সাইফুল ইসলাম রনি:
ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশি নারীদের ফরাসি ভাষা শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং সামাজিক ও পেশাগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘উইথ দ্য মাইন্ড’ তাদের প্রতিষ্ঠার তিন বছর পূর্তি উপলক্ষে ফরাসি ভাষা শিক্ষায় কৃতিত্ব অর্জনকারী নারী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দিয়েছে।
রোববার (২৮ জুন) প্যারিসের অদূরে পন্তা এলাকার একটি অভিজাত রেস্তোরাঁয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে সংগঠনটির বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী, বাংলাদেশি কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন পেশাজীবী এবং গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি জাহরিন হক নুপুর।
অনুষ্ঠানের শুরুতে গত তিন বছরে সংগঠনটির কার্যক্রম, অর্জন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। জানানো হয়, ২০২৩ সালের জুন মাসে কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশি নারীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘উইথ দ্য মাইন্ড’ এক বছরের মধ্যে ফরাসি সরকারের স্বীকৃত নিবন্ধিত অ্যাসোসিয়েশনের মর্যাদা লাভ করে। এরপর থেকে সংগঠনটি নিয়মিতভাবে বাংলাদেশি নারীদের জন্য বিনামূল্যে কিংবা স্বল্প ব্যয়ে ফরাসি ভাষা শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ এবং সচেতনতামূলক নানা কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছে।
সভাপতি জাহরিন হক নুপুর বলেন, প্রবাসজীবনে ভাষাগত প্রতিবন্ধকতার কারণে অনেক নারী ঘরবন্দি হয়ে পড়েন, আত্মবিশ্বাস হারান এবং মূলধারার সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারেন না। এই বাস্তবতা পরিবর্তনের লক্ষ্যেই ‘উইথ দ্য মাইন্ড’-এর যাত্রা শুরু হয়েছে।
তিনি জানান, বর্তমানে সংগঠনটির অনলাইন ফরাসি ভাষা শিক্ষা কার্যক্রমে ৪৫০ জনেরও বেশি বাংলাদেশি নারী অংশগ্রহণ করছেন। এ পর্যন্ত সংগঠনের সহযোগিতায় ৬২ জন নারী আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফরাসি ভাষার ডিপ্লোমা পরীক্ষা TCF ও DELF-এ উত্তীর্ণ হয়েছেন। পাশাপাশি দুই শতাধিক নারী মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ ও সহায়তা গ্রহণ করেছেন।
তিনি আরও বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু ভাষা শিক্ষা দেওয়া নয়; বরং নারীদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলা, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং সামাজিকভাবে আরও সক্রিয় করে গড়ে তোলা।”
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফ্রান্সের একমাত্র নারী কাউন্সিলর তানিয়া তুনু বলেন, “বাংলাদেশি নারীদের ভাষা শিক্ষা, প্রশাসনিক বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা এবং আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে ‘উইথ দ্য মাইন্ড’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আমি আশা করি, ভবিষ্যতে তাদের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হবে।”
অনুষ্ঠানে ভাষা শিক্ষায় সাফল্য অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়। এ সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী নিজেদের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন।
সম্প্রতি বি-১ স্তরের ফরাসি ভাষার ডিপ্লোমা অর্জনকারী আসমা আক্তার রুপু বলেন, “প্রবাসে নতুন জীবন শুরু করতে ভাষা শেখাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ‘উইথ দ্য মাইন্ড’ শুধু ভাষা শেখায়নি, আমাদের আত্মবিশ্বাসও ফিরিয়ে দিয়েছে। আজ নিজের সক্ষমতার ওপর আমার বিশ্বাস অনেক বেশি।”
আরেক শিক্ষার্থী উম্মে সালমা বলেন, “অনেকবার মনে হয়েছে আর পারব না। কিন্তু সংগঠনের আপুদের আন্তরিক সহযোগিতা ও উৎসাহ আমাকে প্রতিবারই নতুন করে শুরু করার সাহস দিয়েছে। আজকের এই অর্জনের পেছনে ‘উইথ দ্য মাইন্ড’-এর অবদান অনেক।”
আয়োজকরা জানান, ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম অনলাইন প্ল্যাটফর্ম জুমের মাধ্যমে পরিচালিত হলেও শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও সামাজিক বন্ধন জোরদারে নিয়মিত গেট-টুগেদার, কর্মশালা, সচেতনতামূলক সেমিনার এবং পারিবারিক পিকনিকের আয়োজন করা হয়। এসব উদ্যোগ প্রবাসী নারীদের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কমাতে এবং মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে জানানো হয়, আগামী দিনে ফ্রান্সের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত আরও বেশি বাংলাদেশি নারীকে ভাষা শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি নতুন শিক্ষা ও দক্ষতাভিত্তিক কর্মসূচিও চালু করা হবে।
অনুষ্ঠানে কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব আশরাফুল ইসলাম, ডা. হাবিবা জেসমিন, সাংবাদিক ফেরদৌস করিম আখঞ্জী, আশিক আহমেদ উল্লাস, মুমিন আনসারী, আবুল কালাম মামুন, পেশাজীবী দিয়ান আশরাফ ও ইয়াসমিন নাজু, সংগঠনের ট্রেজারার ফারজানা নুপুরসহ বাংলাদেশি কমিউনিটির বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। শেষে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে শুভেচ্ছা বিনিময় ও নৈশভোজ অনুষ্ঠিত হয়।




