র কবির চোখে ভেসে ওঠে। তাঁর চোখ বারবার সেদিকেই চলে যায়। তিনি বুঝতে পারেন-এ দুনিয়া ধ্বংসশীল। পৃথিবীর প্রতিটি সৃষ্টির জন্য একটি শেষ রয়েছে। তাই তো কবির সৃষ্টি দ্যোতনায় উচ্চারিত হয়:
‘বেলা শেষের শেষ বেলা
হবে হৃদয় মাঝে হৃদয় হারার শেষ খেলা।’
(শেষ বেলা)
কবি হোসনে আরা বেগম (ডলি)-এর জীবনে তাঁর মমতাময়ী মায়ের উপলব্ধি অত্যন্ত প্রগাঢ় এবং অনবিবাস্ততায় প্রলম্বিত। তাঁর কবিতায় তিনি মা-কে উপস্থাপিত করেছেন একটি আদর্শ ও সরলরেখার লক্ষ্যবিন্দু হিসেবে। এটি কেবল তাঁর উপলব্ধি নয়, বরং সমগ্র মায়ের জাতিরই প্রতিচ্ছবি। প্রতিটি মা-ই যেন সন্তানের কাছে এক অবারিত উৎসাহ ও প্রেরণার কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর জীবনোপলব্ধি ‘মাতা’ কবিতায় অত্যন্ত সুন্দরভাবে প্রতিভাত হয়েছে। তিনি লিখেন :
‘মা যে আমার!
জীবন প্রদীপ আশার ঘরে-পরম স্বস্তিকা
মায়ের স্মৃতি অভয়বাণী সাহসী আলোকবর্তিকা।’
(মাতা)
কবি হোসনে আরা বেগম (ডলি) তাঁর মায়ের পাশাপাশি পিতাকেও মূল্যায়ন করেছেন অনন্যতায়। মূলত একজন ন্যায়নিষ্ঠ, আদর্শ, সৎ, দক্ষ এবং হিতাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তির মূর্ত প্রতিচ্ছবি ছিলেন তাঁর বাবা। তাঁর জীবনে বাবার যে অবস্থান ও শূন্যতা, একে ঘিরেই কবিতায় বেশ আবেগময়ী ভাষা ও ভাবের উদ্ভব হয়েছে। এর মধ্যেও সত্যিকার একটি বার্তা; যা তাঁর পিতা সারাজীবন আঁকড়ে ধরেছিলেন। তাঁর কবিতায় বাবার ছবি এভাবে ভেসে ওঠে :
‘পিতা পবিত্র তুমি!
খুঁজেছো সারা জীবন সৎপথে অমূল্য রতন
তাই আজো আত্মীয় পরিজন
চেনাজানা সকল গুণীজন
তাঁদের অন্তরে লালন করে শ্রদ্ধাভরে
তোমারই নাম পরম যতন।’
(পিতা)
কবি হোসনে আরা বেগম (ডলি) একজন স্বপ্নচারী ও ঐতিহ্যিক নারী। তিনি স্বপ্নকে দেখতে খুব বেশি পছন্দ করেন। অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের মতো- ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়’ চেতনায় তিনি দারুণভাবে অনুপ্রাণিত। স্বপ্নের মাঝে অস্তিত্বের সংগ্রামের যে অঙ্গীকার, এটা বোধহয় রূপকভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন কবি হোসনে আরা বেগম (ডলি)। তাঁর কবিতা থেকে এ আহ্বানই সদা জাগ্রত হয়। তিনি ‘স্বপ্ন’ কবিতায় লিখেন :
‘কত স্বপ্ন রোদে ঝলমল করে
কত স্বপ্ন মেঘে ঢেকে যায়
কত স্বপ্ন গোলাপের পাপড়ি মেলে
কত স্বপ্ন ঘাসের বুকে শিশির লুটায়
কত স্বপ্ন বৃষ্টি জলে ধুঁয়ে যায়
টাপুর-টুপুর সুরে মিলায়।’
(স্বপ্ন)
কবি হোসনে আরা বেগম (ডলি)-এর চেতনায় স্বদেশ যেন ছবির মতো। জীবনের যাপিত স্মৃতি এবং নস্টালজিক ধ্যান তাঁর কাব্যচর্চায় এনে দিয়েছে নতুন দ্যোতনা। এ দ্যোতনায় তিনি খোঁজে ফিরেছেন একটি স্বাধীন জীবনের পরশ। এ জীবনে যেন তিনি ‘কাজলাদিদি’র সেই বিরহবেদনায় মূহ্যমান ভাবকেই বারবার মূর্ত করে তুলেন। অথচ তিনি পাখির উড়াউড়ির মাধ্যমেই প্রশান্তি পান। অত্যন্ত অনন্যালোচনায় তিনি এক সার্থক চিত্রকল্পকে তুলে ধরেন। কবি তাঁর কবিতায় লিখেন :
‘নীল আকাশের অরুণ আলোয়,
কতো শত পাখির উড়াউড়ি মন ভরায়।
ভোরের রবি জাগে সেথায় সোনালি আলোয়।
সকাল দুপুর আলোর নাচন ধূলিকণায়।
বাঁশবাগানের মাথার উপরে চাঁদ জাগে ওই
জোনাক জ্বলে আঁধার রাতে অবাক চেয়ে রই।’
(দেশ)
কবি হোসনে আরা বেগম (ডলি)-এর কাব্যগ্রন্থ ‘কবিতার জলরঙ’-এ এভাবেই স্বজাত্যবোধ, প্রকৃতিচেতনা, প্রাকৃতিক উপকরণ ও নৈসর্গিক প্রতিচ্ছবি, প্রেম-মমতা-অনুভূতি, জন্মভূমির টান, ধর্মচিন্তাসহ নানাবিধ বিষয় ফুটে উঠেছে। এ কাব্যে তিনি জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম সম্পর্কে একটি চমৎকার কবিতা রচনা করেছেন। এ কবিতায় তিনি যেভাবে কবি নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী মনোভাব তুলে ধরেছেন, তেমনই তুলে ধরেছেন প্রেমিক কবি নজরুলকে। একটি দেশ এবং জাতিকে বিশ্বজনীন করতে কবি নজরুলের ভূমিকাকে তিনি বস্তুনিষ্ঠতায় কাব্যে ফুটিয়ে তুলেছেন। এ কবিতাটি যেকোনো পাঠকহৃদয়কে আনন্দিত করে তুলবে। এছাড়া তাঁর কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতাই পঠন-পাঠন এবং আলোচনার দাবি রাখে।
কাব্যগ্রন্থটির দৃষ্টনন্দন প্রচ্ছদ করেছেন কবির মায়ারধন নাতিদ্বয় ‘জেইন’-‘জানিশ’। চমৎকার বাঁধাই এবং চকচকে ছাপায় শোভিত ‘কবিতার জলরঙ’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ করেছে সিলেটের সৃজনশীল প্রকাশনা সংস্থা ‘পাণ্ডুলিপি প্রকাশন’। গ্রন্থটির শুভেচ্ছা মূল্য রাখা হয়েছে মাত্র ৫০০ টাকা। গ্রন্থটি পাঠকের কাছে দারুণভাবে পাঠযোগ্য হবে নিঃসন্দেহে। আমি লেখকের সুস্বাস্থ্য-দীর্ঘায়ু এবং গ্রন্থের বহুল প্রচার কামনা করি।
লেখক : প্রাবন্ধিক, প্রকাশক ও সংগঠক

সম্পাদক: শাহ সুহেল আহমদ
প্যারিস ফ্রান্স থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: