ঢাকা অফিস:
বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসানের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ২৩ জুলাই। এই পদে নিয়োগ পাওয়ার জন্যই ইতোমধ্যেই বেশ কয়েক জন ব্যাপক প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তৎপর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বর্তমান চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান এবং সহকারী নৌ প্রধান (পার্সোনেল) হিসেবে কর্মরত রিয়ার এডমিরাল গোলাম সাদেক।
নৌবাহিনীর এই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এসএম মনিরুজ্জামান বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগ পান। ২০২০ সালে চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি এক্সপোর্ট অ্যান্ড ইমপোর্ট করপোরেশনের (সিএমসি) কাছ থেকে সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটের আওতায় ২৩৫ মিলিয়ন ডলার (২ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা) দামে ৬ টি জাহাজ কেনার জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হয়। ২০২২ সালে মনিরুজ্জামান দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই একই পরিমান টাকায় ৪টি জাহাজ কেনা হয়। কোন রকম টেন্ডার ছাড়াই ২০২৩ সালের ১৪ অক্টোবর ছুটির দিনে সিএমসির সঙ্গে জাহাজ কেনার এই চুক্তি করে বিএসসি। ৬টি জাহাজের দামে ৪টি কেনার মাধ্যমে ৪৮৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে দুদকের তদন্তে উঠে এসেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেও তার সরকারের আশির্বাদপুষ্ট এসএম মনিরুজ্জামান চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পান। সেখানেও নানা অনিয়মে জড়িয়েছেন তিনি। এসএম মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ, মানি লন্ডারিং ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ২০২৫ সালের ১ জুলাই একটি অসুন্ধান দল গঠন করেন দুদক। সহকারী পরিচালক (অনুসন্ধান ও তদন্ত-৫) মো. নওশাদ আলীকে দলনেতা করে গঠিত অনুসন্ধান দলের অপর সদস্য হলেন উপসহকারী পরিচালক ইমরান আকন। অনুসন্ধান দল ওই বছরের ১৯ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র, এসএম মনিরুজ্জামানের ব্যক্তিগত নথি ও পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন তথ্য তলব করে। প্রাপ্ত নথিপত্র যাচাই-বাছাইসহ সার্বিক অনুসন্ধানে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় মামলার সুপারিশসহ প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে। তবে এরপরই অদৃশ্য ইশারায় থেমে যায় দুদকের তৎপরতা।
দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালনকালে দুর্নীতিতে অভিযুক্ত এসএম মনিরুজ্জামানকে নৌবাহিনী প্রধান পদে বসানোর জোর প্রচেষ্টা চলছে।
তবে তাকে টেক্কা দিয়ে পদটি বাগিয়ে নিতে সর্বোচ্চ তৎপরতা চালাচ্ছেন রিয়াল এডমিরাল গোলাম সাদেক। তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যান থাকাকালে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
গোলাম সাদেক ২০২০ সালের ১৯ জানুয়ারি প্রেষণে বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারপদে যোগদান করেন। তিনি মার্চ ২০২৩ পর্যন্ত তিনি এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে সংস্থাটির বিভিন্ন প্রকল্প ও কেনাকাটায় দুর্নীতির অভিযোগ উঠে। ২০২১-২০২২ অর্থবছরে ৫ সদস্যের কমিটির মূল্যায়ন প্রতিবেদন উপেক্ষা করে তিনি ২ কোটি টাকায় ‘নগরবাড়ী-কাজিরহাট-নরাদহ নদী বন্দর’ এলাকার শুল্ক আদায় কেন্দ্র বা ঘাট ইজারা অনুমোদন করেন। অথচ এই ঘাটের বার্ষিক ইজারা মূল ছিল ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এতে দুই অর্থবছরে সরকারের প্রায় ৬ কোটি ৮১ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। ঘাট ইজারায় এই দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ায় ২০২২ সালে দুদকের কমিশন সভায় গোলাম সাদেকের বিরুদ্ধে মামলা অনুমোদন করা হয়। তবে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালীদের তদবিরে সেই সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটে দুদক। কমিশন সভায় অনুমোদনের পরও মামলা থেকে বাদ দেওয়ার এমন ঘটনা দুদকের ইতিহাসে বিরল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এছাড়া ৪ হাজার ৫১৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয়ে বিআইডব্লিউটিএ’র ৩৫টি ড্রেজার ও জলযান কেনাকাটা প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, বিআইডব্লিউটিএ’র সাবেক চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল গোলাম সাদেকসহ কয়েক জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও অভিযুক্তদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম সাদেককে তলবও করেছিলেন অনুসন্ধান কর্মকর্তা। তবে এরপরই থেমে গেছে সেই অনুসন্ধান। এই গোলাম সাদেক এখন নৌবাহিনী প্রধান পদের জন্য প্রবল সম্ভাবনাময় হয়ে উঠেছেন।
যাদের বিরুদ্ধে বড় বড় দুর্নীতির অভিযোগ দেশের প্রতিরক্ষা বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ একটি বাহিনীর শীর্ষপদে বসেন তাহলে জাতি তাদের কাছ থেকে কী পাবে গুরুত্ব।




