সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৪ খ্রীষ্টাব্দ | ১৪ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

জ্ঞান ও মূর্খতা করে টানাটানি




মোহাম্মদ আব্দুল হক

মর্ত্যলোকের মাটির গুহাতে শুয়েছিলো জ্ঞান ও মূর্খতা। একদিন অন্ধকার বিবরে একটুকরো আলোর ইশারায় ঘুম ভেঙে উঠে যায় জ্ঞান ও মূর্খতা। জ্ঞান খুশি হয়ে যায়। কারণ, জ্ঞান এতোদিন তার জ্ঞান-চক্ষু দ্বারা এমন আলোর অপেক্ষায় ছিলো।
অপরদিকে মূর্খতা হঠাৎ এমন আলোর ঝলককে ঝামেলা মনে করে বিরক্ত হয়। সে গুহার মুখের দিকে পিছন ফিরে গুহার ভিতরের দেয়ালের দিকে মুখ করে চোখ বন্ধ করে রাখে।
জ্ঞান : কি হে ভাই মূর্খতা! তুমি বাহির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে ওইদিকে আরও অন্ধকারে গেলে কেন?
মূর্খতা : আমাকে বিরক্ত করো না ভাই।
জ্ঞান : বিরক্ত করছি কোথায়? চেয়ে দেখো আলো এসে গেছে আমাদের অন্ধকার ঘরে।
মূর্খতা : কিসের আলো? চোখ জ্বালা করে।
জ্ঞান : আরে ভাই, এসো আমরা আলোর পথে যাই।
মূর্খতা : দোহাই তোমার, আমাকে বিরক্ত করো না। আমি এখানে ভালো আছি। যেখানে অন্ধকার আমি সেখানেই নাচি এবং সেখানেই বাঁচি।
জ্ঞান : এটা একটা কথা হলো! তুমি আমার সাথে চলো।
জ্ঞান এরপর এক পা দুই পা করে অন্ধকার গুহার সিঁড়ি বেয়ে আলোর পথে এগিয়ে যেতে থাকে। কিছুটা এগিয়ে যেতেই জ্ঞান বিস্ময়ে আনন্দে চিৎকার করে আবার মূর্খতাকে ডাকে।
জ্ঞান : আরে ভাই, তাড়াতাড়ি এসো। দেখে যাও কি সুন্দর আলোয় ভরা এক পৃথিবী।
মূর্খতা : দেখো ভাই, তোমাকে শেষ বারের মতো বলছি, আমাকে বিরক্ত করতে এসো না। এরপর-ও যদি তুমি আমাকে তোমার সাথে যাওয়ার জন্যে ডাকতে থাকো, তাহলে তুমি যেটুকু উঠেছো সেখান থেকে টেনে হিঁচড়ে নামিয়ে নিয়ে আসবো এবং তোমাকে আমার সাথে লেপ্টে আঁকড়ে ধরে রাখবো। আলোর পথে চলার শখ একেবারে মিটিয়ে দিবো।
তারপর জ্ঞান একটু একটু করে উপরে উঠে আর ভিষিথের আরো যতো মূর্খতা এখনও অন্ধকারে পড়ে আছে, তাদেরকে ডাক দিয়ে যায়। সেই সাথে এতোদিন এক-ই গুহাবাসী তার সঙ্গী পিছনে ফেলে আসা মূর্খতাকে-ও করে আলোর পথে আহবান।
এদিকে মূর্খতা ভাবে, জ্ঞান যদি এভাবে সবাইকে আলোর পথে ডাকে তাহলে-তো এ জগতের সকলেই জ্ঞানী হয়ে যাবে। তখন আমার কোনো মূল্য থাকবে না। আমার দল ছোটো হয়ে যাবে। তাই, মূর্খতা ফন্দি আঁটে এবং গর্জন করে তার অনুসারী যতো আছে সবাইকে ডেকে নিয়ে আসে। সবাইকে খেতে দেয়, নাচতে দেয়। আর এদেরকে লেলিয়ে দেয় জ্ঞান যেনো আর ডাকতে না-পারে, সে ব্যবস্থা করে।
মূর্খতার নির্দেশ পেয়ে তার শিষ্যরা জ্ঞানকে টেনে ধরে। তারপর-ও জ্ঞান হতাশ হয় না। কষ্ট ও যন্ত্রণার কামড় সয়ে এদেরকে বুঝাতে চেষ্টা করে। কিন্তু ; মূর্খতার শিষ্যরা চরম বেয়াদব হয়ে উঠে।
জ্ঞান এ পর্যায়ে মূর্খতা ও তার শিষ্যদেরকে আলোর পথে, সত্যের পথে, উপরে টানাটানি করে তোলার চেষ্টা থেকে আপাতত নিজেকে বিরত রাখে।
এক সময় জ্ঞান এক ধ্যানী মহাজ্ঞানী দার্শনিকের দেখা পেয়ে যায়। এখানে সে একা নয়। এখানে আরও তিনজন জ্ঞান ওই ধ্যানী মহাজ্ঞানী দার্শনিকের কাছাকাছি বসে শিক্ষা গ্রহণ করছে। আগত জ্ঞান এবং অপর তিনজন জ্ঞান ওই দার্শনিকের কাছে কিছুদিন থেকে আরও ধৈর্য্য, সাধনা ও পৃথিবীতে মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধারণা লাভ করে।
এখানে তাদের সাধনা শেষ হলে উপস্থিত মোট চারজন জ্ঞানকে ধ্যানী মহাজ্ঞানী দার্শনিক চারটি নামে নামকরণ করলেন। একজন জ্ঞানসক্রে, দ্বিতীয় জন জ্ঞানপ্লেট, তৃতীয় জন জ্ঞানএরিস এবং চতুর্থ জন জ্ঞানআলেক্স।
এরপর মহাজ্ঞানী দার্শনিক উপর্যুক্ত চারজন জ্ঞানের উদ্দেশ্যে বলেন –
জ্ঞান – চক্ষু দিয়ে পড়লে একটি ছোটো গল্পে সত্য জীবন বা আলোর পথের জীবনের অনেক শিক্ষনীয় উপকরণ খুঁজে পাওয়া যায়। গল্পের ভিতরে মানুষের সুন্দর জীবনের পথ পাওয়া গেলে, তখন সেটি সার্থক মানবিক গল্প হয়ে উঠে।
এই গল্পটির নাম ‘জ্ঞান ও মূর্খতা করে টানাটানি’। এখন আমাদের স্বাভাবিক মানুষের জীবনে এই গল্পটির গভীরে যে সংযোগ খুঁজে পাওয়া যায় সেদিকে জ্ঞান চর্চার দ্বারা আলোকপাত করি। এখানে গল্পের প্রধান দুটি চরিত্র আছে শব্দ রূপে। এই চরিত্র দুটোর অন্তর্গত শক্তি অনেক অনেক গভীরে আলোর পথে। চরিত্র দুটোর একটি হলো জ্ঞান আর অপরটি হলো মূর্খতা।
একদিকে জ্ঞান বা সত্য-মানুষ, অন্যদিকে মূর্খতা বা অযোগ্যতা বা পাশবিক – মানুষ। উভয়ে-ই খাদ্য গ্রহণ করে। জ্ঞান বাঁচার জন্যে প্রয়োজনীয় খাদ্য গ্রহণ করে এবং অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আলোর পথে সত্য খুঁজে বেড়ায়।
মূর্খতা তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আলোর পথে চলতে চায় না। মূর্খতা শুধু – ই বাঁচার জন্যে খায় না। বরং ; মূর্খতা বা পাশবিক – মানুষ পশুর মতো খাওয়ার জন্যে বাঁচে এবং পাশবিক রংতামাশায় মজে থাকে সারাজীবন। এমনকি পাশবিক -মানুষ তার খাই-খাই স্বভাবে পশুকেও হারিয়ে দেয়। পশু যেখানে তার পেট ভরে গেলে আর খায় না, সেখানে মূর্খতা বা পাশবিক – মানুষ আরও আরও গিলতে থাকে, জমাতে থাকে।
জ্ঞান সারাজীবনে খেয়ে বেঁচে কষ্ট করে পাশবিক সমাজের পাশবিক – মানুষের যন্ত্রণা সয়ে একটি একটি করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে আরও জ্ঞানের অর্থাৎ আলোর পথে এগিয়ে যেতে চেষ্টা করে। এক জীবনে খুব বেশি না-হলেও কিছুটা আলোকিত সিঁড়ির সন্ধান সে পেয়ে যায় অথবা অনেকটা আলোর পথে উঠে যায়। এটুকু আলোর পথের চিহ্ন রেখে যায় জীবনে।
অপরদিকে, মূর্খতা বা পাশবিক – মানুষ, সে-ও সারাজীবন খেয়ে বাঁচে। কিন্তু ; সে আলোর পথে বা উপরের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে পারে না। তার সারাজীবন শুধু খাওয়া খাওয়া এবং লোক ঠকানো, আর পাশবিক আচরণে আরও আরও খাদ্য মজুত করে এবং শেষে এখানেই মরে পড়ে রয়।
জ্ঞান বা সত্য – মানুষ বা আলোর পথের মানুষ চেষ্টা করে মূর্খতাকে টেনে আলোর দিকে বা উপরে উঠাতে। কিন্তু ; মূর্খতা তার স্বভাব অনুযায়ী জ্ঞানকে বা আলোর পথের মানুষকে পাশবিক আচরণে বা পাশবিক গর্জনে ভয় দেখিয়ে নীচের দিকে টেনে নামিয়ে তার সাথে মিশাতে চায়।
এখানে দেখতে হবে, জ্ঞান কি করে?
জ্ঞান চায় পাশবিক – মানুষকে অন্ধকার, কুৎসিত ও মানুষের স্বাভাবিক সুন্দর জীবনের সাথে যায় না এমন বিকৃত রুচির চর্চা থেকে বের করে এনে সত্য পথে চলতে শেখাতে। কিন্তু ; মূর্খতা বা পাশবিক – শক্তি যখন জ্ঞানের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে তাকেও নীচে নামাতে চায়, তখন জ্ঞান তার বুদ্ধি খাটায় এবং সূতা ছেড়ে দেয়। জ্ঞান তখন মূর্খতার সাথে বা পাশবিক – মানুষের সাথে আর টানাটানি করে তাকে উপরে উঠাতে সময় নষ্ট করতে চায় না। তাই জ্ঞান বা সত্য পথের মানুষ একসময় মূর্খতাকে আর টানে না। এদিকে মূর্খতা বা পাশবিক – মানুষ তার সারাজীবনের সঞ্চয় কেবল খাদ্যের মধ্যেই পড়ে থাকে, তার চরিত্রের মতো করে আরো অনেককে নিয়ে শক্তি দেখায়, মেকি অহংকারী নাচে মজে এবং এভাবেই মরে থাকে অন্ধকারে।
এতোটুকু বলার পরে ধ্যানী মহাজ্ঞানী দার্শনিক উপস্থিত চারজন জ্ঞানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, দেখো, তোমরা এখানে যে চারজন জ্ঞান এতোক্ষণ আমার কথা শুনেছো, তোমরা পৃথিবীর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ো এবং জ্ঞানের পথে, সত্যের সাথে, আলোর পথে পৃথিবীর সকল মূর্খতাকে ও তার শিষ্যদেরকে আহবান করতে থাকো।
এরপর চারজন জ্ঞান এই ভিষিথের বিভিন্ন দিকে যায় এবং মানুষের প্রতি আহবান জানায় –
জ্ঞানপ্লেট : শুনো হে মানুষ। শুধু খাওয়া ও ভার বহনের জন্যে মানুষ সৃষ্টি করা হয়নি। শুধু খাওয়া ও ভার বহনের জন্যে এ পৃথিবীতে গাধা, ঘোড়া, গরু, হাতি ইত্যাদি হাজার প্রাণী আছে। মানুষকে মহান স্রস্টা আরও উন্নত মস্তিষ্ক দিয়েছেন। মানুষ পৃথিবীর সুন্দর দেখবে এবং শিখবে। মানুষ চিন্তা করবে এই পৃথিবী কিভাবে আরও সুন্দর করে সাজানো যায়।
জ্ঞানএরিস : শুনো হে মানুষ সকল, পৃথিবীতে শুধু নৃত্য করা ও লম্ফঝম্প করার জন্যে স্রস্টা মানুষের সৃষ্টি করেননি। এ কাজ করার জন্যে সুন্দর ময়ূর যেমন আছে তেমনি বানর, উল্লুক প্রভৃতি জাতের প্রাণী আছে। মানুষকে ওইসব এলোমেলো বৈশিষ্ট্য থেকে দূরে থেকে আরও উন্নত ছন্দময় পরিবেশে বাঁচতে হবে।
জ্ঞানআলেক্স : শুনো হে মানুষ, শুনো হে ভাই ও বোনেরা। লুটপাট করে খাওয়ার জন্যে আর মানুষে মানুষে মারামারি করার জন্যে মহান সৃষ্টিকর্তা উন্নত মস্তিষ্কের মানুষ সৃষ্টি করেননি। লুটেপুটে খাওয়া, হানাহানি করা, ছুঁ মেরে ছিনিয়ে নেয়া, কৌশলে মানুষকে পেঁচিয়ে বোকা বানানো ইত্যাদি মন্দ কাজ-তো হায়েনা, কুকুর, ঈগল, সাপ ইত্যাদি প্রাণী করে থাকে। মানুষের কাজ হলো সবকিছুতে শৃঙ্খলা তৈরি করা। মানুষকে মহান সৃষ্টিকর্তা সবচেয়ে উন্নত মস্তিষ্কের অধিকারী করেছেন। অতএব, ভাবতে হবে।
জ্ঞানসক্রে : শুনো হে পৃথিবীর মানুষ। মানুষের মাঝে আছে অন্ধকার গহ্বর আবার মানুষের মাঝেই আছে অন্ধকার দূর করার উপাদান মহা মূল্যবান জ্ঞান – আলোক। অন্ধকারে কিছু দেখা যায় না। ভালো কিছু দেখার জন্যে জ্ঞান – আলোক জ্বালাতে হবে।
উন্নত মস্তিষ্কের মানুষ জ্ঞান চর্চা করে অন্ধকার দূর করার চেষ্টা করে যায়। মহান সৃষ্টিকর্তার সুন্দর সে উপভোগ করে।
অন্ধকারে বাস করে মূর্খতা, পাশবিক – মানুষ। সে অন্ধকারে নেচে, খেয়ে মরে যায়। পৃথিবীর সুন্দর দেখার জ্ঞান – চক্ষু তার খুলে না।
সহস্রাব্দের পরে পৃথিবীর কেন্দ্রে সেই ধ্যানী মহাজ্ঞানী দার্শনিকের কাছে মিলিত হয় জ্ঞানসক্রে, জ্ঞানপ্লেট, জ্ঞানএরিস এবং জ্ঞানআলেক্স। তারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন নামে নামকরণ করে আরও বহু জ্ঞান – মানুষ রেখে এসেছে। এখানে তারা তাদের অভিযান নিয়ে কিছুদিন পর্যালোচনা করলো।
সবশেষে ধ্যানী মহাজ্ঞানী দার্শনিককে কেন্দ্রে রেখে, হাতে হাতে ধরাধরি করে চারদিকে মুখ করে জ্ঞানসক্রে, জ্ঞানপ্লেট, জ্ঞানএরিস এবং জ্ঞানআলেক্স সমস্বরে আহবান করে – এখনও সময় আছে হে মূর্খতা। তোমরা সচেতন হও। তোমরা আলোর পথে আসো।।
গল্পকার : মোহাম্মদ আব্দুল হক

সম্পাদক: শাহ সুহেল আহমদ
প্যারিস ফ্রান্স থেকে প্রচারিত

সার্চ/খুঁজুন: